বিলেতি আরবদের আরবী সাহিত্যচর্চা

 

মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|


বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল একটি নতুন যুগের সূচনালগ্ন। মানবসভ‍্যতার ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ। এসময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধ্যান ধারণা, প্রযুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে আসে আমূল পরিবর্তন। অষ্টাদশ শতকের পাশ্চাত্য রেঁনেসার আরব বিশ্বের উপর জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে। জ্ঞান- বিজ্ঞান, ব্যবসা বাণিজ্য প্রভৃতী ক্ষেত্রে প্রাচ‍্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে আদান-প্রদানের মাধ‍্যমে একটি নতুন অধ‍্যায়ের সূচনা হয়।

আরবী সাহিত্যের বিকাশ ও নবজাগরণে তদানীন্তন দিকপাল সাহিত্যিক ও লেখকরা বিশেষ ভূমিকা রাখেন, তাঁদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেন তৎকালীন উসমানীয়রা।

এই যুগে আরব বিশ্বেও পরিবর্তনের জোয়ার আসে। জাতীয়তাবাদের ভূত তাদের ঘাড়ে চেপে বসে। এসময় আরবীয় সাহিত্যিকরাও পিছিয়ে থাকলেন না। আরবী সাহিত্যের বিকাশ ও নবজাগরণে তদানীন্তন দিকপাল সাহিত্যিক ও লেখকরা বিশেষ ভূমিকা রাখেন, তাঁদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেন তৎকালীন উসমানীয়রা। ফলস্বরূপ শুরু হয় আরবী সাহিত্যের স্বর্ণময় যুগ। এসময় আরবী সাহিত্য বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে বিভিন্ন নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়।

আরবী সাহিত্যের নবজাগরণঃ

আরবী সাহিত্যের নবজাগরণের সূচনা মূলতঃ শুরু হয় ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিশর বিজয়ের পর থেকে। যুগটা শুধু আরবী সাহিত্য নয় বরং ‘আরব নবজাগরণের’ সূচনালগ্ন বলা যেতে পারে। এবিষয়ে আরবী সাহিত্যের ইতিহাসের বিদগ্ধ পন্ডিত ডক্টর আহমাদ যাইয়াত তাঁর আরবী সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন,

“كانت مصر في ذالك العهد تحت سلطان العثمانيين حكما ، و تحت سيطرة المماليك فعلا ”

অর্থাৎ, ঐযুগে মিশর শাসনের দিক দিয়ে উসমানীয় সুলতানের অধীনে ছিল ও কার্যত তা মামলুকি সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। নেপোলিয়ন মিশরে আসার সময় বিভিন্ন জ্ঞানী গুণী ও পন্ডিতদের সাথে নিয়ে আসেন। তাঁরা মিশরে গমন করেন ও মিশর ও মিশরীয় উৎসের উপর একটি সমীক্ষা চালান। তাঁরা সেখানে আধুনিক গ্রন্থাগার, পরীক্ষাগার প্রভৃতি নির্মাণ করেন ও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। এটা বলাবাহুল্য যে, ফরাসী গণ মিশর দখল করে বিভিন্ন দিক থেকে মিশরকে সমৃদ্ধ করেছিলেন , অপরপক্ষে ব্রিটিশরা মিশর লুন্ঠন করেছিল। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশরে আসার সময় ভ্যাটিকান থেকে একটি মুদ্রণ যন্ত্র সাথে নিয়ে আসেন। ঐতিহাসিকদের মতে এই মুদ্রণ যন্ত্রটিই ছিল মিশরের প্রথম আরবী মুদ্রণ যন্ত্র। এই যন্ত্রের মাধ্যমে আরবী ও ফরাসী উভয় ভাষাতেই মুদ্রণ করা যেত। এখান থেকে আল হাওয়াদিস ও আল তানবীহ নামক দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আল জাবারতী, আল আত্তার প্রমুখের মতো আরবীয় জ্ঞানের সমুদ্রগণ মিশরীয় এসব লাইব্রেরী, পরীক্ষাগার দেখে প্রভাবিত হন। এরপর মুহাম্মাদ আলী পাশার যুগ থেকে প্রকৃত অর্থে নবজাগরণের সূচনা হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন মিশরে নবজাগরণের সূচনা হয় ঠিক তখন লেবানন ও সিরিয়াতেও এই নবজাগরণের বাতাস বইতে থাকে ‌।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে আরবী সাহিত্যের নবজাগরণ মূলতঃ আরবী মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপনের ফল। এসময় আরবী সাহিত্যে ছোটগল্প ( القصة القصيرة) , উপন্যাস ( الرواية ) , নাটক ( المسرحية ) , প্রবন্ধ ( المقالة) প্রভৃতির মতো সাহিত্যের নতুন শাখার উৎপত্তি হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে আরবী সাহিত্যের নবজাগরণ মূলতঃ আরবী মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপনের ফল। এসময় আরবী সাহিত্যে ছোটগল্প ( القصة القصيرة) , উপন্যাস ( الرواية ) , নাটক ( المسرحية ) , প্রবন্ধ ( المقالة) প্রভৃতির মতো সাহিত্যের নতুন শাখার উৎপত্তি হয়। এবং আরব বিশ্বে আহমাদ শাওক্বী, হাফিজ ইব্রাহিম, কামিল কিলানী, খলীল জিবরান প্রমূখের মতো দিকপাল সাহিত্যিকদের জন্ম হয়। সাহিত্যচর্চার সাধনা ও তপস্যার মাধ্যমে তাঁরা আরবী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।

