পেগাসাস স্পাইওয়ারের গুপ্ত সন্ত্রাসবাদ

ফতিমাহ আঞ্জুম খান|


গত পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আড়িপাতার প্রবনতা বেড়েছে। বিশেষ করে রাজতন্ত্রীক দেশগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর প্রাইভেট কোম্পানির কাছ থেকে অত্যাধুনিক স্পাইওয়ার আমদানি করে সেগুলোকে অবৈধ পথে সাংবাদিক, সমালোচক প্রমুখদের উপর ব্যবহার করে গোপন বিষয়ে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণতঃ এসব স্পাইওয়ার দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অপরাধীদের গোপন বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু বর্তমান আল্ট্রা মডার্ন টেকনোলজির যুগে কিছু দেশ এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে।

আধুনিক যুগে যত স্পাইওয়ার প্রযুক্তি রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম সমালোচিত স্পাইওয়ার হল ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়ার। ইসরাইলের গোপন সাইবার আর্ম এন এস ও গ্রুপের তৈরি অত‍্যাধুনিক প্রযুক্তির এই স্পাইওয়ারটা সাধারণতঃ মোবাইলে আড়িপাতার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বিশেষের মোবাইলে আড়িপেতে তার অজান্তেই তার এসএমএস, কল লিস্ট চেক করা, গোপন তথ‍্য জানা এমনকি সোশ‍্যাল মিডিয়ার পাসওয়ার্ড ও চুরি করে নেওয়া যায়।

সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে এই স্পাইওয়ারটি আন্তর্জাতিক পত্র পত্রিকার শিরোনামে রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের ব্যাক্তিগত মোবাইল হ্যাক করার অভিযোগ ওঠার পর থেকে এই স্পাইওয়ারটি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। শোনা যাচ্ছে ঐ যুবরাজ পেগাসাস স্পাইওয়ার ব্যবহার করে এই কাজ সম্পাদন করেছেন।

যদিও পূর্বে বহু দেশের সরকার সন্দেহভাজন বহু সাংবাদিকের উপর নজরদারি চালাতে পেগাসাস ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে সিটিজেন ল্যাব নামের একটি সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ‍্যে ৪৫ টি দেশের সাংবাদিকদের উপর নজরদারি চালাতে এই স্পাইওয়ারটি ব্যবহার করা হয়েছে। আড়িপাতার ক্ষেত্রে যেসব দেশ বড় ভূমিকা রেখেছে তাদের মধ‍্যে উল্যেখযোগ‍্য হল আরব আমিরশাহী ও রুয়ান্ডা। যদিও এন এস এ গ্রুপ একাধিকবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্টের ভিত্তিতে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে পেগাসাস স্পাইওয়ার টি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে।

২০১৬ সালে আরব আমিরশাহীর ব্লগার আহমাদ মনসূরের বিরুদ্ধে পেগাসাস প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয় বলে ধারণা করা হয়। আহমাদ মনসূর উপরোক্ত সিটিজেন ল্যাবের সাথে স্পাইওয়ারের বিষয়ে গোপন তথ‍্য প্রকাশ করেছেন। তাঁর পর মাতি মুনজিব নামক মরোক্কোর এক কলামিস্টের উপর এই স্পাইওয়ারটি ব্যবহার করা হয়। এই ব্যক্তি মরোক্কান এসোসিয়েশন ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (AMJI) এর প্রতিষ্ঠাতা বর্গের একজন ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি বেশকিছু সন্দেহজনক এসএমএস পেয়েছিলেন।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আমেরিকার ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জামাল খাশোগির বিরুদ্ধে সৌদি আরবের রাজপরিবারের ঘাতকরা এই স্পাইওয়ার ব্যবহার করে। রাষ্ট্রসংঘের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, খাশোগির একজন বন্ধু ও একজন সহচরের ফোনে এই পেগাসাস স্পাইওয়ার ইনস্টল করে সৌদি কর্তৃপক্ষ খাশোগিকে ট্র্যাক করে ফেলে।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে পানামার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন মার্টিনেলি বিভিন্ন সাংবাদিক সহ ১৫০ জনের উপর চরবৃত্তি করতে অবৈধভাবে পেগাসাস স্পাইওয়ার ব্যবহারে অনুমতি দিয়েছিলেন।

সাম্প্রতিক ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে হোয়াটসঅ্যাপ এই এসএনও গ্রুপের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছে। হোয়াটস্যাপ অভিযোগ করেছে যে, উক্ত সংস্থা বিভিন্ন দেশের সরকারী গোয়েন্দাদের তাদের অ‍্যাপের মাধ‍্যমে ২০ টি দেশের সাংবাদিক সহ প্রায় ১০০ জনের উপর নজরদারি চালানোর অনুমতি দেয়।

যেসমস্ত দেশ বাকস্বাধীনতা রুদ্ধের লক্ষ্যে সাংবাদিক সহ বিভিন্ন সন্দেহভাজনদের উপর নজরদারি চালাতে পেগাসাস স্পাইওয়ার ব্যবহার করে তাদের মধ্যে অন্যতম দেশ হল মেক্সিকো। মেক্সিকো সরকার হল এই প্রযুক্তির সবথেকে বড় কাস্টমার। মেক্সিকোর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এনরিক পেনানিটো এই স্পাইওয়ার কেনার কথা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে জানা যায় যে মেক্সিকোর সাংবাদিক, টেলিভিশন প্রচারক সহ বিভিন্ন সন্দেহভাজনদের উপর নজরদারি চালাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সাংবাদিকদের মধ‍্যে কারমেন এরিস্টেগ অন্যতম। একসময় তিনি ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা স্ক্যান্ডাল প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া জেভিয়ার ভালডেজ, স্যালভাদোর ক্যামারেনা ও ডেনিয়েল লিজারেগা ও স্পাইওয়ারটির স্বীকার হন।

পেগাসাস স্পাইওয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ মিশনের সবথেকে বড় অপারেশন ভারতে চালানো হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন সাংবাদিক, আইনজ্ঞ , এক্টিভিস্ট প্রমূখের বিরুদ্ধে পেগাসাস ব্যবহার করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপ যদিও কতজন সাংবাদিকের উপর নজরদারি চালানো হয়েছে তা জানাতে অস্বীকার করেছে তবে ধারণা করা হচ্ছে অন্ততঃ ২৪ জন ভারতীয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নজরদারি চালানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক ইসরাইলের এই সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (FBI) এই সংস্থার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এছাড়া খোদ ইসরাইলেই বিভিন্ন আইনের জালে আটকা পড়েছে এই সংস্থা।

তবে পেগাসাস একমাত্র স্পাইওয়ার নয়, আরো বিভিন্ন স্পাইওয়ার আছে যেগুলো অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্পাইওয়ারের এই অবৈধ ব্যবহার আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ করে নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের জন্য উদ্বিগ্নতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পাইওয়ারের অপব্যবহারের এই ধারাবাহিকতা জারি থাকলে ভবিষ্যতে প্রাইভেসি পলিসি ও মিডিয়ার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসবে।


© দিরিলিস রিসার্চ উইং