ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজ: এশিয়া-ইউরোপ সংযোগকারী সেতু

 

শাকিল আহমেদ|


বলছি ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ শহর ইস্তানবুলের কথা। কত নামেই না ডাকা যায় ইস্তানবুলকে! ইউরোপের প্রবেশদ্বার, আন্তঃমহাদেশীয় শহর, ইউরোপের বৃহত্তম শহর, রোমান, বাইজেন্টাইন ও অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজধানী। নজরকাড়া ইস্তানবুলের সৌন্দর্যের মূল উৎস হলো বসবরাস প্রণালী। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর তুরস্কে ছুটে আসে প্রায় পাঁচ কোটির অধিক পর্যটক। ২০১৯ সালে তুরস্ক সরকার শুধুমাত্র পর্যটন খাত থেকে আয় করেছে ৩৪.৫ বিলিয়ন ডলার।

বসবরাস প্রণালীর উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অসাধারণ স্থাপত্যের নিদর্শন ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজ। এই ব্রিজকে দ্বিতীয় বসবরাস ব্রিজও বলা হয়ে থাকে। তুরস্কের অর্থনীতিতে যেমন এটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি সৌন্দর্য আর পর্যটন-শিল্প বিকশিত করার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব সর্বাধিক।

ইস্তানবুলের বুক চিরে বয়ে চলা বসবরাস প্রণালী পৃথক করেছে এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশকে। অপরদিকে সংযুক্ত করেছে কৃষ্ণ ও মারমারা সাগরকে।

ইস্তানবুল এমন একটি শহর যা কিনা দুটি মহাদেশে অবস্থিত। এমন শহর সমগ্র পৃথিবীতে একটিই আছে। বসবরাস প্রণালীর পূর্বে এশিয়া প্রান্ত আর পশ্চিম পাশে রয়েছে ইউরোপ প্রান্ত। ইস্তানবুলের এশিয়া প্রান্ত ও ইউরোপ প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত করার জন্য বসবরাস প্রণালীর উপর ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। ইস্তানবুলের অপরূপ সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে এই ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজের অসাধারণ নকশা ও নির্মাণশৈলী।

ঐতিহাসিকভাবে ইস্তানবুল একটি জনপ্রিয় মাইগ্রেশন পয়েন্ট হওয়ায় যে সমস্ত শাসক তুরস্ক শাসন করেছে তারা বহু বছর ধরে প্রচেষ্টা চালিয়েছে উভয় প্রান্তের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য। শেষ পর্যন্ত তাদের স্বপ্ন পূরণ হয় বসবরাস ব্রিজ বা শহীদ ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে। ৩০ই অক্টোবর, ১৯৭৩ সালে বসবরাস ব্রিজ চালু হওয়ার পর এর ধারণক্ষমতা ছিল প্রতিদিন ২৪,০০০ যানবাহন। কিন্তু এই ব্রিজটি নির্মাণ করা হলেও ইস্তানবুলের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিল্পায়ন ও অর্থনীতিক চাপ মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রায় দেখা যেত বসবরাস ব্রিজের ওপর প্রচণ্ড যানজট। এছাড়া ঐতিহ্য ও বৈশ্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত বসবরাস প্রণালীর উপর দিয়ে আরেকটি ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই তৎকালীন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী তুরগুত ওজাল তার অফিশিয়াল গাড়ী চালিয়ে ব্রিজটি উদ্বোধন করেন। অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান মাহমুদ ফাতেহর নাম অনুসারে এই সেতুটির নামকরণ করা হয়, যিনি ১৪৫৩ সালে কনস্ট্যান্টিপোল বিজয় করেন।

বৈশিষ্ট্যঃ

ব্রিজটি সম্পূর্ণ ইস্পাত নির্মিত। এছাড়া এই ব্রিজের ঝুলন্ত কেবলগুলোও ইস্পাতের। এই ব্রিজের উপর দিয়ে মাত্র ১,৫১০ মিটার পথ পাড়ি দিয়েই এশিয়া থেকে ইউরোপে প্রবেশ করা যায়। অর্থাৎ এই ব্রিজটির সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য ১,৫১০ মিটার। ব্রিজটির সম্পূর্ণ প্রস্থ ৩৯ মিটার। স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১,০৯০ মিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ফাতেহ সুলতান মুহাম্মদ ব্রিজের উচ্চতা ২১০ ফুট। এটি একটি ৮ লেন বিশিষ্ট সড়ক সেতু। এছাড়া একটি ইমারজেন্সি লেনও আছে। এটা বর্তমানে পৃথিবীর ২৪তম দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। কিন্তু উদ্বোধনের সময় এটি পৃথিবীর ৫ম দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু ছিল। এছাড়া এটি বর্তমানে পৃথিবীর ১৪ তম দীর্ঘ ইস্পাত নির্মিত ব্রিজ।

