আফগানিস্তানে কি ইরানের প্রভাব বিদ‍্যমান?

0
287
মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|


 আফগানিস্তানে কি  ইরানের প্রভাব রয়েছে, যদি থাকে তাহলে কতটুকু? এবিষয়ে আমাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। সাম্প্রতিক লেখা যায় আমাদের কিছু বাঙালি রাজনীতি বিশ্লেষকগণ  আফগানিস্তান সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা পোষণ করে থাকেন।  তাঁদের কেও কেও মনে করেন আফগানিস্তানে ইরানের প্রবল প্রভাব প্রতিপত্তি রয়েছে। আবার অনেকের ধারণা আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব একেবারেই নেই। আবার অনেকের মধ‍্যে এমনও হাস‍্যকর ধারণা রয়েছে যে, আফগানিস্তান সরকার শীয়া মতাবলম্বী এজন্য ইরানের সাথে আফগানিস্তানে সরকারের বেশ দহরম মহরম রয়েছে। অনেকের ধারণা ইরান আফগানিস্তানের মধ‍্যে বসবাসরত হাজারা শীয়া মতাবলম্বীদের নিয়ে বহু শীয়া মিলিশিয়া তৈরি করেছে যারা ইমারতে ইসলামী তথা তালিবানের বিরুদ্ধে এতদিন লড়াই করে আসছে।
আজকে এই বিষয়গুলোর উপর অতি সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে চাই। যাতে আমাদের মধ‍্যে বিদ‍্যমান সংশয় কিছুটা হলেও নিরসন হয়।
এটা সত‍্য যে, আফগানিস্তানে আমেরিকা সমর্থিত কাবুল সরকারের সাথে ইরানের একটা দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। সেটা বাণিজ্যিক দিক থেকে হোক অথবা পারস্পরিক লেনদেনের বিষয়ে হোক। কিন্তু এই সম্পর্কটা কখনো ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি অথবা  আফগানিস্তানের কাবুল সরকার শীয়া ধর্মাবলম্বী নন। আফগানিস্তানের সাথে ইরানের সম্পর্ক রাজনৈতিক এবং দীর্ঘদিনের। তালিবান তথা ইসলামী ইমারত আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ইরান কাবুল সরকারকে রীতিমতো সহায়তা করে গেছে।
ইরান তালিবানকে সমর্থন করে না। কারণ ইরানের ভয় হল আফগানিস্তানে যদি  সুন্নীপন্থী ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় তাহলে কট্টর শীয়াপন্থী ইরানের জন্য তা হুমকিস্বরূপ হতে পারে। আশির দশকে যখন  রাশিয়ার দখলদার বাহিনী  আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছিল এসময় বহু শীয়া সন্ত্রাসীরা  আফগানিস্তানে তালিবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।শোনা যায় এসময় ইরান তাদের প্রবল  সহায়তা করেছিল। কিন্তু তালিবান শাসনের সূচনালগ্নে তালিবানরা আফগানিস্তানে এসব শীয়া সন্ত্রাসীদের ধ্বংস করে ফেলে ও ইসলামী ইমারত সরকার গঠন করে। এরপর থেকে আফগানিস্তানে শীয়া বা ইরানের তেমন কোন প্রভাব নেই অথবা আফগানিস্তানে এক্টিভ প্রভাবশালী  শীয়া মিলিশিয়া রয়েছে বলে আমার জানা নেই।
কিন্তু ২০০১ সালে আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তি যখন আফগানিস্তান দখল করল ও ইসলামী ইমারতের পতন হল ও  আমেরিকা সমর্থিত কাবুল সরকার প্রতিষ্ঠা পেল তখন ইরান কাবুল সরকার ও আমেরিকার পক্ষে আফগানিস্তানে তালিবান বিরোধী বড় ভূমিকা রাখে।
তবে আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব সীমিত। সেখানকার  হাজারা শীয়া অথবা শীয়া প্রভাবিত অঞ্চলগুলোতে ইরানের প্রভাব রয়েছে। হাজারা শিয়া গোষ্ঠী হল আফগানিস্তানে ইরানের সবথেকে বড় জোট। সিরিয়াতে বাশার আল আসাদের সমর্থনে ইরান এই হাজারাদের মধ‍্যে থেকে সন্ত্রাসী পাচার করেছিল।  তবে সেইসাথে এটাও বলে রাখা ভালো যে, আফগানিস্তানে বড় সংখ্যক হাজারা রয়েছে যারা ইরানের উপর পূর্ণ বিশ্বাসী নয় এবং বিপ্লবী ইরান মতবাদের বিরুদ্ধে।
২০১৪ সালে   আমেরিকার র‍্যান্ড কর্পোরেশন কর্তৃক আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ‘আফগানিস্তানে ইরানী প্রভাব’ শীর্ষক এই রিপোর্ট  অনুযায়ী আফগানিস্তানে হাজারা মিলিশিয়াদের মধ‍্যে প্রভাবশালী ‘ইরানী প্রভাব বিরোধী’ নেতাও রয়েছে। তাঁরা আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ এদিক থেকে দেখলে এটা পরিস্কার হয় যে, আফগানিস্তানে হাজারাদের মধ‍্যেও ইরান বিরোধিতা বিদ‍্যমান।
 এদিকে আফগানিস্তানে ২০২০ সালে প্রায় দুই দশক পর আবার তালিবানি শাসন তথা ইসলামী ইমারত আফগানিস্তান আবার প্রতিষ্ঠা পেতে চলেছে। তালিবান বাহ‍্যিকভাবে ইরানের সাথে সুসম্পর্ক রাখলেও তাদের পদক্ষেপ থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, তারা সুচতুর কৌশলে ইরানকে আফগানিস্তান থেকে মুছে দিতে চাইছে।
সাম্প্রতিক আফগানিস্তানে তালিবান ইমারত হাজারাদের মধ‍্যে থেকে শিয়া ওয়ালী বা গভর্ণর নিয়োগ করেছে‌ ।  ধারণা করা হচ্ছে যে, আফগানীদের বিশেষতঃ হাজারাদের মধ‍্যে ইরানের যে সীমিত প্রভাব রয়েছে সেটাকে মুছে ফেলতে ইসলামী ইমারত তথা তালিবান এই মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছে।
 এটা আমার কাছে একেবারে ভিত্তিহীন ধারণা বলে মনে হয় যে, ইরান ইমারতে ইসলামীর সহায়তা বা অস্ত্র সহায়তা করেছিল। কারণ ইরান বরাবরই তালিবানের বিরুদ্ধে ছিল। এমনকি সাম্প্রতিক চলমান শান্তি প্রক্রিয়াতেও ইরান খুশি নয়।
আর ইরানের  এই মনোভাব কিন্তু বুমেরাং হয়ে ফিরতে পারে ও বর্তমান আফগানিস্তানে যে  নতুন ইমারত ইসলামী গঠিত হতে চলেছে এটা ইরানের জন্য সুখবর নাও হতে পারে। যদিও ইরান ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সাথে এমনকি ভারতের সাথেও ইমারতে ইসলামী তথা তালিবানরা সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে বলে জানিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব একেবারে নেই বললে যেমন ভুল বলা হবে তেমনি আফগানিস্তানে ইরানের বিশাল প্রভাব আছে বলাটাও বড় ভুল হবে বলে আমি ধারণা করি। আমরা বলব  আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব সীমিত।‌ এবং নতুন আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব কেমন থাকবে তা সময় বলে দেবে।


©টি আর টি বাংলা ডেস্ক