তুরষ্ককে যেভাবে ইসলামবিদ্বেষী থেকে ইসলামে ফিরিয়ে আনলেন এরদোগান!

প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ক্ষমতায় আসার পর ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামবিদ্বেষীতায় গভীরভাবে নিমজ্জিত থাকা তুর্কী জনগণের মূলে ইসলাম ফিরিয়ে আনার যে প্রচেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, তা পুনরায় মসজিদে রূপান্তরিত আয়াসোফিয়ায় প্রথম জুম’আ অনুষ্ঠিত করার মাধ্যমে অনেকটাই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন তার ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল, জাস্টিস অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কের চেহারাই বদলে দিয়েছে। পাব্লিক প্লেসে হিজাব পরিধানের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা প্রত্যাহার করে হিজাবের ব্যবহার ফিরিয়ে এনেছেন তারা। শুধু তাই নয়, ধর্ম এবং শিক্ষায় যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তারা তা বীরদর্পে উৎখাত করে পুরো দেশজুড়ে হাজার হাজার মসজিদ নির্মাণ করেছে।

ইসলাম উঠিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামবিদ্বেষী সংবিধান প্রণয়ন করার মাধ্যমে প্রায় এক শতাব্দী পূর্বে কামাল আতাতুর্ক যে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই দেশের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ মেনে চলা তুর্কী নাগরিকদের জনজীবনে প্রসিডেন্ট এরদোগানের দল পরিবর্তন আনতে সফল হয়েছেন।

ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কী জনজীবনে এরদোগান সরকার তুরস্কে যেসব বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন নিম্নে তা তুলে ধরা হল।

হিজাব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার:

হিজাব এবং স্কার্ফ পরিধানের ক্ষেত্রে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মাঝে বিভেদকারী সমর্থকগোষ্ঠী দ্বারা এক শতাব্দী পূর্বে নিষেধাজ্ঞার যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, তা ২০১৩ তে উঠিয়ে নেয় এরদোগানের সরকার।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এরদোগান এই ব্যাপারে বলেছিলেন, সময় এসে গেছে অন্ধকার যুগের আইন প্রত্যাহারের, যে আইনের ব্যাপারে আমাদের যুবসমাজ ক্রুদ্ধ এবং যা তাদের পিতামাতার কাছে ভোগান্তির কারণ।

দ্বীনি শিক্ষা:

এরদোগান বলেছিলেন, তার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো- তাকওয়াবান (খোদাভীরু) তুর্কী প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইমাম ও খতিবদের নিয়োগ করা। যার কারণে তিনি ইমাম ও খতিবদের সমন্বয়ে স্কুল কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমে এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ধর্মীয় তারবিয়াত মূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করেন এবং বিভিন্ন দ্বীনি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

এই ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, এরদোগান শুধুমাত্র পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এনেছেন বিষয়টি এমন নয় বরং তার লক্ষ্য আরো বিস্তৃতি লাভ করেছে। তিনি আরো ডজনে ডজনে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা সহ এই প্রকল্পের জন্য শত শত মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছেন।

তাছাড়া সাধারণ (দ্বীনি নয়) স্কুল কলেজের পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের অংশ হিসাবে ৩ বছর আগে এরদোগান সরকার তুরস্কের হাইস্কুলগুলোর পাঠ্যক্রম থেকে ডারউইনের মতবাদ তুলে দেন। এই সম্পর্কে সরকার বলেছিল, ডারউইনের মতবাদগুলো চরম বিতর্কিত ও শিক্ষার্থীদের বুঝতে অসুবিধাজনক তাই একে পাঠ্যক্রম থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে।

মসজিদ:

ধর্মীয় বিষয়ক দিয়ানাত অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এরদোগান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অধিদপ্তর কর্তৃক তুরস্কে মোট ১৩ হাজার মসজিদ নির্মাণ করেছে। গত বছরের জরিপ অনুযায়ী সেই ১৩ হাজার মসজিদ সহ তুরস্কে এখন মোট মসজিদের সংখ্যা ৮৯ হাজার ২৫৯টি।

