Home Opinion তুরস্কের নেতৃত্বে নবদিগন্তে সিরিয়ার বিপ্লব

তুরস্কের নেতৃত্বে নবদিগন্তে সিরিয়ার বিপ্লব

মুক্তমতঃকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়,

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে”

সিরিয়া! বিশ্বমাঝারে একটি ক্ষতের নাম! মানবতা ও সভ‍্যতার একটি সমাধিস্থল। পরাশক্তির দাপটে মনুষ্যত্বের উপর সেখানে কতৃত্ব প্রাধান্য পেয়েছে ! যেখানে আশার আলোর সাথে হতাশার আঁধার ঘুরে ফিরে আসে! উষার সাথে আসে আঁধার অমানিশা। বন্দুকের শব্দ সেখানে গিটারের তান আর বারুদের গন্ধ প্রতিটি নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে।

আমরা যদি সিরিয়ার ইতিহাসের আঙিনায় পদচারণা করি তাহলে দেখব তার প্রতিটি ধূলিকণায় মানুষের হাহাকার ও তরবারির ঝনঝনানি। শুষ্ক গোলাপ গুলি যেন শুনাতে চায় হৃদয়ের অন্তঃস্থলে জমিয়ে রাখা হাজার বছরের বিচ্ছেদ বেদন। গ্রিক, বাইজান্টাইন থেকে আজ পর্যন্ত যুদ্ধের কালি দিয়ে রচিত হয়েছে তাদের গল্প গুলো।

১৯১৮ সালে উসমানী সাম্রাজ্যের পতনের সিরিয়ার অবস্থা হয়েছে জীব্রানের উপন্যাসের সেই ছোট্ট অভিভাবক হীন মারতার মতো, যাকে প্রয়োজনে ব‍্যবহার করে ছুড়ে ফেলা হয়েছে নির্মমতার প্রকোষ্ঠে। নেপোলিয়ান বোনাপার্টের ফ্রান্স দখলে নেয় সিরিয়া কে , সিরিয়ার ইতিহাসে শুরু হয় এক অন্ধকার ভয় যুগ, যার ভোর এখনো হয় নি। এসময় সিরিয়ানদের মধ‍্যে সু কৌশলে শীয়া-সুন্নী নামক বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ করে দেয় সাম্রাজ‍্যবাদী রক্ত পিশাচরা। সেই বীজ সুজলা সুফলা হয়ে ওঠে ১৯৬৬ খৃষ্টাব্দে যখন সিরিয়া আল বা’স দলের অধীনে চলে যায়। আল’বাসের তদানীন্তন নেতা হাফিজ আল আসাদ ছিলেন সুদক্ষ সেনাপতি ও নেতা। ১৯৬৬ সালে যখন তিনি ক্ষমতায় আসেন তখন তাঁকে নিয়ে রঙীন স্বপ্ন দেখতে থাকে সিরিয়ার আপামর জনসাধারণ। কিন্তু সে রঙিন স্বপ্নের রং কিছু দিনের মধ্যেই উবে গেল। সিরিয়ায় সফল হল ফরাসীদের কূটনীতি। সুন্নী মুসলিমদের উপর শুরু হল অত‍্যাচার।

১৯৮০ সালে হাফিজের ভাই রাফাত আল আসাদ ও কাজিন নামির আল আসাদ ‘শাবীহা’ নামের একটি গুপ্ত দল তৈরি করেন। এটি ছিল একটি অভিশপ্ত দল। নানান ভাবে সিরিয়ানদের উপর তারা অত‍্যাচার চালায়।

১৯৮২ সালে সিরীয় জনগণ অতীষ্ঠ হয়ে যায় আন্দোলনের পথ খুঁজতে থাকে। কিন্তু সফল হওয়া হল না। সিরিয়ার হামাকে ঘিরে ফেলে মানুষ রূপী হায়েনারা । নিমেষেই শেষ হয়ে যায় শত মানুষের স্বপ্ন, ধ্বংস হয়ে যায় শহরটি। কিন্তু তাদের স্মৃতি ভুলে যায় নি সিরীয় রা। সেসব শহীদদের রক্ত দিয়ে রচিত হয় আরেক মুক্তি যুদ্ধের উপন্যাস।

