সৌদি রাজা, পৃথিবীর বোঝা!

টেরোরিস্ট আমেরিকান ডলার কেন বিশ্ব শাসন করছে? এই পোস্টে সহজে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর চেয়ে সহজে আমি বুঝাতে পারতাম না।

পেট্রো ডলার কি? তেলের বিপরীতে ডলারই হচ্ছে পেট্রো ডলার। অর্থাৎ আপনি যদি পেট্রোলিয়াম জাতীয় তেল কিনতে চান আপনাকে তা ডলার দিয়েই কিনতে হবে। তো এতে সমস্যা কি? সমস্যা হল আপনাকে তাদের মুখাপেক্ষী হতে হবে যারা কিনা ডলার বানায়। আর তারা হচ্ছে আমরিকা। ধরুন আপনি সৌদিতে গিয়ে বললেন যে আমি তেল কিনবো আপনাদের কাছ থেকে। তারা বলবে ইউএস ডলার দাও, তেল নাও। আপনি বললেন, নাহ! আমার কাছে ইউএস ডলার নেই। আর ইউএস ডলার আনতে গেলে আমরিকা তাদের বিভিন্ন অনাচার চাপিয়ে দিবে, তাই অন্য কোন সম্পদের বিনিময়ে তেল চাচ্ছি। তারা বলবে, নাহ হবে না। আমরা পেট্রো ডলার চুক্তি করেছি, আর আমরা চুক্তি ভাঙতে পারবো না।
.
.
১৯৭১ সালে আমরিকান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ঘোষণা দেয় যে গোল্ড নয়, ইউএস ডলারই হবে মূল রিসার্ভ, স্ট্যান্ডার্ড মানি! যা নিক্সন শক নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের ভয়ে মিত্রশক্তি তাদের রিসার্ভ গোল্ডগুলো আমরিকায় পাঠানো শুরু করে। অথচ পরে আমরিকা প্রতারণা করে বলে যে গোল্ড আমাদের কাছেই থাকুক, আর তোমরা ডলার নাও। বিশ্বের ২৫% গোল্ড আমরিকা দখল করে বসে আছে। আর বলছে ডলারকে তোমরা রিসার্ভ হিসেবে ইউস করো, এবং ডলারের এগেইন্সেটে তোমাদের কারেন্সী ছাপাও। দেখবেন এদেশের ক্ষেত্রে বলা হয়, আমাদের রিসার্ভ এতএত ইউএস ডলার। কেন ইউএস ডলার? কেন গোল্ড নয়? কেন ইউএস ডলারে সব হিসেব হচ্ছে? যদি ইউএসের পতন হয়, এই রিসার্ভ ডলারের কোন মূল্য নেই। কারণ এগুলো ফিয়াট মানি। এগুলো শূন্যের বিপরীতে বানানো, আইমিন জাস্ট ছাপানো হয়েছে। আর এখন এর মূল্য ইউএসের ইচ্ছার উপর নির্ভশীল। এভাবে ইউএস আমাদের তাদের মুখাপেক্ষী বানিয়ে শোষণ করছে, আর তাদের দাসস্ব বরণ করতে বাধ্য করছে।
.
.
কিন্তু জাস্ট ঘোষণা করেই কি তা হয়ে গেছে? কারণ ডলার যদি কোন কিছুর এগেইন্সেটে না বানানো হয়, তবে ইউএস যতখুশি তত ডলার ছাপাবে, যাকে তাকে যখন খুশি কিনবে, কিন্তু একটা সময় এতএত ডলার থাকায় মুদ্রাস্ফীতি হয়ে ডলার মান আর থাকবে না। কিন্তু এর জন্য ইউসের দরকার এমন কিছু যা গোল্ডের চেয়েও মূল্যবান, এবং যার অনেক চাহিদা আছে, আর যার এগেইন্সটে তারা ডলারের ব্যবসা করবে। গোল্ড তাদের পরিবর্তন করতেই হত। কারণ তারা এত এত ব্যবসায়িক ডিল করেছিল যে, সেগুলোর শোধ করার মত ডলার, আরো ভালো করে বললে গোল্ড তাদের কাছে ছিল না। অথচ ঠিকই তারা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন, জিলিয়ন জিলিয়ন ডলারের ডিল করছে, খরচ করছে। আদৌ কি তাদের থেকে গোল্ড অথবা অন্য কোন সম্পদ কমছে? কেবল ছাপানো ডলার কমছে! তারা সেটাই তো চায় যে তাদের ডলারই হোক একমাত্র ওয়ার্ল্ড কারেন্সী, কোন বাধা ছাড়াই।
.
.
তো ১৯৭৪ সাথে তারা গেল সৌদি আরবে। বিশ্বে প্রতিদিন এ্যাটলিস্ট ১০% তেল সৌদি বিক্রি করে। তাদের গিয়ে বললো, দেখো, তোমাদের সবরকম সামরিক এবং রাজনৈতিক সমর্থন, অস্ত্র এবং টেকনোলজিকাল সাপ্লাই আমরা দিবো। এর বিপরীতে তোমরা তেল শুধুমাত্র ডলারে বিক্রি করবে। মাথামোটা সৌদিরা রাজী হয়ে গেল। কারণ তারা এমন শক্তিশালী সেনাবাহিনী বানাতে ভয় পায়, যারা কিনা তাদের সিংহাসনের জন্য হুমকি সরূপ। স্বাভাবিকভাবেই একজন যোগ্য সেনাপ্রধান যখন দেখবে যে পেট আর মাথা মোটারা সিংহাসনে বসে আছে, সে লাথি মেরে আগে তাদের সরাবে। তো সৌদি-গল্ফ এজন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনী বানাবে না। তাদের দরকার তাদেরই মত পেট আর মাথা মোটা সেনাবাহিনী। আর এজন্য তারা আমরিকার উপর নির্ভশীল। এজন্য নিজ দেশে তারা আমরিকান বেইস বানাতে দিয়েছে। তারা চায় কেবল খেয়ে-দেয়ে ফূর্তি করে রাজতন্ত্র, আর তাদের ব্যবসাপাতি ধরে রাখা।