বসবরাস ব্রিজের ৫ কিলোমিটার উত্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ফাতিহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজ। তুরস্কের ইউরোপ অংশের হিসারুস্তু জেলা এবং এশিয়া অংশের কাভাচিক জেলা এই ব্রিজের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে। ব্রিজটি বসবরাসের দু’পাড়ে দুটি সুউচ্চ টাওয়ারের মাধ্যমে ঝুলন্ত। দুই টাওয়ারের মাঝখানের অংশকে মূল স্প্যান বলা হয়, যার দৈর্ঘ্য ১,০৯০ মিটার। অর্থাৎ, দুটি টাওয়ারের মধ্যবর্তী দূরত্ব ১ হাজার ৯০ মিটার। আর প্রতিটি টাওয়ারের উচ্চতা ১০৭.১ মিটার।

ইস্পাত ক্যাবলের ব্যাস ৫.৩৮ মিলিমিটার। এই ব্রিজটি নির্মাণে মোট যে পরিমাণ কেবল ব্যবহৃত হয়েছে তার দৈর্ঘ্য ৫১,৪৮৬ মিটার আর মোট ওজন ৯,৫০০ টন। এটি নির্মাণে ২০,০০০ কিউবিক মিটার কনক্রিট ব্যবহার হয়েছে।

১৯৮৫ সালের ৫ই ডিসেম্বর ব্রিজটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন ধারণা করা হয় যে, এটি নির্মাণ করতে প্রায় ১,১০০ কর্ম দিবস সময় লাগবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ১৯২ দিন আগেই ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই ব্রিজের নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

ফ্রিম্যান ফক্স এবং তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বসবরাস টেকনিক্যাল কনসাল্টিং কর্প যৌথভাবে এই ব্রিজের নকশা প্রণয়ন করেন। তুরস্ক, জাপান ও ইতালির কয়েকটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি যৌথভাবে এর নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করে। ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজের নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল তৎকালীন ১৩০ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে টার্কিশ স্টেট হাইওয়ে এই ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে।

বাণিজ্যিক গুরুত্বঃ

১৯৮৮ সালে নির্মাণের পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে এই ব্রিজ থেকে টোল আদায় হয়েছে প্রায় ৮.৪ বিলিয়ন টার্কিশ লিরা। আর বিগত ৩০ বছরে এই ব্রিজ দিয়ে প্রায় ৮৪ কোটি ৭ লক্ষ গাড়ি পারাপার হয়েছে ।

বর্তমানে প্রতিদিন এই ব্রিজ দিয়ে ১,৫০,০০০ গাড়ি চলাচল করে । ২০১৯ সালে বসবরাস ব্রিজ ও ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজ যৌথভাবে টোল আদায়ের মাধ্যমে ২৬৮ মিলিয়ন লিরা আয় করে, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকা।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, আপনি যদি গাড়ি নিয়ে এশিয়া থেকে ইউরোপ প্রান্তে যান তাহলে আপনাকে কোনো টোল দিতে হবে না। কিন্তু যদি ইউরোপ থেকে এশিয়া প্রান্তে যেতে চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে টোল দিতে হবে। বসবরাস ব্রিজের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম। টোল প্রদানের ক্ষেত্রে ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে নগদ টাকা পেমেন্টের নিয়ম বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে OGS ছাড়াও কন্টাক্টলেস স্মার্ট স্টিকার HGS পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে।

১৫ই জুলাই, ২০১৬ সালে তুরস্কের সামরিক অভ্যুত্থানের সময় বিদ্রোহী সৈন্যরা ব্রিজটিতে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এসময় তারা ব্রিজটি দখল করে রাখে এবং ব্রিজের উপর দিয়ে সাঁজোয়া যান নিয়ে টহল দিতে থাকে। উদ্বোধনের পর এই প্রথমবার ব্রিজটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়। ব্রিজের উপর প্রেসিডেন্ট এরদোয়োনের ডাকে সাড়া দেওয়া জনতার সাথে বিদ্রোহী সেনাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে বিদ্রোহী সেনাদের হটিয়ে জনগণ ব্রিজের দখল নিতে সক্ষম হয় এবং দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর আবার যান চলাচল শুরু হয়।

ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজটি শুধু সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের অর্থনীতিতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বৈশ্বিকভাবেও এর গুরুত্ব কম নয়। কারণ এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে আন্তঃমহাদেশীয় সংযুক্ত সড়ক। নিঃসন্দেহে ফাতেহ সুলতান মাহমুদ ব্রিজটি তুরস্কের স্থাপত্য নিদর্শন শিল্পের অনন্য নিদর্শন।

( আর্টিকেল টি Roar বাংলা নিউজ পোর্টাল কর্তৃক প্রকাশিত হয়)