২০১১ সাল! সিরীয় জনগণ নেমে এল রাস্তায়, জীবনকে জন্মভূমির কাছে বন্ধক রেখে তারা গর্জে উঠল অত‍্যাচারী , স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে। এসময় হঠাৎ আরবে বয়ে যায় আরব বসন্তের সুশীতল বাতাস, যা পতন ঘটায় মিশরের স্বৈরশাসক কে। এতে অনুপ্রাণিত হয় সিরীয় রা। মিশর দাঁড়ায় সিরীয় জনগণের পাশে। আরবের দামাল ছেলেদের সিংহ নিনাদে চৌচির হয়ে যায় আরবের আকাশ-বাতাস, নাড়িয়ে দেয় আরবের রাক্ষস রূপী স্বৈরাচারীদের প্রাসাদ গুলিকে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ‘শতাব্দীর চুক্তি’র স্বপ্ন দেখা হায়েনারা। তারা মেতে ওঠে এক চরম ষড়যন্ত্রে। শেষ রক্ষা হল না, আরব-ইসরাইল-ইরানের ত্রিশঙ্কু ষড়যন্ত্রের ফলে পতন হয় মিশর বাসীর হৃদয়রাজ্যের রাজকুমার ডঃ মুহাম্মাদ মুরসীর। এরপর সীরিয়বাসীর উপর শুরু হয় নির্মম অত‍্যাচার। সিরিয়ার বিপ্লব আঁধার রাতে আঁস্তাকুড়েয় পর্যবাসীত হয়। সাম্রাজ্যবাদী তথাকথিত শান্তির ধ্বজাধারীরা নিষ্পাপ সিরিয়ার জনগণের উপর জুলুমের স্টিম রোলার চালিয়ে দেয়। নির্বিচারে গণহত‍্যা শুরু হয়। আর তথাকথিত লিডার রা বেমালুম বেপাত্তা হয়ে যায়।

এসময় যখন সিরিয়ার পাশে কেও দাঁড়ায় নি, যখন সেই আত‍্যাচারিত মায়ের হাহাকার আর্তনাদ কেও শোনে নি, যখন বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়া ছাদটির নীচে নিষ্পাপ শিশুটির শেষ বারের মতো আর্তনাদ কারো কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি, তখন পশ্চীমদিক থেকে এগিয়ে এল সেই হারিয়ে যাওয়া উসমানীরা। স্বার্থহীন ভাবে বাড়িয়ে দিল তাদের হাত। ভালোবাসা ও স্নেহে পূর্ণ করে দিল তাদেরকে। হ‍্যাঁ এনারা হলো তুর্কি ওসমানী।

প্রথমদিকে তুরস্ক আমেরিকা ও ইসরাইলের হয়ে সিরিয়ার বিরোধী সেনাদল FSA (Free Syrian Army) কে মদদ করে যাচ্ছিল। কে জানত আমেরিকা ও আরবরা এই যুদ্ধে ইসরাইলের স্বার্থ পূরণের জন্য বিরোধী পক্ষকে মদদ করছিল? তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি ইসরাইল পন্থী সরকার বসিয়ে সিরিয়ায় ইসরাইলের প্রভাব বৃদ্ধি করা! তুরস্ক যখন বুঝতে পারল তাদের উদ্দেশ্য তখন তারা আমেরিকা কে পরিত‍্যাগ করে রাশিয়ার দলে যোগ দিল। এসময় সিরিয়ায় বিরোধী পক্ষের মধ্যে দলাদলি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রকট হয়ে পড়ে। একদিকে FSA, অপর দিকে আল নুসরা ও দায়েশ সন্ত্রাসীরা। তুরস্ক তখন FSA এর বেশ কিছু দল নিয়ে TFSA (Turkish Backed Free Syrian Army) এরপর মূল FSA ও আমেরিকার পরিকল্পনা বুঝতে পারল ও তাদের অধিকাংশই তুরস্কের দলে যোগ দিল। বিপদ দেখে আমেরিকা ধীরে ধীরে বিদেশী ও কিছু মুনাফিক দের নিয়ে ইসরাইল পন্থী সেনাদল গঠন করল। যা ছিল PKK সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মদদ পুষ্ট। PKK হল একটি ইসরায়েলী ও পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র। পাশ্চাত্য এদের কুর্দি বলে চালালেও এরা কুর্দি বিরোধী এবং কুর্দি দের একটি বড় অংশ তুরস্কের অধীনস্থ সিরীয় বাহিনীর পক্ষে এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়ছে। পাশ্চাত্য এই সন্ত্রাসীদের অস্ত্র, সেনা সহ বিভিন্ন দিক দিয়ে সহায়তা করে। এই সন্ত্রাসীরা তুরস্ক, আরব ও ইরানের কিছু অংশ নিয়ে একটি নতুন ইসরাইলের জন্ম দিতে চায়। সে উদ‍্যেশ‍্যে এরা বহুবার তুরস্কে সন্ত্রাসী হামলা ও ঘটিয়েছিল। পরবর্তী তে এরা তুরস্কের আক্রমণ থেকে বাঁচতে SDF তথা Syrian Democratic Forces নাম গ্রহন করে।

যাইহোক, তখন তুরস্কের সামনে ছিল সমূহ বিপদ। তারা ভয় করে নি, উপর ওয়ালার উপর ভরসা রেখে নেমে পড়ল যুদ্ধে। প্রথমে আলেপ্পোয় SDF ও ISIS সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে। এভাবে তুরস্ক ধীরে ধীরে সিরিয়ায় নিজের শিকড় স্থাপন করতে থাকে। সিরিয়ার মানুষ তুরস্কের মধ‍্যে তাদের আশার আলো দেখতে পায়।

