আরব-বিশ্বের সাম্প্রতিক আন্দোলন: কিছু উপলব্ধি

•লিখেছেনঃ বাংলার মধ‍্যপ্রাচ‍্যবীদ নুসায়ের তানজীম

০১.
আরব-বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অনেকের ধারণা ছিলো যে, ‘আরব বসন্ত’ এখন ‘শীত’-এ রুপান্তরীত হয়েছে। তাদের ধারণাকে ভুল প্রমানিত করে আরব জনগণ আবারো জেগে উঠেছে। ‘আরব বসন্ত’ তাদের অন্তরে যে অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছিলো তা সাময়ীক নিস্তেজ হতে পারে বিভিন্ন কারণে, তবে তাকে একেবারে নিভিয়ে দেয়া সম্ভব হয় নি। কোনদিন হবেও না। আরব বসন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্যের জায়গা এটাই যে, এটি আরব জনগণের অন্তরের ভয়ের দেয়ালকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এখন আরবগণ শাসকদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস রাখে। জুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারে। আলজেরিয়ার জনগণ তাদের দেশের ৬০ বছরের পুরনো ফ্যাসিস্ট শাসনের শিকড় উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এখনো পর্যন্ত যদিও তাদের সব দাবী পূরণ হয়নি, তবে তারা দীর্ঘ এক বছরেরও বেশী সময় ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছে। প্রতি জুমাবারে হাজার হাজার আলজেরিয়ান যুবকের পদভারে প্রকম্পিত হয় রাজধানী আলজিয়ার্সের বড় বড় সড়কগুলো। সেনাবাহিনীকে বাধ্য করেছে জনগণের কাতারে এসে দাঁড়াতে।
গত সপ্তায় ইরাকেও সংঘটিত হয়েছে ভয়াবহ সহিংস আন্দোলন। ১০০ জনেরও বেশী মানুষ এতে প্রাণ হারায়। মার্কিন আগ্রাসনের কারণে ইরাকের যে রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়েছিলো সেটা আর দাঁড়াতে পারেনি। এখন ইরাক একটি ছেঁড়া মানচিত্র। ইরানী মিলিশিয়া, ইরান-বিরোধী আরব শিয়া এবং উত্তরের কুর্দীরা এই মানচিত্রকে খাবলে খাচ্ছে। পাশাপাশি দূর্নীতিতো আছেই। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করা সরকারের পক্ষে স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। জনগণের চাহিদা তারা মেটাতে পারছে না। কিন্তু এই পরিস্থিতি জনগণ বেশী দিন সহ্যও করেনি। প্রবল আক্রোশে ফেটে পড়ে বাগদাদের গ্রীন জোনের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছে।
ইরাক শান্ত না হতেই লেবানন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। লেবানন সরকার হোয়াটসএ্যাপের উপর টেক্স বসানোর প্রস্তাব পেশ করে। এটাকে কেন্দ্র করে প্রথমে জনগণ রাস্তায় নামে। ধীরে ধীরে সেটা বিশাল গণআন্দোলনের রুপ ধারণ করে। হাজার হাজার আন্দোলনকারীর গণজোয়ারে রাজধানী বৈরুত এক প্রকার অচল হয়ে পড়ে। পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ সবকিছু আন্দোলনকারীরা বন্ধ করে দেয়। এমনকি মন্ত্রণালয়ের সরকারী অফিসে মন্ত্রীপরিষদের মিটিংয়ে বসাও সম্ভব হয় নি। পরে প্রধানমন্ত্রী সা’দ আল হারীরী অথবা প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের অফিসে মিটিং হয়। প্রধানমন্ত্রী ৭২ ঘন্টার সময় চান আন্দোলনকারীদের কাছে। এর মধ্যে তাদের সকল দাবীদাওয়ার ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ঘোষনা করা হবে বলে ঘোষনা দেয়া হয় এবং দেশের সকল সমস্যার দ্রুত সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। গতকাল সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সংস্কারের ঘোষনা দেয়া হয়। মন্ত্রী এমপি এবং রাষ্ট্রদূতদের বেতন ৫০% কমানোর ঘোষনা দেয়া হয়। আরো কিছু বিষয় পেশ করা হয়। তবে জনগণ এতে সন্তুষ্ট হয় নি। তারা এখন সরকারের পদত্যাগের দাবী জানাচ্ছে।