.
.
তো সৌদিরা তেল ডলারে বিক্রি করা শুরু করলো। তো ডলারগুলো নিয়ে তারা আবার আমরিকাকেই দিল, বিপরীতে আমরিকা তাদের বন্ড ধরিয়ে দিল যে, যখন দরকার পরে বন্ড ভাঙিয়ে খরচ করো। কারণ যত ডলার আমরিকা ছাপাচ্ছে, তত ডলারের সম্পদ কিন্তু আমরিকার কাছে নেই। তাই অতিরিক্ত ডলার না ছাপানোর জন্য, যখনই কোন দেশ ডলার জমায়, তখনই তাদের বন্ড ধরিয়ে দিয়ে সেই ডলার আবার অন্য কাজে লাগায়। আবার নিজেদের কাছেও অনেক ডলার রাখে না, নতুবা আমরিকার মধ্যে ডলারের মান কমবে। তাই তারা চায় ডলার ছড়িয়ে থাকুক। কোথাও জমে গেলে সেটার বিপরীতে বন্ড দিয়ে সেই ডলারগুলো নিয়ে আরেক জায়গায় ব্যাবহার করে, যেন ডলারের ব্যবসা জারী রাখা যায়, এবং মানুষকে মুখাপেক্ষী থাকতে বাধ্য করা যায়। বন্ড বলতে ধরুন ব্যাংকের প্রাইজ বন্ড। আপনারা তা কিনতে পারবেন, আবার ব্যাংকের কাছে একই মূল্যে ভাঙাতে পারবেন। তেমনি অনেক ইউএস ডলার আপনি নিজের কাছে জমিয়ে কি করবেন? আমরিকা বলে আমাদের কাছেই রিসার্ভ রাখুন, ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে রাখুন, পরে ইন্টারেস্ট সহ পাবেন। আর কত রেখেছেন সেটার দলীল হিসেবে বন্ড রাখুন। এই বন্ডকে তারা বলে ট্রেসারী বন্ড। এভাবে বারবার আর অপ্রয়োজনে ডলার না ছাপিয়েই আমরিকা কাজ চালাচ্ছে। আর মুদ্রাস্ফীতিও এড়িয়ে চলছে।
.
.
তাহলে তেলের দাম আসলে কারা ভোগ করছে? আমরিকা না সৌদি? ভেবে দেখুন, তেল আসলে বিক্রি করছে আমরিকা। সৌদি সরাসরি আমরিকার একটি প্রদেশ হিসেবে কাজ করছে। শুধু সৌদিই না, কাতার, কুয়েত, আমিরাত এবং আরো যারা আছে, সকলে ইউএসের অংশ হিসেবে কাজ করছে, এবং তাদের অর্থনীতি মূলত ইউএসের অর্থনীতির অংশ। এবং এসব দেশের রাজারা এর বিপরীতে রাজনৈতিক এবং সামরিক সাপোর্ট পাচ্ছে। আমরিকাকে নিজেদের দেশে সেনাঘাটি দিয়েছে। সাদ্দাম, গাদ্দাফি সরার চেষ্টা করেছিল, তারা নিজেরাই সরে গেছে। সম্ভবত বাদশাহ ফয়সালের ক্ষেত্রেও একই কারণ ছিল। আর আমরিকা তাদের ঘাড়ে চড়ে অর্থনীতিতে মনোপলি সৃষ্টি করে নিজেদের মনগড়া বিধান মানুষের উপর চাপাচ্ছে। ফেরাউনের মত নিজেকে আল্লাহর সাথে শরীক করছে, আল্লাহর বিধান রিপ্লেস করার মত স্পর্ধা দেখাচ্ছে। আর এতসব কিছু পেট্রো ডলারের বদৌলতে। সৌদি হল এই চুক্তির মধ্যমণী।
.
.
সৌদির সাথে এই চুক্তি টিকে থাকলে, আমরিকার যে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন খরচ, সেগুলোর ভার আমাদের বহন করতে হবে। কারণ গোল্ড আমরিকার দখলে, তেল আমরিকার দখলে। তারা কেবল ডলার আর বন্ডের লুপিং চালিয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে, নিজেদের বাজার চালু রাখছে অথচ তাদের এত সম্পদ নেই যত তা অলরেডি খরচ করে ফেলেছে, আর কত ডলারের ডিল বাকি আছে সেগুলো হিসাব করলে বলতে হবে যে সেগুলা কারা শোধ করবে? এই আমার আপনার শোধ করতে হবে! কিভাবে? এই যে আমাদের টাকা, যা ডলারের বিপরীতে ছাপা হচ্ছে, সেই ডলারের মান কমলে আমাদের কষ্টে উপার্জিত টাকার মানও কমে যাবে, এই যতটুকু মান কমলো সেটা আমরিকার খরচের হিসাব ঠিক রাখতে কাটা গেছে। আর যতদিন পেট্রো ডলার চুক্তি থাকবে, তেলের বিনিময়ে ডলার তার প্রভুত্ব এভাবেই চালিয়ে যাবে।

Writer- Muhammad Shamim