কৃষ্ণ বিভ্রাট ও ভাগবৎ গীতা

আসমা আইয়ুব খান|


হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থ সমূহের মধ্যে অন্যতম ও সর্বাধিক পঠিত ধর্মগ্রন্থ হল শ্রীমদভাগবৎ গীতা।আঠারোটি অধ‍্যায়সম্বলিত এই গ্রন্থটির রচনাকাল ও সংকলক সম্পর্কে সঠিকভাবে বলা কিছু বলা হয়নি। তবে ধারণা করা হয় প্রায় ২০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে এই ধর্মগ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, গীতা হল হিন্দু ধর্মের ঈশ্বর কৃষ্ণ কর্তৃক পান্ডব যোদ্ধা অর্জুনের প্রতি উপদেশ।

হিন্দুধর্মের ধর্মগ্রন্থ গুলি যথাযথভাবে পড়লে এটা বুঝতে অথবা জানতে অসুবিধা হয় না যে, হিন্দু ধর্ম একেশ্বরবাদের শিক্ষা দেয়।

যাহোক, কৃষ্ণ কে? এবিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমার দৃষ্টিগোচর হয়, যেগুলো আসলে বিভ্রান্তিকর। হিন্দুধর্মের ধর্মগ্রন্থ গুলি যথাযথভাবে পড়লে এটা বুঝতে অথবা জানতে অসুবিধা হয় না যে, হিন্দু ধর্ম একেশ্বরবাদের শিক্ষা দেয়। খোদ গীতার সপ্তম অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে বলা হয়েছে,

मंत्त: परतरं नान्यत्किंचिदस्ति धनन्जय:

অর্থাৎঃ হে ধনঞ্জয় ( অর্জুন) ! আমি ছাড়া কোন ঈশ্বর নেই।

গীতার অপর একটি শ্লোকে চিরন্তন মোক্ষ লাভ করার জন‍্য একমাত্র ঈশ্বরের ইবাদত বা উপাসনার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। গীতার ১৮ নম্বর অধ্যায়ের ৬২ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছেঃ
तमेव शरणं गच्छ सर्व भावते भारत!

অর্থাৎঃ হে ভারত ( অর্জুন) ! তুমি সর্বপ্রকারে ঐ পরমেশ্বরেরই আশ্রয়ে যাও।

হিন্দুধর্মের সবথেকে পবিত্র ও প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ বলে যেটাকে বিবেচনা করা হয়, সেটা হল ঋগ্বেদ। এই ঋগ্বেদে ঈশ্বরের একত্ববাদের বহু প্রমাণ রয়েছে। যেমন ঋগ্বেদের প্রথম মন্ডলের সপ্তম সুক্তের দশম মন্ত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে , “অস্মাকমস্তু কেওয়ালাহ” বা ” কেননা আমি ছাড়া অন্য কোন ঈশ্বর নেই”। হিন্দু ধর্মের জ্ঞানতাপস ও বিখ্যাত বৈদিক পন্ডিত মহর্ষি দয়ানন্দ স্বরস্বতী তার হিন্দী ভাষ‍্যে এই অনুবাদ করেছেন ।

কিন্তু ভাগবৎ গীতাতে যে কৃষ্ণ কে হিন্দু সম্প্রদায় ঈশ্বর বলে মনে করেন, সেই কৃষ্ণ কি আসলেই কোন ঈশ্বর? ভাগবৎ গীতাতে কৃষ্ণের যে ধারণা পাওয়া যায় তা থেকে তাঁকে ঈশ্বর হিসেবে ধারণা করার কোন উপায় নেই। আবার অনেকে কৃষ্ণ কে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র বলে মনে করেন। যেমন ছন্দযোজ্ঞ উপনিষদে কৃষ্ণ কে দেবাকিপুত্র বা দেবাকির পুত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে তিনি ঘোড়া অঙ্গিরাসা নামক এক সূর্য উপাসকের শিষ্য ছিলেন।

এখানে আমরা পরিস্কার উপলব্ধি করতে পারি যে, কৃষ্ণ বৈদিক জ্ঞানের বিরোধী ছিলেন। তিনি ঐশ্বরিক বৈদিক শিক্ষার উপর ।

বিখ্যাত ভারতীয় পন্ডিত সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন তাঁর গীতার ভূমিকাতে কৃষ্ণ কে প্রাচীন যদু পরিবারের ভ্রস্নি (Vrasni) বা সত্থতা (Satvata) শাখার একজন ও হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তাঁর গীতার ভূমিকাতে স্পষ্ট লিখেছেন,

” Krishna was opposed to the sacredotalism of the Vedic Religion and preached the doctrines which he learnt from Ghora Angirasa.”

