ওহাবী ও সৌদ বিরোধী প্রথম স্বশস্ত্র আরব বিপ্লব ও প্রথম সৌদ রাজত্বের পতন

0
109

 

মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|


বিপ্লবটা ছিল আরবজুড়ে। মিথ‍্যার বিরুদ্ধে সত‍্যের , অত‍্যাচারের বিরুদ্ধে অত‍্যাচারিতের ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন‍্যায়ের। সৌদির দিরিয়াতে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের নতুন কট্টরপন্থী খাওয়ারিজ মতবাদ ও ইবনে সৌদের দিরিয়াতে সাম্রাজ্য স্থাপন পবিত্র হিজাজে একটি রক্তাক্ত ইতিহাস সৃষ্টি করে।

ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের তাকফীরি মতবাদের সহায়তায় ইবনে সৌদ পবিত্র হিজাজে বহু নিরাপরাধ মানুষ হত‍্যা করেন ও মুসলিমদের তাকফীরি করে একটি অরাজকতা সৃষ্টি করেন। ইবনে আব্দুল ওহাবের তাকফীরী মতবাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন সেযুগের আলেম ওলামাগণ । এমনকি ইবনে আব্দুল ওহাবের পিতা আব্দুল ওয়াহহাব ও তাঁর ভাই শাইখ সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীও ওহাবী তাকফীরী মতবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। তৎকালীন বিখ্যাত হাম্বলি আলেম ও ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের ভাই শাইখ সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী ওহাবী মতবাদের বিরুদ্ধে লিখলেন একটি বই ” আস স্বাওয়ায়িকুল ইলাহিয়‍্যাহ ফীর রদ্দি আলাল ওয়াহহাবিয়া”। কিন্তু নজদে ও দিরিয়াতে চলতে থাকল ওহাবী সৌদি ত্রাসের রাজত্ব।

এমনকি ইবনে আব্দুল ওহাবের পিতা আব্দুল ওয়াহহাব ও তাঁর ভাই শাইখ সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীও ওহাবী তাকফীরী মতবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। তৎকালীন বিখ্যাত হাম্বলি আলেম ও ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের ভাই শাইখ সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী ওহাবী মতবাদের বিরুদ্ধে লিখলেন একটি বই ” আস স্বাওয়ায়িকুল ইলাহিয়‍্যাহ ফীর রদ্দি আলাল ওয়াহহাবিয়া”। কিন্তু নজদে ও দিরিয়াতে চলতে থাকল ওহাবী সৌদি ত্রাসের রাজত্ব।

এর ফলে নজদের জণগণ প্রথম থেকেই ওহাবী সৌদী দের বিরুদ্ধে রেগে ছিলেন। কিন্তু সৌদ আল আওওয়ালের রাজত্বে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ও শুরু হয় ওহাবী সৌদি বিরোধী বিপ্লবের।

১৮৬৫ সালে সংঘটিত বনী খালিদ, ওজমান ও নাজরান বাসীদের ওহাবী সৌদ বিরোধী বিপ্লব সংঘটিত হয়। এটি সাওরাতুল ইয়াম বা ইয়ামের বিপ্লব নামে পরিচিত।

এর পর দিরিয়াতে ওহাবী-সৌদীদের বিরুদ্ধে যে ভয়ঙ্কর বিপ্লব শুরু হয় যেটি ওহাবী ও সৌদ সাম্রাজ্যের প্রথমবারের মতো ইতি টেনে দেয় সেটি হল আরব বিপ্লব , যা কেবল হিজাজ শরীফ নয় ছাড়িয়ে পড়ে সারা আরবে।

১২২০ খৃষ্টাব্দে দিরিয়ার তদানীন্তন শাসক সৌদ আল আওওয়াল বা প্রথম সৌদ উসমানীয়দের সাথে একটি চুক্তির ভিত্তিতে পবিত্র হিজাজ শরীফে প্রভাব স্থাপন করেন । শাসন ক্ষমতা পেয়ে পূর্ববর্তী দিরিয়ার সৌদি ওহাবি শাসকদের মতো সাধারণ মানুষের উপর অত‍্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়ে দেন।