এর কিছুদিন পূর্বে তিউনিসিয়ায় বিপ্লবের পক্ষের প্রার্থী কাইস সাঈদ দুই তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে নিরংকুশ বিজয় লাভ করেছেন। পার্লামেন্ট নির্বাচনে আন-নাহদার আসন সংখ্যা যদিও কমেছে, তবু দলটি স্পষ্ট ব্যাবধানে শীর্ষস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। সরকার গঠন করবে বলে তারা ঘোষনাও দিয়েছে। সে হিসেবে আগামী ৪/৫ বছর তিউনিসিয়া পুরোপুরিভাবে বিপ্লবী শক্তির দখলে থাকবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
এগুলো সবই ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে। বু আযীযীর ত্যাগ বৃথা যাবে না তার ইঙ্গিত বহন করে। সৌদী আরব এবং আরব আমিরাতের রাজতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদীরা যতই চেষ্টা করুক, এই জোয়ারের গতি পুরোপুরি রুদ্ধ করতে পারবে না। বরং অদূর ভবিষ্যতে এই ঝড় আরব উপদ্বীপের রাজতান্ত্রিক হুকুমতগুলোর শিকড়ও উপড়ে ফেলবে। এটা মোটেও রোমান্টিসিজম নয়; বরং বাস্তবতা। ইতিহাসের গতি বরারবই সম্মুখমুখী। কেউ চাইলেও এর লাগাম টেনে ধরতে পারে না।

০২.
আরব বিশ্বের সম্প্রতি আন্দোলনগুলোর মধ্যে অন্তত ২টি খুব কমন বিষয় লক্ষ করা গিয়েছে:
১. আন্দোলনকারীরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের দেশের সরকারপ্রধান কিংবা সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিবে। এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রতিটি দেশে আন্দোলনকারীরা তাদের দেশের স্বৈরশাসক কিংবা ব্যর্থ শাসকের নামের সাথে খুব সচেতনভাবে মিসরের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসির নামও নিচ্ছে। তারা বোঝাতে চাচ্ছে যে, আরব দুনিয়ার তাবৎ স্বৈরাচারী সামরিক সরকারগুলোর আদর্শিক পিতা হচ্ছেন সিসি। তাই প্রত্যেকটি আন্দোলনে তারা অবধারিতভাবে সিসির নাম নিচ্ছে। এটা প্রথম শুরু করেছিলো আলজেরিয়ানরা। তারা বুতাফ্লিকার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সময় এরকম স্লোগান দিতো:
“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, আস-সিসি আদুউল্লাহ”…
অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যতিত কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল এবং সিসি আল্লাহর দুশমন।
এই স্লোগানটি এখন গোটা আরব দুনিয়ায় আন্দোলনের আইকনে পরিনত হয়েছে। মিছিল মিটিংতো বটেই, এমনকি স্ট্যাডিয়ামে খেলা দেখার সময়ও দর্শকরা এক আওয়াজে এই স্লোগান দেয়। ওইদিন তিউনিসিয়ায় প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের বিজয় র্যালিতেও দেখলাম জনগণ নেচে নেচে এই স্লোগানটি দিচ্ছে। সেইম দৃশ্য দেখা গিয়েছে লেবাননেও। গত দুইদিন ধরে “সিসি আল্লাহর দুশমন” হ্যাস্ট্যাগটি আরব বিশ্বে টুইটারের ট্রেন্ডে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছে। যেখানেই আন্দোলন হোক, মিসর এবং সিসির নাম ঘুরে ফিরে আসেই। সবার একটাই কথা: ‘এই দেশ মিসর না। এই দেশে সিসি জন্মাবে না।’ এসব দেখে মিসরের একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ডক্টর মুহাম্মাদ আল-জাওয়াদী গতকাল টুইট করেছেন: “এই সিসি সম্ভবত শেষ সিসি, তার পরে আর কোনো নতুন সিসি আরবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। জনগণ সেনাবাহিনীকে আর বিশ্বাস করবে না।”
