গুলেনবাদীদের আন্ডারওয়ার্ল্ড মিশন

0
66

মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|


তুরস্কের আধ্যাত্মিক গুরু ও ১৫ জুলাই তাম্মূজ সন্ত্রাসি কার্যকলাপের নাটের গুরু ফেতুল্লাহ গুলেন সম্পর্কে আমরা অনেকেই শুনেছি।অনেকেই তাঁকে একজন ধার্মিক ও সুফী হিসেবে চিনে থাকেন ।‌ অনেকেই আবার ইমাম মেনে তাঁর ভক্ত হয়েছিলেন। শুধু তুরস্ক নয় একটি আন্তর্জাতিক ভিশন নিয়ে তাঁর মিশন বিশ্বের বহু দেশেই চলমান। কিন্তু ফেটোবাদীদের তত্বাবধানে যখন একের পর এক মার্ডার , ব্ল্যাকমেইল ইত‍্যাদী হতে থাকলো তখন তাদের মুখোশ খুলে গেল। বিশ্বচরাচরকে কণকসুধা পান করানোর নামে তারা যে গরল ঢালছিল তা ধীরে ধীরে , পদে পদে প্রকাশ হয়ে পড়ল। অবশেষে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই তাদের নগ্ন চেহারা সমগ্র বিশ্ব দেখেছে। আজকে আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে গুলেনবাদীদের সম্পর্কে জানব।

গুলেনবাদীদের নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে আমাদেরকে ফেতুল্লাহ গুলেন সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। ফেতুল্লাহ গুলেন ১৯৪১ সালে তুরস্কের ও এরজুরুম প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন আধ‍্যাত্মিক নেতা। তাঁর মতবাদ তাসাউউফপন্থা বা সালাফী মতবাদ মোটেই ছিল না। তিনি ছিলেন আধুনিক গণতান্ত্রকামী প্যান গুলেনিজমে বিশ্বাসী। ১৯৬৬ সালে ইজমিরে প্রথম ফেতুবাদী সংগঠন বা গুলেনবাদী সংগঠন গঠিত হয়। গুলেন সাহেব টিভি, কফিহাঊস সহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁর মতবাদ প্রচার করে মানুষকে আকৃষ্ট করতে থাকেন। তবে গুলেনবাদীদের কার্যক্রম গোপনে ব্যপক হারে ধীরে ধীরে শুরু হয়।

ফেতুল্লাহ গুলেনের পরিকল্পনা ছিল প্রথমে তাঁর দলটিকে জনসমক্ষে মহৎ গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরতে হবে ও শক্তিশালী করতে হবে তারপর মূল স্টেট ইনস্টিটিউশনগুলোতে ঢুকে ক্ষমতা হাতিয়ে নিতে হবে। তিনি একটি বক্তব্যে বলেনঃ

“You must move in the arteries of the system without anyone noticing your existence until you reach all the power centers… until the conditions are ripe, they [the followers] must continue like this…You must wait for the time when you are complete and conditions are ripe, until we can shoulder the entire world and carry it… You must wait until such time as you have gotten all the state power, until you have
brought to your side all the power of the constitutional institutions in Turkey… Until that time, any step taken would be too early – like breaking an egg without waiting the full 40 days for it to hatch. It would be like killing the chick inside.”
( দেখুনঃhttps://www.youtube.com/watch?v=5gptKWc089A )

গুলেনবাদীরা ধীরে ধীরে তুরস্ক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটা চক্র গড়ে তোলে। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে ব্রিটেন ও আমেরিকাতে তারা বড় প্রভাব ফেলে। এই চক্রটি হল ক্ষমতালোভী চক্র। ক্ষমতার জন্য তারা বিভিন্ন প্রকার অবৈধপন্থা অবলম্বন করতেও পিছপা হয় না। তারা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে তাদের চক্রান্ত চালায়। তারা বিভিন্ন দেশে বামপন্থী, ডানপন্থী, উগ্রপন্থী, নম্রপন্থী সহ বিভিন্ন এরকম বিভিন্ন পরিচায়ে তাদের কাজকর্ম চালায়।

