ধারাবাহিকঃ ইব্রাহীম (আঃ) এঁর পূর্বসূরীদের ধারা

মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|


প্রিয় পাঠক বৃন্দ! টি আর টি বাংলার পক্ষ থেকে আমাদের ‘ইতিহাসের আসরে’ সবাইকে স্বাগত। আজ থেকে আমরা মধ‍্যযুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও বিদগ্ধ পন্ডিত ইমাম ইবনে খলদূন রহঃ এঁর বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘কিতাব উল এবার’ থেকে আব্রাহামিক ধর্ম সমূহের বিশেষ করে ইসলামের ইতিহাস ও বিভিন্ন জাতী নিয়ে জানব।

প্রথমে আমরা ‘কিতাব উল এবার’ গ্রন্থ সম্পর্কে একটু সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে রাখব। মধ‍্যযুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও পন্ডিত এবং ইসলামের চারটি ধারার একটি মালেকী মাজহাবের আলেম ইমাম ওয়ালিয়‍্যুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে খলদূন রহঃ (সংক্ষেপে ইবনে খলদূন) যে জগদ্বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থটি রচনা করেন সেটিই ইবনে খালদুনের ইতিহাস বা তারীখু ইবনে খলদূন নামে পরিচিত।

প্রথম খন্ডটি এই গ্রন্থের সবথেকে বিখ্যাত অংশ যেটা হল মূলতঃ এই পুরো ইতিহাসটির ভূমিকা। এই খন্ডটি ‘আল মুক্বাদ্দামাহ’ বা ‘মুক্বাদ্দামাতু ইবনি খলদূন’ নামে পরিচিত।

এই গ্রন্থটির পূরো নাম হল ‘আল এবার ওয়া দীওয়ানু মুবতাদা’ই ওয়াল খবার ফী আইয়‍্যামিল আরবি ওয়াল’আজমি ওয়াল বারবার ওয়া মান’আস্বারাহুম মিন যাউইস সুলত্বানিল আকবার’। এটি সাতটি খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডটি এই গ্রন্থের সবথেকে বিখ্যাত অংশ যেটা হল মূলতঃ এই পুরো ইতিহাসটির ভূমিকা। এই খন্ডটি ‘আল মুক্বাদ্দামাহ’ বা ‘মুক্বাদ্দামাতু ইবনি খলদূন’ নামে পরিচিত।

আমরা মূলতঃ ইব্রাহীম আঃ কে কেন্দ্র করে আমাদের ইতিহাসের আসর শুরু করতে চলেছি। সেহেতু আমরা ইবনে খলদূনের ইতিহাসের দ্বিতীয় খন্ড থেকে বিসমিল্লাহ করব ইন শা’ আল্লাহ। তো শুরু করা যাক।

জাতির পিতা ইব্রাহীম আঃ নিয়ে জানার পূর্বে আমরা জানব তাঁর বংশধারা নিয়ে। কারণ এতে করে বিশ্বব্রহ্মান্ডে আমাদের বর্তমান মানবজাতির পূর্বপুরুষ ও বিভিন্ন ধর্মের মূল নিয়ে পরিস্কার ধারণা পেতে সহজ হবে।

মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা হলেন নূহ আঃ যিনি বাইবেলে Noah ও হিন্দু ধর্মে তিনি মনু নামে পরিচিত। তাঁকে মানবজাতির পিতা বলার কারণ হল, মহাপ্রলয়ংকরী বন‍্যার পর নূহ আঃ এঁর বংশধর বর্তমান মানবজাতির জন্ম দিয়েছে। এই বন‍্যার উৎপত্তি কোথায় এবিষয়ে আমার লেখা আর্টিকেল ‘আর্যরা কি ভারতীয়? একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে ( https://trtbangla.com/read/689 ) মোটামুটি একটা ধারণা পেতে পারেন।