শাসনে আসার পর সৌদ আল আওওয়াল শুধু হিজাজ নয় অন‍্যান‍্য আরবীয়দের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। তিনি এসময় মিসরীয় ও সিরীয়দের হজ্ব বন্ধ ঘোষণা করেন ও তাদের বিরুদ্ধে কড়া শর্ত আরোপ করেন। সমকালীন ঐতিহাসিক যাইনী দাহলান বলেন সৌদ মিশরীয় ও সিরীয় হাজীদের পালকিগুলো তিনি পুড়িয়ে দেন। ঐতিহাসিক নাসির সুয়াইদ লিখেছেন যে, এসময় মক্কাতে মিশরীয় ও সিরীয় হাজীদের পাল্কী আনার বিরুদ্ধে তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পাল্কী আনলে মিশরীয় ও সিরীয়দের হত‍্যার হুমকি দেন সৌদ আল আওওয়াল। এছাড়া পরবর্তী বছর সাইয়‍্যেদ আব্দুল্লাহ পাশার নেতৃত্বে একদল সিরিয়ার হাজী হজ করতে আসেন কিন্তু সৌদ আল আওওয়াল তাঁদের হজ্ব পালনে বাঁধা দেয়। ফলে পবিত্র হিজাজে এসেও শামের হাজীরা বিনা হজে ফিরে যান।

সৌদ ও ওহাবীদের অত‍্যাচার তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। বহু মানুষ হিজাজ থেকে সিরিয়া, ইয়ামেন, মিশর, সুদান, তুরস্ক প্রভৃতি জায়গায় হিজরত করেন।

 

কিন্তু সৌদ আল আওওয়াল ইরানের শীয়া রাজবংশ শাহদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেছিলেন। এসময় তিনি ইরানের শাহ প্রথম প‍্যাহলভী ও ইহুদীদের সাথে উপঢৌকন, গোলাম ও বাঁদী বিনিময় করতেন যা নজদবাসী ও আলেম ওলামাদের রাগান্বিত করে

কিন্তু সৌদ আল আওওয়াল ইরানের শীয়া রাজবংশ শাহদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেছিলেন। এসময় তিনি ইরানের শাহ প্রথম প‍্যাহলভী ও ইহুদীদের সাথে উপঢৌকন, গোলাম ও বাঁদী বিনিময় করতেন যা নজদবাসী ও আলেম ওলামাদের রাগান্বিত করে।

সৌদ আল আওওয়াল কেবল সিরিয়া বা মিশরীয় নয় তিনি ইয়েমেনীদেরকেও হজ্ব পালনে বাঁধা দেন। সৌদদের এই আচরন হিজাজের বাইরের আরবীয়দেরকেও ক্ষুব্ধ করে ও তাঁরা আলে সৌদ ও ওহাবীদের বিরুদ্ধে বিপ্লব শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে মিশরে এই বিপ্লবের বীজ দানা বাঁধতে থাকে। এসময় মিশরবাসী তুর্কি শাসকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে ওহাবী ও সৌদ দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে । ফলে সুলতান সেলীম রহঃ মিশরকে আদেশ দিলে মিশর শাসক মুহাম্মাদ আলী তাঁর পুত্র তুসূন পাশার নেতৃত্বে একটি মিশরীয় বাহিনী হিজাজে পাঠান । তুসূন বীর বিক্রমে ওহাবী ও সৌদদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালাতে থাকেন।‌ কিন্তু এসময় হিজাজ থেকে সৌদ দের মুলোৎপাটন করতে সক্ষম হলেন না। কারণ সৌদ আল আওওয়াল উসমানীয়দের সাথে চুক্তি করেন ও তিনি পবিত্র হিজাজে উসমানীয়দের কর্তৃত্ব মেনে নেন। ফলে উসমানী সুলতান তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করেন।

এর ফলে আরবীয়রা উসমানীয়দের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন।কারণ তাঁরা চেয়েছিলেন সৌদি ও ওহাবী দের মুলোৎপাটন করতে। কিন্তু তা হল না।

এরপর বিক্ষুব্ধ আরবরা উসমানীয়দের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। অতঃপর মিশর শাসক মুহাম্মাদ আলী পাশা তাঁর অপর সন্তান আব্দুল্লাহ পাশাকে ওহাবী সৌদিদের মুলোৎপাটন করার জন্য আরব বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন। ঐতিহাসিক দাহলান তাঁর ইতিহাস বইতে লিখেছেন যে, এবারেও সৌদিরা উপঢৌকন দিয়ে উসমানীয়দের সাথে চুক্তি করতে চাইল। সৌদ আল আওওয়াল মিসরীয় শাসক মুহাম্মাদ আলী পাশার কাছে চুক্তির লক্ষ্যে দূত পাঠালেন। কিন্তু আরবীয়রা সৌদের পাঠানো দূতকে তিনটি শর্ত দিল যার ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নি। এসকল শর্তের মধ‍্যে ওহাবী সৌদি বর্বরতার ফলে নিহত হওয়া মানুষদের রক্তপণ দিতে হবে‌।

