ইয়েমেন বিভাজনের জায়নবাদী ষড়যন্ত্র ও তুরস্কের ইয়েমেন অভিযানের প্রয়োজনীয়তা

0
65

মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|


২০১৫ সালে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি সন্ত্রাসিদের দমনের নামে ইয়েমেন ধ্বংসের নীল নকশা আঁকতে সৌদি আরব সমর্থিত আরবজোট কোমর বেঁধে যুদ্ধে নেমেছিল তখন অনেকেই হয়ত স্বপ্ন দেখছিলেন যে ইয়েমেনে ইরানের সাম্রাজ্য পতনের পথে। ঠিক যেমন আরব-ইসরাইলের যুদ্ধে সৌদী আরবের অংশগ্রহণকে আলে সৌদের জায়নবাদী বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই যখন ক্ষুদ্র শক্তির কাছে আরবজোট আত্মসমর্পণ করে তখনই সেখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে।

কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই যখন ক্ষুদ্র শক্তির কাছে আরবজোট আত্মসমর্পণ করে তখনই সেখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে।

ইয়েমেনের ক্ষেত্রেও এর ব‍্যতিক্রম হয় নি। ইয়েমেন নিয়ে আরবের ‘ন‍্যায়ের দালাল’রা যে বহুদিন ধরে নীল নকশা করছিল তা ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে থাকে। ইয়েমেনে সৌদি জোটের লক্ষ্য হুথী নির্মূল বলে যাঁরা ভেবেছিলেন তাঁরা হয়ত এখন বুঝতে পারছেন যে সৌদি জোট তাদের নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য হুথীদের ব‍্যবহার করেছে ও জিইয়ে রেখেছে।

সৌদি আরবের একটি লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনে ইখওয়ানুল মুসলিমীনের বিপ্লবকে বিনষ্ট করা। কারণ তারা প্রথম হতেই ইসলামী বিপ্লবের আতঙ্কে আতঙ্কিত। এমনকি ইরানে তথাকথিত ইসলামী বিপ্লবের পর যখন খোমেনির নেতৃত্বে ‘ইসলামী প্রজাতান্ত্র ইরান প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সৌদি ইরানের বিরুদ্ধে ইরাককে সমর্থন দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকের কমিউনিস্টপন্থী দল আল বা’সের নেতা সাদ্দামকে উসকে দেয়।

  • সৌদি আরবের একটি লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনে ইখওয়ানুল মুসলিমীনের বিপ্লবকে বিনষ্ট করা। কারণ তারা প্রথম হতেই ইসলামী বিপ্লবের আতঙ্কে আতঙ্কিত।

যাইহোক, ইয়েমেনে সম্ভবতঃ যখন তাদের ইখওয়ানুল মুসলিমীনকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বিফল হল তখন ইয়েমেনকে বিভাগ করার মতো ন‍্যক্করজনক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তারা। এতে তাদের যোগ‍্য সহায়তা করে তাদের চিরসাথী ও সুখদুঃখের বন্ধু ইসরাইল। পরিকল্পনাটি প্রকাশ হয়ে পড়ে আগের বছর যখন আরব আমিরশাহীর রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহ ও ইসরাইলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঈদী কোহেন কয়েকদিনের ব্যবধানে ইয়েমেন বিভাজনের পরিকল্পনা নিয়ে টুইট করেন। ইদি কোহেন গতবছরের ৩০ জুলাই একটি টুইটবার্তায় জানান যে, ইয়েমেনকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হবে এবং হাজরামাউত নামে একটি দেশ গঠিত হবে যার রাজধানী হবে আদেন।

তখন যখন আমি এই পরিকল্পনার কথা বলি , কিছু ভাই হয়ত বিশ্বাস করেন নি। কারণ তাঁদের মাথায় তখন একটি ভুল ধারণা ঘুরপাক খাচ্ছিল আর সেটা হল সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরবজোট ইয়েমেন থেকে হুথি সন্ত্রাসিদের নির্মূলের লক্ষ্যে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এই ধারণায় কীলক সেঁটে দেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি। যিনি সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের ইয়েমেনে যুদ্ধকে ইসলামী যুদ্ধ হিসেবে ফতোয়া দেন।