যাইহোক, হযরত নূহ আঃ এঁর বয়স বন‍্যার সময় প্রায় ৭০০ বছরে পৌঁছায় এবং বন‍্যার পর তিনি প্রায় ৩৫০ বছর বেঁচে ছিলেন। অতয়েব তাঁর মোট বয়স হয়েছিল প্রায় ১০৫০ বছর। পবিত্র কুরআন ও তৌরাত (Torah) এ এমনি তথ্য দেওয়া হয়েছে। তৌরাতের একটি বর্ননা অনুযায়ী হযরত নূহ আঃ এঁর মৃত্যুর সময় ইব্রাহীম আঃ এঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর।

হযরত নূহ আঃ এঁর বয়স বন‍্যার সময় প্রায় ৭০০ বছরে পৌঁছায় এবং বন‍্যার পর তিনি প্রায় ৩৫০ বছর বেঁচে ছিলেন। অতয়েব তাঁর মোট বয়স হয়েছিল প্রায় ১০৫০ বছর।

নূহ আঃ এঁর তিন সন্তান ছিলেন। তাঁরা হলেন সাম (Sam) , হাম ( Ham) ও ইয়াফিস (Japeth) । এখানে বলে রাখা ভালো অনেকে কেনান (Canaan) কে নূহ আঃ এঁর সন্তান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু পবিত্র কুরআন শরীফে সম্ভবতঃ নূহ আঃ এঁর সন্তান বলতে তাঁর বংশধরের কারো সন্তান বুঝানো হয়েছে। যেমন আমাদের বলা হয়েছে বনূ আদম (Adam) বা আদম আঃ এঁর সন্তান সন্ততি। ইবনে খালদুনের তাঁর গ্রন্থে কেনানকে নূহ আঃ এঁর সন্তান ‘ من ولد نوح ‘ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি কেনানের নাম দিয়েছেন কেনান বিন কোশ বিন হাম বিন নূহ। অর্থাৎ নূহ আঃ এঁর পুত্র হাম, তাঁর পুত্র কুশ (Cush/Kush) আর কুশের পুত্র হচ্ছে কেনান। আর নমরূদ (Nimrud) বাদশাহ হল কেনানের পুত্র। তবে বর্তমানে বাইবেলের ওল্ড টেস্টআমেন্টের জেনেসিসের দশ নম্বর অধ‍্যায়ের ছয় নম্বর ভার্সে বলা হয়েছেঃ

“The Sons of Ham: Cush, Egypt, Put and Canaan ” (The Book of Genesis: 10:6)।

এখানে কানানকে কুশের ভাই হিসেবে দেখানো হয়েছে।

যাইহোক, হযরত নূহ আঃ এঁর পুত্র সামের বংশধররা সামী বা সেমেটিক ( Semitic) নামে পরিচিত আর এরা যে ভাষাতে কথা বলে তা হল সেমিটিক ভাষা। হযরত ইব্রাহীম আঃ এই সামের বংশধর।

ইবনে খলদূনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রলয়ংকরী বন‍্যার প্রায় দুই বছর পর আরফাখশাদ ( Arphachshed) জন্মগ্রহণ করেন। বাইবেলের লিউক গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ

“Which was the son of Cainan , which was the son of Arphaxad, which was the son of Shem , which was the son of Noe, which was the son of Lamech” (Luke- 3:36)

বাইবেল অনুযায়ী আরফাখশাদের চার সন্তান ছিল এলাম, আশুর, লূদ ও আরাম ( ইনি রাম নামেও পরিচিত। সাবেয়ীরা এনাকে নবী হিসেবে গণ‍্য করে। ইতিহাস ও ধর্ম বিশ্লেষণ করলে এবিষয়ে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হিন্দু সম্প্রদায় এই সাবেয়ীদের উত্তরসূরী)।

যাইহোক, কানান ছিলেন নূহ আঃ এঁর বংশধরদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাজত্ব স্থাপন কারী। তিনি বাবেল নগরী স্থাপন করেন যা তিনি তাঁর পুত্র নমরূদকে উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যান। নমরূদ দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। কিন্তু তিনি সাবেয়ী ধর্মে বিশ্বাস করতেন।