এরপর ২০১৮ সালে তুরস্ক সিরিয়াতে অপর একটি অপারেশন চালায় যা Operation Olive Branch নামে পরিচিত। এই অপারেশনের উদ‍্যেশ‍্য ছিল সিরিয়ার আফ্রিন সহ কিছু অঞ্চলকে সন্ত্রাসী মুক্ত করে নতুন করে গড়ে তোলা। কিন্তু এই অপারেশনের বিরোধিতা করে পাশ্চাত্য , আরব এমন কি আসাদ ও ইরান! কিন্তু তুরস্ক তাদের অবস্থানে অনড় থেকে আফ্রিন কে সন্ত্রাসী মুক্ত করে। এখন সেখানে শান্তির বাতাবরণ! শান্তির আবাহন! এরপর SDF সন্ত্রাসীদের অত‍্যাচারে অতীষ্ঠ সিরিয়াবাসী তুরস্ক কে আহ্বান করে। কিন্তু নানান কারণে তুরস্ক সে ডাকে সাড়া দেয় নি।

এভাবেই কেটে গেল একটা বছর। রাজনীতির ময়দানের বহু চড়াই উৎরাই পার হয়েছে কিন্তু মজলুমের সেই ডাক তারা ভোলে নি। তুরস্ক আবার ঘোষণা দিয়েছে নতুন করে সন্ত্রাসী বিরোধী অভিযান চালাবে। এবারেরটা খুব ভয়ংকর। তুরস্ক ঘোষণা দিয়েছে SDF সন্ত্রাসীরা সিরিয়ার যে ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন করেছে তাকে পরিবর্তন করতে চায় তুরস্ক।

কিন্তু এবারের চাপটা আগের তুলনায় অনেকটাই হালকা মনে হচ্ছে। কারন তুরস্ক একদিকে যেমন রাশিয়ার সাথে সখ‍্যতা বাড়িয়েছে অপর দিকে সিরিয়ায় নিজের অবস্থান মজবুত করেছে। এখন তো সন্ত্রাসীরা বাদে বাকি FSA এছাড়া ইসলামী দল সমূহের একটি বড় অংশ তুরস্কের পতাকার নীচে একতাবদ্ধ হয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মহলে তুরস্কের প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইরানের সাথেও বেশ দহরম মহরম চলছে তুরস্কের। ইরান যদিও এই হামলাকে আন্তরিক ভাবে সমর্থন করে না কিন্তু Operation Olive Branch তারা যেমন তুর্কি বিরোধ করেছিল এবারে তো তেমনটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এছাড়া রয়েছে সিরিয়া বাসীর প্রবল সমর্থন। তুরস্কের আচরণ তাদের কে মুগ্ধ করেছে। এজন্য তারা তুরস্ক কে আপন করে নিতে চায়।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আচমকা সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে ফেলার ঘোষণা দিয়েছে যা তুরস্কের জন্য একটি মাইলফলক বটে। এই সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধিতা করেছে মার্কিন ষড়যন্ত্রী ও ইসরাইল। মনে করা হচ্ছে এর পেছনে রয়েছে রাশিয়া। এই সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমেরিকা কে ফোনালাপে সোজাসাপ্টা কথায় এরদোয়ান হুমকি দেন, হয় আমাদের সাথ দাও না হয় রাস্তা থেকে হঠো। তুরস্ক যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সিরিয়ায়বিরোধী পক্ষকে ঐক‍্যবদ্ধ করে নতুন সেনাবাহিনী ‘আল জয়শ উল অত্বনিয়‍্যুস সুরিয়‍্যু’ গঠন করেছে।

যাইহোক, যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়াতে কোনপ্রকারে সন্ত্রাসীদের মেনে নেওয়া যায় না। আর তাছাড়া এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কেবল সিরিয়া নয়, তুরস্ক, ইরান সহ পুরো বিশ্বের জন‍্য বিপদ। তুরস্কের এই আক্রমনে এই সন্ত্রাসীরা নির্মূল হলে আপন জন্মভূমি কে ছেড়ে আসা সিরীয় জনতা তাদের মায়ের বুকে ফিরে শান্তিতে বাস করতে পারবে। এদিকে এই আক্রমণের মধ‍্যে সেই হারিয়ে যাওয়া পরিবর্তনের বিপ্লবকে খুঁজে পেয়েছেন অনেকেই। সব মিলিয়ে তাদের রুগ্ন শুষ্ক হৃদয়গুলিতে নতুন করে আশার অমৃত জল প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। আর শান্তির দূত হিসাবে একমাত্র দাবিদার তুরস্ক ও সুলতান এরদোগান।

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক

আপনাদের প্রিয় ওয়েবসাইট TRT Bangla এন্ড্রয়েড এপ্স লঞ্চ করেছে। প্রত্যেকে নিজের মোবাইলে ইন্সটল করতে ছবিতে ক্লিক করুন।