(Bhagavadgita, S. Radakrishnan , Pg. 29)

এখানে আমরা পরিস্কার উপলব্ধি করতে পারি যে, কৃষ্ণ বৈদিক জ্ঞানের বিরোধী ছিলেন। তিনি ঐশ্বরিক বৈদিক শিক্ষার উপর ।

আবার ভগবৎ গীতাকে যদি আমরা আরেকটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে আমরা দেখব যে, গীতার মধ্যে কৃষ্ণ কে ঈশ্বরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাহলে এখানে প্রশ্ন হল, কৃষ্ণ যদি প্রকৃতার্থে ঈশ্বর হয়ে থাকেন তাহলে তিনি বৈদিক শিক্ষার বিরোধিতা করে বৈদিক শিক্ষার উপর অপর এক শিক্ষাকে গুরুত্বারোপ করলেন কেন? একজন ঈশ্বর কিভাবেই বা নিজের শিক্ষার বিরোধিতা করতে পারেন?

আবার গীতার মধ্যে কিছু এমন শ্লোক রয়েছে যেগুলো আসলেই কৃষ্ণের মতবিরুদ্ধ এবং সেগুলো বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। যেমন,কৃষ্ণ গীতার মধ্যে অন‍্যান্য দেবতার পূজা করতে নিষেধ করলেও ( অধ‍্যায় ৭ ; শ্লোক ২৩) তিনি নিজেই কিন্তু সূর্যের উপাসনায় বিশ্বাসী ছিলেন। যেহেতু তিনি বেদের উপর তাঁর সূর্য উপাসক গুরু ঘোড়া অঙ্গিরাসার শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।তিনি গীতার মধ‍্যে চতুর্থ অধ্যায়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোকে বলেছেন যে কোন নতুন জিনিস প্রচার করছেন না, তিনি এই শিক্ষা পূর্বে বিভাসবন (Vivasvan) কে দিয়েছিলেন যা পর্যায়ক্রমে মনু , ইক্ষবাকু এবং এইভাবে পরবর্তী রাজর্ষীদের কাছে পৌঁছে যায়। রাধাকৃষ্ণন রাজর্ষীর ব্যখ‍্যা দিতে গিয়ে বলেছেন যে, রাম , কৃষ্ণ, বুদ্ধ সবাই রাজর্ষী ছিলেন। কিন্তু এখানে অবতার না বলে রাজর্ষী বলা হল কেন? তাহলে কি বেদে বর্ণিত রাম অথবা বৌদ্ধদের বুদ্ধরা পরমেশ্বরের দূত বা রাসূল ছিলেন? এখানে কিন্তু হিন্দুদের অবতার ধারণাটি প্রয়োগ করা যাবে না। কারণ, ঈশ্বর রাজর্ষী বলতে যদি অবতার বুঝিয়ে থাকেন তাহলে বলতে হবে যে পরবর্তী অর্থাৎ ৩ নম্বর শ্লোকে তিনি এই রাজর্ষীদের মধ‍্যে যেহেতু অর্জুনকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাহলে অর্জুনও ঈশ্বরের অবতার। কিন্তু এটা কি ভুল ধারণা নয়?

ঈশ্বর যদি নিজেই পৃথিবীতে অবতার রূপে আসেন তাহলে সেক্ষেত্রে তাঁকে অপর অবতার থেকে শিক্ষা নেবার প্রয়োজন হয় কিভাবে?

আমরা অর্জুনকে ঈশ্বরের অবতার রূপে যদিওবা মনে করি। তাহলেও কিন্তু সমস‍্যার সমাধান হচ্ছে না। মহাভারতে কৃষ্ণ কে অর্জুনের বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু অর্জুন যদি প্রকৃতার্থে অবতার হন তাহলে অর্জুনকে নতুন করে শিক্ষা দেওয়ার কি প্রয়োজন? তাছাড়া অবতার ধারণাটিও একটি ভুল ধারণা। ঈশ্বর যদি নিজেই পৃথিবীতে অবতার রূপে আসেন তাহলে সেক্ষেত্রে তাঁকে অপর অবতার থেকে শিক্ষা নেবার প্রয়োজন হয় কিভাবে? ঈশ্বর কিভাবেই বা অপরের মুখাপেক্ষী হতে পারেন? এখানে কিন্তু অবতার শব্দের আড়ালে আমরা রসূল শব্দের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। আর এটাই মনে হয় সঠিক ধারণা।

পরিশেষে বলা যায়, হিন্দু ধর্ম নিয়ে বহু ভুল ধারণা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ‍্যে রয়েছে। এবং আমার মতে গীতা কোন ঐশ্বরিক গ্রন্থ নয় এবং গীতায় বর্ণিত কৃষ্ণ একটি কল্পিত চরিত্র।


© দিরিলিশ রিসার্চ উইং