আরাম ( ইনি রাম নামেও পরিচিত। সাবেয়ীরা এনাকে নবী হিসেবে গণ‍্য করে। ইতিহাস ও ধর্ম বিশ্লেষণ করলে এবিষয়ে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হিন্দু সম্প্রদায় এই সাবেয়ীদের উত্তরসূরী)।

এসময় কালদানীয় (Chaldean) রা তৌহিদের উপর কায়েম ছিলেন। নূহ আঃ এঁর পুত্র সাম ও তৌহিদের উপর কায়েম ছিলেন। তাঁর পুত্র ও আরফাখশাদও খোদাভীরু ছিলেন। কালদানীয়রা আরফাখশাদকে সিরিয়াতে আমন্ত্রণ জানান কিন্তু তিনি সেখানে যান নি। এরপর আরফাখশাদ যখন ৩৫ বছরে উপনীত হন তখন তাঁর পুত্র শালিখ (Shaalikh) জন্মগ্রহণ করেন।

শালেখ (Shaalikh) দীর্ঘজীবন লাভ করেন। শালিক যখন ত্রিশ বছর বয়সে উপনীত হন তখন তাঁর পুত্র আবির (Eber) জন্মগ্রহণ করেন। শালেখের পুত্র আবিরও ছিলেন পিতার মতো তৌহিদবাদী। তিনি ক‍্যালদানীয়দের সাথে মিলে পথভ্রষ্ট অবিশ্বাসী নমরূদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু নমরূদ তাঁকে কোসা থেকে বাহির করে দেয়। আবির ও তাঁর সাথীরা দাজলা (Tigris) ও ফোরাত (Euphrates)এর মধ‍্যবর্তী মদীনাতুল মাজদাল (Ashkelon) এ এসে উপস্থিত হন। আবির (Eber) হলেন ইব্রানী বা হিব্রু ভাষাভাষীদের পিতা।

আবিরের পুত্র ফালিগের (Peleg) পুত্র ছিলেন আরগু(Reu)। তিনি কুলওয়াজা (Kulwatha) অতিক্রম করেন। অতঃপর তিনি নাবাত্বীদের ধর্ম গ্রহণ করেন। তখন থেকে সাবিয়ী ধর্ম শুরু হয়।

আরগু এঁর পুত্র ছিলেন শারুখ (Serug) আর তাঁর পুত্র ছিলেন নাহূর (Nahor)। নাহূরের পুত্র ছিল তারেহ (Terah)। আর তারেহই হলেন আযর অর্থাৎ হযরত ইব্রাহীম আঃ (Abraham) এঁর পিতা। এসময় জারামেক্বাদের রাজা ছিল নমরূদ । সে ছিল সাবেয়ী ধর্মের রাজা। ইব্রাহীম আঃ এঁর পিতা আযরকে সে মন্দিরের জন্য চয়ন করেছিল।

আযর বা তারেহের তিন পুত্র ছিলেন ‌। তাঁরা হলেন যথাক্রমে হযরত ইব্রাহীম আঃ (Abraham), নাহূর (Nahor II) ও হারান। হারানের পুত্র হলেন হযরত লূত্ব আলাইহিস সালাম (Lot)।

জেনে রাখা ভালো যে, আদম আঃরাখুন হযরত কে মানব জাতির প্রথম পিতা হিসেবে ও হযরত নূহ আঃ কে দ্বিতীয় পিতা হিসেবে গণ্য করা হয়। হযরত ইব্রাহীম আঃ কে তৃতীয় পিতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

যাইহোক, এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা হযরত ইব্রাহীম আঃ এঁর বংশধারা নিয়ে একটি সম‍্যক ধারণা অর্জন করলাম। আমরা পরবর্তী পর্বগুলি থেকে মূল আলোচনায় প্রবেশ করব ইন শা’আল্লাহ।

[লেখক পরিচিতিঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক হলেন টি আর টি বাংলার একজন সাংবাদিক।]


©টি আর টি বাংলা ডেস্ক