ফেতো সংগঠনটির একটি সুচিন্তিত গঠনগত কাঠামো রয়েছে। তাদের গঠনকে আমরা কয়েকটি স্তরে ভাগ করতে পারি। এদের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন ফেতুল্লাহ গুলেন। সংগঠনটির সদস্যদের কাছে তিনি ‘বিশ্বজগতের ইমাম’ (İmam of the Universe) নামে পরিচিত। এর পরবর্তী স্তরে রয়েছে ১৭ জন লিডারের একটি এলিট গ্রুপ। ফেতুল্লাহ গুলেনের সরাসরি নিয়োগকৃত কর্মকর্তা তারা। তারপরের স্তরটি সুবিধাপ্রাপ্ত স্তর নামে পরিচিত। গুলেন কর্তৃক নিয়োজিত এই স্তরের কর্মকর্তারা কর্মীদের নিয়োগ ও ছাঁটাই করে থাকে। পরবর্তী স্তরটি অর্গানাইজার অ‍্যান্ড একজিকিউটিভ লেভেল নামে পরিচিত। এটি একটি গুপ্ত স্তর। কেবল ফেতো দলের মেয়েকে বিবাহকারীরাই এই দলে স্থান পায়। তার পরের স্তরটি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ স্তর নামে পরিচিত। এরা গুলেনবাদীদের বৈধ ও অবৈধ কার্যক্রম নজরদারি প্রভৃতি করে থাকে। পরবর্তী দুইটি ধাপ হল বিশ্বস্তদের নিয়ে গঠিত ও সর্বশেষ ধাপটি হল জনগণের স্তর। জনগণ স্তরটি সাধারণতঃ গুলেনবাদীদের ক্রিমিনাল কার্যক্রম নিয়ে জ্ঞাত নয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এদের ব্যপক কার্যক্রম জারী রাখতে তারা বিভিন্ন জায়গায় ইমাম ও নিয়োগ করে। যেমনঃ

১) এশিয়া মহাদেশঃ

ক। তুর্কি প্রজাতন্ত্র সমূহের ইমাম
খ । সুদূর প্রাচ্য এশিয়ার ইমাম
গ। মধ‍্যপ্রাচ‍্যের ইমাম
ঘ। পূর্বতন সোভিয়েত রিপাবলিকানদের ইমাম

২) আফ্রিকার ইমাম

৩) আমেরিকাঃ

ক। আমেরিকা কানাড়া ইমাম
খ। দক্ষিণ আমেরিকার ইমাম

৪) ইউরোপঃ

ক। দক্ষিণ ইউরোপীয় ইমাম
খ। বলকান ইমাম
গ। পূর্বতন পূর্বাঞ্চলীয় ব্লকের ইমাম

৫) অস্ট্রেলিয়া ইমাম

এতক্ষণ আমরা গুলেনবাদীদের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে জানলাম। এবার জানব তুরস্কে ‘গুলেন সন্ত্রাস’ সম্পর্কে। আগেই বলেছি যে গুলেনবাদীরা ক্ষমতার লোভে বৈধ অবৈধ সকল পন্থা অবলম্বন করতো। হত‍্যাকান্ড, সন্ত্রাসবাদ, তথ‍্যপাচার, ব্ল‍্যাকমেইল সবকিছুতেই তারা ছিল সিদ্ধহস্ত।

১৯৮০ সালে সংঘটিত তুর্কি অভ্যুত্থানের প্রাক্কাল থেকে গুলেনবাদীরা কর্মীসংগ্রহ ও স্টেট ইনস্টিটিউশনগুলোতে প্রবেশের দিকে মনোনিবেশ করে। ‘ইশিক এভলেরি’ (Işık Evleri) ও প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করে তারা কর্মী সংগ্রহ করতে থাকে। দরিদ্ররা তাদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে এই সংগঠনটি ব্যাপকহারে কার্যক্রম শুরু করে । তারা স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, মিডিয়া সর্বত্র নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এমনকি অর্থায়নের জন্য তারা Bank Asya নামে একটি ব্যাঙ্ক স্থাপন করে। তারা ‘হিম্মেত’ নামে একটি অভিযান চালিয়ে জাকাত অনুদান প্রভৃতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করত। তারা TUSKON নামে একটি বাণিজ্যিক চক্র তৈরি করে। এছাড়া তুরস্কের সামরিক, আদালত সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের এজেন্টদের প্রবেশ করায়। উল্লেখ্য ১৯৯৯ সালে ফেতুল্লাহ গুলেন আমেরিকায় পালিয়ে আসেন এবং সেখানে তিনি পাশ্চাত্যবাদী মোডারেট ইসলামের প্রচারক হয়ে ওঠেন। তুরস্কে যখন AKP শাসন ক্ষমতায় এল তখন তুরস্কের ইসলামী করণ শুরু হয়। কিন্তু গুলেন উদ্যেশ‍্যপ্রণোদিতভাবে এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকেন।