সেই মসজিদ গুলোর মধ্যে অন্যতম হল গত বছর ইস্তাম্বুলে মিমর সিনানের ক্লাসিক ডিজাইন করা মসজিদগুলোর সারিতে নির্মিত তুরস্কের সর্ববৃহৎ চামালিকা মসজিদ। এই মসজিদটি এতই বিশাল যে বসফরাস প্রণালির তীর ঘেষা একটি পাহাড়ি চূড়াকে তুরস্কের এশিয়া অংশ থেকে (মসজিদটির কারণে) আর দেখা যায় না।

শুধু তাই নয়, ইস্তাম্বুলের প্রাণকেন্দ্র তাকসিম স্কয়ারে কামাল আতাতুর্কের সমাধির অতি নিকটেই ধর্মীয় মূল্যবোধকে আরো স্পষ্ট করার লক্ষ্যে আরেকটি বিশালাকার মসজিদের নির্মাণ কাজ একেবারে চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে।

সামাজিক পরিবর্তন:

এরদোগান লিঙ্গ সমতার ব্যাপারে বলেন, এটি একটি অতি স্পর্শকাতর বিষয় এবং স্বভাবগতভাবেই এতে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। পুরুষদের সাথে মহিলাদের সমতা বিধান করার ক্ষেত্রে যে স্পর্শকাতর বিষয়টি সামনে আসে তা বিবেচনায় এই সমতা বিধান করা একেবারেই সম্ভব নয়। তিনি বলেন,সমতা বিধান করতে হলে আগে আইনের দৃষ্টিতে উভয়কে সমান বিবেচিত হতে হবে।

অ্যালকোহল :

এরদোগান সরকার অ্যালকাহোলের উপর অতি উচ্চমাত্রায় ট্যাক্স আরোপ করেছে, শুধু তাই নয়,এর বিজ্ঞাপন সম্পর্কিত আইনও যথেষ্ট কঠোর করেছে। এমনকি কিছু কিছু পাব্লিক প্লেসে অ্যালকাহোল পান করার উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

সেনাবাহিনী:

আতাতুর্কের ইসলামবিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে আসছিল তুরস্কের সেনাবাহিনী। এমনকি তারা ১৯৬০ সাল থেকে এই পর্যন্ত মোট ৪ বার তুরস্কের ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৯৭ সনের অভ্যুত্থানে তুরস্কের সেনাবাহিনী সামরিক হস্তক্ষেপ করার ফলে তৎকালীন ইসলামপ্রিয় প্রেসিডেন্ট নাজমুদ্দীন এরবাকান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং তার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল।

২০১৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান থেকে বেঁচে যাওয়া এরদোগান সরকার, সরকার উৎখাত ও বিদ্রোহের কারণে শত শত সিনিয়র আর্মি অফিসারদেরকে আদালতের মুখোমুখি করেছে। এমনকি হাজার হাজার বিদ্রোহী সেনার উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা-সহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করছে এরদোগানের সরকার।

বৈদেশিক রাজনীতি:

তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হওয়ায় আঞ্চলিক সুন্নি মুসলিম ইস্যুগুলোতে মুসলিমদের পক্ষে নিজেদের শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাছাড়া ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর দখল ও তাদের ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণে এরদোগান সবসময় সোচ্চার।

সিরিয়া,ইরাক ও লিবিয়ায় তার সামরিক হস্তক্ষেপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলগুলোতে পররাষ্ট্র নীতি পর্যবেক্ষণ করে বিরোধী এবং সমালোচকরা বলছে এরদোগান পুনরায় উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন উসমানীয় পলিসি ব্যবহার করছেন।

তাছাড়া,সাম্প্রতিক সময়ে আয়াসোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরিত করে একে জেরুসালেম ও আল আকসা পুনরুদ্ধারের সোপান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এরদোগান।

সূত্র:আল জাজিরা।