করোনা ভাইরাসে ইসলামের দিক নির্দেশনা

করোনা ভাইরাসে ইসলামের দিক নির্দেশনা
–ড. আব্দুস সালাম আজাদী
=============================
করোনা ভাইরাসঃ
এইটা একটা যুনোটিক ভাইরাস। মানে এটা প্রাণিদের থেকে সংক্রমিত হয়ে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়ে থাকে বাদুড় থেকেই এর আগমনটা বেশি হয়ে থাকে। শুকর থেকে যেমন সোয়াইন ফ্লু হয়ে থাকে বেশি।

এই ভাইরাস সংক্রমনের লক্ষণঃ
জ্বর, কাশি, শ্বাস কষ্ট, শ্বাসে ঘাটতি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইনফেকশান হয়ে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে, কিডনি ফেইল করতে পারে, এবং এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে।

শুরুঃ
এই রোগটার প্রাদূর্ভাদ চায়না থেকে শুরু হয়েছে। এখন সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে কিংবা পড়তে যাচ্ছে।

এই মহামারির ক্ষেত্রে ইসলাম কি বলেঃ
১- এই রোগ আমাদের গুণাহের কারণে হতে পারে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ
ظهر الفساد في البر والبحر بما كسبت أيدي الناس
অর্থাৎ স্থলে বা সাগরে যে সব ফাসাদ বা অনিয়ম ও বিশৃংখলা প্রকাশ পায় তা মানুষের হাতের কামাই।

কিন্তু তাই বলে কারো এই রোগ দেখা দিলে আমরা বলতে পারবো না ঐ লোকের পাপের কারণে এই রোগ হয়েছে। আমাদের পাপের কারণে রোগের প্রাদূর্ভাব হতে পারে, তাই বলে কারো হলে সেটা যে তার পাপের ফসল, এমন ভাবা ঠিক নয়। অনেক ছোট বাচ্চার এইডস হয়েছে যারা কখনো সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড হবার সুযোগ পায়নি, তবে অন্য কোন ভাবে ভাইরাস তার দেহে ঢুকে গেছে। কাজেই দুনিয়ায় কোন মহামারি ছড়িয়ে পড়লে তাকে আল্লাহর তাক্বদীর মনে করে নিতে হয়। এটাই সায়্যিদুনা উমার (রা) এর ভাষায়ঃ
نفر من قدر الله إلى قدر الله
আমরা এক তাক্বদীর থেকে অন্য তাক্বদীরে প্রবেশ করি।

২- ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধরণের মহামারি যখন দুনিয়াময় হয়ে যায় তখন আমাদের মনে দুইটা দিকের স্থান দিতে হয়:

একঃ এটা আল্লাহর পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ কিছু ভুল প্রাক্টিসের শাস্তি দিয়ে আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছেন। ঐ গুলো যেন আমাদের জীবনে না আসে।

দুইঃ এই ধরণের বিপদ থেকে আমরা মানবতাকে যেন রক্ষার জন্য এগিয়ে আসি। এই রক্ষা মুসলিম জাগৃতিতে দুই ধরণের আসে।

এক হলো এই থেকে বাঁচার উপায় উদ্ভাবন। যেমন ভাবে আমওয়াস নামক স্থানে মহামারি দেখা দিলে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ, মাআয ইবন জাবাল, ইয়াযিদ ইবন আবু সুফইয়ান, সুহায়ল ইবন আমর, দিরার ইবন আলআযওয়ার অথবা আবু জানদাল ইবন সুহায়ল রিদওয়ানুল্লাহি আজমাঈন এটাকে আল্লাহর অমোঘ তাক্বদীর হিসেবে মেনে নিয়ে এক স্থানেই থেকে শেষ পরিণতি ও মৃত্যু উভয়কে মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা তখন এই মৃত্যুকে শহীদী মরণ হিসেবে আখ্যা দেন। আইশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মহানবী (সা) এর কাছে মহামারি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, এটা এক ধরণের আযাব, যে জনগোষ্ঠির উপর আল্লাহ চান, পাঠায়ে থাকেন। তবে এটা মুমিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দেন। যদি কোন বান্দাহের এই মহামারি ধরে ফেলে, এর পর ঐ শহরে ধৈর্য ধরে থাকে যে আল্লাহ, তার ব্যাপারে যা ই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা-ই হবে। এরপরে ব্যক্তিটির মৃত্যু হলে শহীদের মত সাওয়াব পাবে। (বুখারি)। এই সিদ্ধান্তে অটল থেকে ঐ স্থানেই প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার সাহাবা ও তাবিঊন (রা) ইন্তেকাল করেন।

আরেক ধরণের রক্ষা হলো আমর ইবনুল আস এর কর্মপন্থা। আমওয়াসে নেতৃস্থানীয় সাহাবিগণের ইন্তেকালের পর আমর ইবন আলআস (রা) দায়িত্বভার গ্রহন করলেন। তিনি বাকি সাহাবি ও তাবিঈগণকে নিয়ে নিকটস্ত এক পাহাড়ে চলে যান। তার এই তড়িৎ সিদ্ধান্তে অনেকের জীবন রক্ষা পায়।