এরপর আরবরা সৌদ ও ওহাবীদের মূলোৎপাটন করার জন্য অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।‌এদিকে সৌদ আল আওওয়াল আরবদের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন‌ । তিনি সম্ভাবতঃ বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর দায়েশী স্বপ্নের সমাধী রচনা করতে আরবরা প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আরবীয় অভিযানের পূর্বে ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে একটি মহামারীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর পূর্বে সৌদ আল আওওয়াল তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ বিন সৌদকে মনোনিত করেন। কিন্তু নজরের আলেম ওলামা আব্দুল্লাহ বিন সৌদের মনোনয়নের বিরুদ্ধে আরবীয় জনগণের পাশে দাঁড়ান।

এদিকে আরব বিপ্লবীরা যখন সৌদ ওহাবী বিরোধী বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন পার্শ্ববর্তী ইয়েমেনী রাজা আলে সৌদের সাথে চুক্তি করে আব্দুল্লাহ বিন সৌদের সহায়তায় সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ইয়েমেন বাসী তা অস্বীকার করে ও এক বিশাল সংখ্যক ইয়েমেনী আরবীয় বিপ্লবী বাহিনীতে যোগদান করেন। ওমানেও বিপ্লবের আগুন ধিকধিক করে জ্বলতে থাকে ও আলে সৌদের ওলিকে হত‍্যা করে ও আরব বিপ্লবী বাহিনীতে যোগদান করেন।

এদিকে হিজাজের আল কাসীম ও নাজদের আলেম ওলামারা সৌদ ওহাবীদের নির্মূলের জন্য প্রচারণা শুরু করেন। তাঁরা মসজিদে মসজিদে আলে সৌদ ও আলে ওহাবের বিরুদ্ধে প্রচার করে দেনঃ

“لن يظهر دين الحق ما لم نطهر هذا الدين من هاتين العائلتين الفاسدتين بالدين و الدنيا و رقاب العرب و المسلمين”

১৮১৪ সাল। আরব বিক্ষুব্ধ বাহিনী‌ আলে সৌদ ও ওহাবীদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। বীরবিক্রমে যুদ্ধের পর আলে সৌদ ও ওহাবীদের মুলোৎপাটন করে ফেলেন। সৌদ রাজা আব্দুল্লাহ বিন সৌদকে পাকড়াও করে মিশরে পাঠানো হয়। মিশর থেকে তাঁকে মুসলিম বিশ্বের রাজধানী ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয়। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও তাকফীরি মতবাদের প্রসার ও মুসলিম হত‍্যার কারণে তাঁকে ১৯১৫ সালে ইস্তাম্বুলে শিরোচ্ছেদ করা হয়।

এদিকে হিজাজের আল কাসীম ও নাজদের আলেম ওলামারা সৌদ ওহাবীদের নির্মূলের জন্য প্রচারণা শুরু করেন। তাঁরা মসজিদে মসজিদে আলে সৌদ ও আলে ওহাবের বিরুদ্ধে প্রচার করে দেনঃ

“لن يظهر دين الحق ما لم نطهر هذا الدين من هاتين العائلتين الفاسدتين بالدين و الدنيا و رقاب العرب و المسلمين”

এদিকে আরবী বিক্ষুব্ধ বাহিনী ওহাবীদের নিধনযোজ্ঞ চালান‌। এদিকে মিশর বাহিনী হিজাজ ছেড়ে চলে গেলে সৌদী বংশের মিশারী বিন সৌদ শাসন ক্ষমতা দখল করে বসলেন। কিন্তু বিক্ষুব্ধ নজদবাসী তাঁকে হত‍্যা করেন। এরপর তুর্কি বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন সৌদকেও হত‍্যা করা হয়।‌ অতঃপর ১২৪৯ হিজরীতে মিশারী বিন আব্দুর রহমান সৌদ নিজেকে মু’মীন আমীর ঘোষণা করলে নযদীরা আবার ক্ষেপে যান ও তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর তুর্কি সৌদের ছেলে ফয়সাল বিন তুর্কি বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন সৌদ ক্ষমতা দখল করতে চাইলেও আরবীয়দের চাপে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। উল‍্যেখ‍্যঃ তাঁর পিতা তুর্কি যখন নিহত হন তখন তিনি আল কাতীফ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন।

এভাবেই পতন হয় প্রথম সৌদি – ওহাবী সাম্রাজ্যের ও পবিত্র ভূমি মুক্তি পায় একটি মহা ফিতনা থেকে।

  • সূত্রঃ

১/ তারীখু আলে সৌদ – ঐতিহাসিক নাসির সুয়ায়িদ

২/তারীখু জাইনী দাহলান

৩/ উইকিপিডিয়া


© টি আর টি বাংলা ডেস্ক