২. ফিলিস্তীনের জন্য আরবদের অন্তরের বেদনা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠতেছে। আরবদের অন্তর থেকে ফিলিস্তীন এখনো মুছে যায় নি। তারা এখনো কুদসের জন্য কান্না করে। অশ্রু ঝরায়। ফিলিস্তীনের জন্য শহীদ হওয়ার তামান্না রাখে। গাজায় যখন ইসরাইল হামলা করে তখন আরব যুবকদের কষ্ট, বেদনা এবং ক্ষোভে ভরা চেহারা দেখলে বোঝা যায়, তারা এখনো কী পরিমান ঈমান এবং ভালোবাসা লালন করে। কিন্তু আরবদের দূর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের দেশে পশ্চিমাদের বসিয়ে দেয়া আমির-ওমরা, রাজা-বাদশাহ এবং সামরিক একনায়কগণ। এই বরকন্দাজরা নিজেদের সিংহাসনের স্বার্থে ফিলিস্তীনকে বহু পূর্বেই সওদা করেছে। এখন তাদের জনগণকে ফিলিস্তীনের লাশের উপর জানাযা পড়ারও সুযোগ দিচ্ছে না। তাই যেখানেই এসব জনগণ একটু করে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে সেখানেই ফিলিস্তীন ফিরে এসেছে। প্রতিটি আন্দোলনে ফিলিস্তীন তাদের স্লোগানের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিনত হয়েছে। “বির রুহ, বিদ্দাম, নাফদীকা ইয়া ফালাস্তীন!” অর্থাৎ, ‘জীবন এবং রক্ত কুরবান করবো তোমার তরে হে ফিলিস্তীন’ — স্লোগানে চতুর্দিক প্রকম্পিত হয়ে উঠছে। ওইদিন তিউনিসিয়ার সদ্য বিজয়ী প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের বিজয়-ভাষনের বড় অংশ জুড়ে ছিলো ফিলিস্তীনের স্বাধীনতার কথা। অনুষ্ঠানে তিউনিসিয়ার পতাকার সাথে ফিলিস্তীনের পতাকা রাখা হয়নি কেন, এটা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন: এখানে ফিলিস্তীনের পতাকাও থাকা উচিত ছিলো। ফিলিস্তীন আমাদের শরীরের অংশ!
এই কথাগুলো যখন লিখছি তখনও ইসরাইলের প্রতিনিধীদল বাহরাইনে অবস্থান করছে। তারা মানামায় অনুষ্ঠিত উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিয়েছে। আরব রাজা বাদশাহদের পাশে বসে জায়োনিস্টরা এখন প্রকাশ্যে উম্মাহর সাথে ঠাট্টা করে। বাহরাইন হচ্ছে সৌদী আরবের টেষ্ট ফিল্ড। এখানে যা কিছু ঘটে তার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় রিয়াদে। মানামায় কেবল প্রাথমিক টেষ্ট করা হয়। সফল হলে পরবর্তিতে রিয়াদে মাটিতে সেটা কার্যকর করা হয়। তাই এই ঘটনাগুলো যে, রিয়াদের আঙুলি হেলানিতে ঘটছে সেটা বোঝার জন্য বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই।
ফিলিস্তীনের মুক্তির জন্য, আরবদের মুক্তির জন্য এসব স্বৈরাচারী শাসনের বেড়াজাল ছিন্ন করার কোন বিকল্প নেই। এই জাতি একবার মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। এটাকে সহজে ভুলিয়ে দেয়া যাবে না। মুহাম্মাদ বিন সালমান, মুহাম্মাদ বিন যায়েদ এবং সিসিরা যত চেষ্টাই করুক, তারা ইতিহাসের চাকাকে পেছনে ঘুরিয়ে দিতে পারবে না। জায়োনিষ্টদের সহায়তায় হয়তো কিছুটা বিলম্বিত করতে পারবে, তবে এদের ধংস অনিবার্য। ‘আরব বসন্ত’ নিশ্চয়ই আরব-মরুতে সবুজ গুল্মলতার জন্ম দিয়ে যাবে। জীর্ণশীর্ণ বৃক্ষরাজি অবশ্যই ফুলে-ফলে পল্লবিত হতে থাকবে।
.