তখন যখন আমি এই পরিকল্পনার কথা বলি , কিছু ভাই হয়ত বিশ্বাস করেন নি। কারণ তাঁদের মাথায় তখন একটি ভুল ধারণা ঘুরপাক খাচ্ছিল আর সেটা হল সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরবজোট ইয়েমেন থেকে হুথি সন্ত্রাসিদের নির্মূলের লক্ষ্যে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রকৃত সত্য ধীরে ধীরে সামনে এসে যায় যখন আরব আমিরশাহী তাদের মিলিশিয়াদের দিয়ে ইয়েমেনের সকোত্রা দ্বীপে বিদ্রোহ করে ও এবছরের ২৬ এপ্রিল দক্ষিণী ট্রানজিশানাল সরকার গঠন করে। কিন্তু তখন হয়ত অনেকেই ভেবেছিলেন সৌদি ও আমিরশাহীর মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। কিন্তু গত রবিবার যখন সৌদি আরব সমর্থিত সরকারের শিল্প ও বানিজ্যমন্ত্রী আল মাইতামী পদত্যাগপত্র জমা দিলেন তখন রহস্যের জট ধীরে ধীরে খুলতে থাকে। এর পর যখন সকোত্রার আরখাবীল এর গভর্নর রমজী মাহরূজ যখন জানালেন যে, আমিরাত সমর্থিত সন্ত্রাসিদের আরখাবীল দখলকে সহজ করে দিয়েছে সৌদি আরব তখন আর সন্দেহের অবকাশ রইল না যে সৌদি ও আমিরাত ইয়েমেন বিভাজনের জায়নবাদী ষড়যন্ত্রে মেতেছে।

সাম্প্রতিক ইসরাইলের ‘Israel Today’ নামক একটি পত্রিকায় এভিয়েল জেনেইডারের লেখা প্রবন্ধ থেকে জানা গেছে যে, ইসরাইলের সাথে এই নব্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রটির গোপন সম্পর্ক রয়েছে। তিনি লিখেছেন,

“The STC expressed a positive attitude toward Israel, although the question of official diplomatic relations with the Jewish state is yet to be discussed.”

অর্থাৎ আমিরাত ও সৌদির ন‍্যক্কর ষড়যন্ত্র মধ‍্যপ্রাচ‍্যে আরো একটি নতুন ইসরাইল বান্ধব রাষ্ট্রের জন্ম দিতে চলেছে। যারফলে মধ‍্যপ্রাচ‍্যের সংকট আরো জটিলতর রূপ নিতে পারে।

এই সংকটময় মুহুর্তে , তুরস্কের ইয়েমেন অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।এমনিতেই তুরস্কের ইয়েমেন অভিযানের বিষয়টি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলে বেশ চর্চিত হয়ে উঠেছে। ইয়েমেন থেকেও তুরস্কের অভিযানের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। তুরস্কের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাসকগোষ্ঠী ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক হামজা তাকিন তুরস্কের ইয়েমেন অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তুরস্ক ইয়েমেনে একটি তুর্কি অক্ষ গড়ে তুলতে পারে। এক্ষেত্রে ইয়েমেনের ইখওয়ানুল মুসলিমীন সমর্থকরা বড় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। এটি হলে তা ইয়েমেনের ঐক‍্য ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তুরস্কের আকিনজি ড্রোনগুলো যেদিন ইয়েমেনের ষড়যন্ত্রীদের শিক্ষা দিতে শুরু করবে সেদিন থেকে ইয়েমেনের আকাশে নতুন রবির উদয় হবে বলে আশা করা যায়।

•লেখক পরিচিতিঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক হলেন আর টি বাংলার সাংবাদিক।


©টি আর টি বাংলা ডেস্ক