এরপর গুলেনপন্থীরা তুরস্কের অভ্যন্তরে যখন শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করল তখন তারা ক্রাইম শুরু করল। খুন, তথ‍্যপ্রমাণ নষ্টকরা, বিরোধীদের হত‍্যা করা, মানি লন্ডারিং, অবৈধভাবে গোপন তথ্য ফাঁস, অবৈধভাবে গোপনীয় ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁস প্রভৃতি কাজ করতে থাকে।

অধ‍্যাপক হাবলেমিতোগ্লু হত‍্যাঃ

২০০২ সালে অ‍্যাসোসিয়েট প্রফেসর নাজিব হাবলেমিতোগ্লুকে (Necip Hablemitoğlu) তাঁর বাড়ির কাছে হত‍্যা করা হয়। তিনি গুলেনের বিষয়ে একটি তদন্তপূর্বক ও সমালোচনামূলক বই লিখেছিলেন। তাঁর স্ত্রী এর পেছনে গুলেনবাদীদেরকে দায়ী করেন। তাঁর বিচারে গুলেনবাদীরা বাঁধার সৃষ্টি করে অবশেষে ২০১৪ সালে বিচারকাজ শুরু হয়।

শেমদিনলী বইদোকানে( Şemdinli ) বোমা হামলাঃ

২০০৬ সালে শেমদিনলী বইদোকানে ফেটোপন্থী জেনারেল ইয়াশার বুয়ুকানিত (Yaşar Büyükanıt) এর ইশারায় বোমা হামলা হয়ে। পরে জানা যায় গুলেনবাদীদের ইশারায় তিনি এই সন্ত্রাসি কার্যকলাপ চালিয়েছেন।

এছাড়া বহু তুর্কি অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত ছিল।

১৫ জুলাই ব্যর্থ অভ্যুত্থানঃ

১৫ জুলাই ২০১৬ সালে অভ্যুত্থানে গুলেনপন্থীরা সরাসরি যুক্ত ছিল। এই দিনে তুরস্কের বহু জায়গায় সন্ত্রাসি হামলা চালায় গুলেনপন্থী সেনা ও সন্ত্রাসিদল। ধ্বংস করে দেওয়া হয় বহু দেশীয় সম্পদ, কেড়ে নেওয়া হয় ২৩৮ টি তরতাজা প্রাণকে। এদিন তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রজব তৈয়‍্যব এরদোগানকে হত‍্যার চেষ্টা করা হয় ও তাঁর অবস্থানস্থলে হামলা করা হয়। শুধু কি তাই? তুরস্কের তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল খুলুসী আকারকে জিম্মি করে গুলেনপন্থীরা। অভ্যুত্থানের ঘোষণা পত্রে স্বাক্ষরের জন্য খুলুসী আকারের উপর চালানো হয় নির্যাতন। সে ছিল এক রক্তাক্ত ইতিহাস। গোলাবাসী অঞ্চলে বিশেষ পুলিশ সেন্টার ধ্বংস করে দেয় । বিভিন্ন বিল্ডাং ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়। টি আর টি সংবাদদাতাকে বলপূর্বক ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়। অবিরাম খুনোখুনি ও চারিদিকে শহীদদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

অবশেষে পরম করুণাময় আল্লাহ পাকের দয়ায় গুলেনপন্থীদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। হাজার হাজার সন্ত্রাসি গুলেনপন্থীকে জেলে পোরা হয়। এরপর তুরস্ক দেশে বিদেশে গুলেন বিরোধী অভিযান চালানোর পর বহু দেশ এটিকে সন্ত্রাসি সংগঠন ঘোষণা দিয়েছে।

বর্তমানে গুলেনপন্থীদের বিরুদ্ধে তুরস্ক সরকার মা’য়ারিফ ফাউন্ডেশন নামে একটি আন্তর্জাতিক ইসলামী সংস্থা চালু করেছে‌। বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এই সংগঠনটির প্রসারে উদ‍্যোগ নেবার কথা জানিয়েছে তুরস্ক।

সূত্রঃ

১) Fetullah Gülen and FETÖ by Türkiye Cumhuriyeti Dışişleri Bakanlığı

২) The Gülenist Terror Organization (FETÖ) in the United Kingdom by Enes Bayraklı (Anas Bayrakli), Hacı Mehmet Boyraz (Haji Muhammad Boyraz), Oğuz Güngörmez; SETA.

৩) The Infinite Light by Fetullah Gülen , Adam Publishers and Distributors , New Delhi

৪)Feto’s coup attempt in Turkey, A timeline; Anadolu Agency


©টি আর টি বাংলা ডেস্ক