বিলেতে আরব মাহজার শরনার্থীদের সাহিত্যচর্চাঃ

আরবী শব্দ মাহজার শব্দের অর্থ হল শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল ।বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আরব বিশ্ব বিশেষতঃ সিরিয়া, লেবানন থেকে আরবীয়রা ( অধিকাংশই আরবীয় খৃষ্টান) পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন। তাদের এই বিলেত গমনের কারণ হিসেবে ভারতীয় অধ‍্যাপক ডক্টর আইয়ুব তাজ নাদভী তাঁর বইতে খাদ‍্যসংস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। এসব শরণার্থীরা পাশ্চাত্যের গমন করে সেখানকার সমাজ, ভাষা , রীতিনীতি ও জনজীবনের সাথে মিশে যান

এসময় কিছু আরবী সাহিত্যপ্রেমিক পশ্চিমা দেশগুলোতে গমন করেন ও সেখানেই তাঁরা চাঁদের হাট বসান ও আরবী ও ইংরেজি সাহিত্যের মধ‍্যে আদান প্রদান করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাতে আরবীয় সাহিত্যপ্রেমীকদের উদ‍্যোগে দুইটি ভিন্নধারার সাহিত্য সমাজ গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সাহিত্যিকদের নিয়ে গঠিত এই দুইটি সাহিত্য সমাজ আরবী সাহিত্যের নবজাগরণে বড় ভূমিকা পালন করে।

আর রাবিতাতুল কলামিয়‍্যাহঃ

উত্তর আমেরিকাতে যে সাহিত্য সমাজ গড়ে ওঠে সেটি আর রাবিতাতুল কলামিয়‍্যা নামে পরিচিত। আরবী সাহিত্যের বিখ্যাত পন্ডিত খলীল জিব্রান প্যারিস থেকে ফিরে আসার পর , ১৯২০ খৃষ্টাব্দে ২০ তারিখের রাতে লেবানন ও সিরিয়ার তরুণ সাহিত‍্যিকরা মিলিত হয়ে আমেরিকার নিউইয়র্কে এই সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এর সভাপতির আসনটি খলীল জিব্রানই অলঙ্কৃত করেন। এছাড়া এই সাহিত্য সমাজের নক্ষত্র সমূহের অন‍্যতমরা ছিলেন, মিখাইল নু’য়াইমা, আব্দুল মসীহ হাদ্দাদ, নাদারাহ হাদ্দাদ, ইলিয়াস আতাউল্লাহ, উইলিয়াম ক‍্যাটসফ্লিস, নসীব আরীদ্বাহ, রশীদ আইয়ূব , ওয়াদী বাহূত্ব , ইলিয়া আবূ মাদ্বী, আমীন রীহানী, আহমাদ যাকী আবূ শাদী , আস’য়াদ রুস্তম প্রমূখ। তাঁরা পাশ্চাত্যের সাহিত্যের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেন ও আরবী সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে তা প্রতিফলিত করেন। তাঁরা আমেরিকার ভূমিতে আরবী সাহিত্যের প্রসার ঘটান। এসময় তাঁরা ‘ আস সা’ইহ’ ও ‘ আল ফুনূন’ নামে দুইটি পত্রিকা প্রকাশ করেন ও উক্ত পত্রিকার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের ধ‍্যানধারণা ও চিন্তাভাবনা আমেরিকাবাসীদের সাথে ভাগ করে নেন। আরবী সাহিত্যের সাথে সাথে ইংরাজি সাহিত্যেও এই সাহিত্যিকরা বড় অবদান রাখেন। যেমন ১৯২০ খৃষ্টাব্দে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা পাবার পর জিবরান খলীল জিবরান একাধারে ‘The Madman’ , ‘The Prophet’, ‘The Forerunner’ প্রভৃতি ইংরেজি বইয়ের মাধ‍্যমে ইংরেজি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। তাঁর লিখিত The Prophet গ্রন্থটি এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করে যে, ১৯২৩ সালের পর প্রায় চল্লিশটি ভাষায় তা অনুদীত হয়। এছাড়া এই লেখকের লেখা আল মূসিক্বা , ‘আরাই’সুল মুরূজ , ইয়াসূ’ ইবনুল ইনসান প্রভৃতী গ্রন্থ লেখেন।

তাঁর লিখিত The Prophet গ্রন্থটি এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করে যে, ১৯২৩ সালের পর প্রায় চল্লিশটি ভাষায় তা অনুদীত হয়।

উত্তর আমেরিকার এই সাহিত্য সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এনারা প্রাচীন রীতিনীতিকে পরিত‍্যাগ করে নব‍্যপন্থা অবলম্বন করেন। ১৯৩১ সালে জিব্রানের মৃত্যুর সাথে সাথে এই সাহিত্য সমাজ ও পথচলার ইতি টানে।

আল ‘উসবাতুল আন্দালুসিয়‍্যাহঃ

উত্তর আমেরিকার মতো দক্ষিণ আমেরিকাতেও একটি ল‍্যাটিন আমেরিকান মাহজার সাহিত্য সমাজ গড়ে ওঠে। ১৯৩৩ সালে গড়ে ওঠা এই সাহিত্য সমাজ ‘ আল উসবাতুল আন্দালুসিয়্যাহ’ নামক এই সাহিত্য সমাজের প্রধান ছিলেন প্রখ্যাত আরবী সাহিত্যিক মিশেল মা’লূফ। এছাড়া ইলিয়াস ফারহাত, রশীদ খূরী, ফাওযী মা’লূফ, জর্জ সৈদাহ , শুকরুল্লাহ জার প্রমূখরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। উত্তর আমেরিকার মতো এঁরাও দক্ষিণ আমেরিকাতে আরবী সাহিত্যের প্রচার ও প্রসার ঘটান ও আরবী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।

তবে উত্তর আমেরিকার মতো এঁনারা কিন্তু প্রাচীন সাহিত্যরীতির বিরোধিতা করেন নি। তাঁদের সাহিত্য কর্মের প্রাচীন সাহিত্যরীতির ছাপ স্পষ্ট।

আরবের এসব সাহিত্য তাপসরা বিদেশের মাটিতে আরবী সাহিত্যের বিকাশ সাধন করেন। এসব মাহজার সাহাত‍্যিকদের কিছু বৈশিষ্ট্য হল এনারা তাঁদের সাহিত্য কর্মে নিজস্ব মতামত প্রদান বা الطابع الشخصي এর উপর জোর দিয়েছেন। যেমন জিবরান প্রথাগত নিয়মনীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন তাঁর সাহিত্য কর্মে। অপরদিকে আল কারাঊই তাঁর কর্মের মাধ্যমে দেশের প্রতি ভালোবাসা কে তুলে ধরেছেন।

শরণার্থী হিসেবে মাতৃভূমির প্রতি তাঁদের প্রগাঢ় ভালোবাসাও তাঁদের সাহিত্যকর্মের অলঙ্কার ছিল।উভয় উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার মাহজারদের এটি একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। সাহিত্যিক না’মা কাযান তাঁর الأرز নামক মুআল্লাকাতে লিখেছেনঃ

كنت مع الله في قريتي
فصرت بلا الله في غربتي
অর্থাৎ, আমি আমার গ্রামে আমার আল্লাহর সাথে ছিলাম। অতঃপর আমার (শরণার্থীর) দূরের ভূমিতে (গুরবাতুন অর্থ বিতাড়িত / নিজের ভূমি থেকে দূরের কোন ভূমি) আমি আল্লাহ হারা হয়ে গেছি]। এছাড়া এসব সাহিত্যিকরা আধ‍্যাত্মিক চিন্তাধারা, সঙ্গীতশিল্প , চিত্রায়ণ প্রভৃতী ফুটিয়ে তুলেছেন।

অবশেষে বলা যায় যে, আরবী সাহিত্যের নবজাগরণে আরবের মাদরাসাতুদ দিওয়ান, অ্যাপোলো প্রভৃতী সাহিত্য সমাজ যেমন দেশিয় সাহিত্য কে সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রেখেছে তেমনি বিদেশের ভূমিতে আরবী সাহিত্যের প্রসার ও বৈদেশিক সাহিত্যের সাথে আরবী সাহিত্যের সেতুবন্ধন করে নবজাগরণের নবদিগন্ত উন্মোচনে বিলেতি মাহজার সাহিত্য সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তথ‍্য্যসূত্রঃ

• الشعر و الشعراء في الادب العربي الحديث للدكتور ايوب تاج الندوي

• আধুনিক আরবী সাহিত্যের ইতিহাস, ডক্টর মুহাম্মাদ মাহদী হাসান

• تاريخ الادب العربي لأحمد حسن الزيات

• Complete Works of Khalil Gibran , Shrijee’s Book International, New Delhi

 

লেখক পরিচিতিঃ

 

মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক টি আর টি বাংলার একজন সাংবাদিক ও বাংলা উসমানী পরিবারের সদস্য।