সাহাবীগনের এই কর্মপন্থা আমাদের সুন্দর পথ দেখায়। তা হলো রোগ হয়ে গেলে যেমন কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা উচিৎ। যেটা আব্দুর রহমান ইবন আউফের হাদীসে পাই। যদি আমরা কোন ভূখন্ডে থাকি যেখানে মহামারি বিস্তার লাভ করেছে, সেখান থেকে যেন বের না হই। আবার সেখানেও আমরা যেন না যাই। দ্বিতীয় কর্মপন্থা হলো, পাশের সুরক্ষিত এমন স্থানে যাওয়ার সুযোগ থাকলে যাওয়া, যেখানে অন্য কেও এর শিকার হবার সম্ভাবনা না থাকে।

৩- এই সব মহামারি সম্পর্কে আমাদের একটা সতর্কবার্তা আমাদের নবী (সা) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ

لم تظهر الفاحشة في قوم قطُّ حتى يعلنوا بها إلا فشا فيهم الطاعون والأوجاع التي لم تكن في أسلافهم الذين مضوا،

অর্থাৎ কোন জাতির মাঝে যদি অশ্লীল কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়, এবং তারা তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে করে, তা হলে আল্লাহ তাদের মাঝে মহামারি ব্যপৃত করে দেন। এবং এমন সব রোগ দেন যা ইতিপূর্বের কোন জাতির মাঝে তা দেখা যায়নি। (ইবন মাজাহ, আব্দুল্লাহ ইবন উমার থেকে)।

এই হাদীস আজকের যুগের মুসলিমদের জন্য খুবই উপকারী হতে পারে। যেসব রোগ আমাদের কাছে মহামারি হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে তা কোন না কোন অশ্লীলতা ব্যাপকতার ফল। যেহেতু মুসলিম জাতি অনেকাংশে নিজদের গুটিয়ে রাখে তাই ঐ সব মারাত্মক রোগে তাদেরকে ধরে ফেলার সূচক ও অনেক কম। আলহামদুলিল্লাহ।

করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়ঃ

এই ভাইরাসে আমাদের আক্রমন করার আগে আমাদের করণীয় হলো:

১- আল্লাহর প্রতি আমাদের ঈমান ও বিশ্বাসকে অনেক তুঙ্গে উঠাতে হবে। তিনি আমাদের রব, তিনি ই সব করতে পারেন। আমার জীবন ও মরণ তাঁরই হাতে। তিনি আমার মরণ চাইলে পৃথিবির তাবৎ শক্তি আমাকে জীবিত রাখতে পারবে না। তিনি আমাকে জীবিত রাখতে চাইলে দুনিয়ার কোন শক্তিই আমাকে মারতে পারবেনা।

২- নবী (সা) জীবন যাপনের অনেক পদ্ধতি অহির উপর ভিত্তি করে আমাদের শিখিয়ে গেছেন। যেমন গোসল করা। পেশাব পায়খানার পর পানি দিয়ে ধোয়া। সুন্দর করে অযু করা। খাওয়ার আগে পরে হাত মুখ ধোয়া। অযু অবস্থায় থাকা। ঘুমের সময়টাকে সুন্দর ভাবে মানা। অপরের সাথে দেখা হলে স্বাস্থ্য হাইজিন বজায় রাখা। খাওয়ার জিনিষ হালাল ও তায়্যিব হওয়া। যেখানে কোন রকম খাবাসাত থাকবেনা। ভালো, নির্মল ও তাজা জিনিষ পত্র খাওয়া। পানের ক্ষেত্রেও সুন্নাহ মেনে চলা। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতায় সর্বোচ্চ সাবধান হওয়া।

৩- স্বাভাবিক জীবন যাপন করা উচিৎ। টেনশান, উদ্বিগ্নতা, অতিরিক্ত সাবধানতা দেখাতে যেয়ে বাজার সংকট সৃষ্টি করা, ও এমন হা পিত্যেশ করা যা একজন মুসলিমের শোভা পায়না, ইত্যাদি গর্হিত কাজে অংশ না নেয়া উচিৎ। আল্লাহর কাছে নানা ধরণের দুয়া করা মহানবীর (সা) আদর্শ। করোনার জন্য আলাদা কোন দুয়া নেই। তবে মহামারি ও অন্যান্য মারাত্মক রোগের দুয়া আমাদের নবী (সা) শিখিয়ে গেছেন তা বার বার পড়া। দান সাদাক্বা বাড়িয়ে দেয়া। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা করার জন্য এগিয়ে আসা দরকার।

তিনি যে দুয়া গুলো শিখিয়ে গেছেন তা হলোঃ
ক- কোন কিছু খাওয়ার আগে
• بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ العَلِيْم
এই দুয়াটা পড়ে খাওয়া। এর অর্থ হলোঃ সেই আল্লাহর নামে খাচ্ছি বা পান করছি যাঁর নামের সাথে আসমান জমিনের কোন কিছুই ক্ষতিসাধন করতে পারেনা। তিনি সব কিছু শোনেন, সব কিছু জানেন।

খ- প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা সূরা ফালাক্ব ও নাস পড়া

গ- প্রতিদিন বারবার এই দুয়াটা পড়া
• اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ، وَالْجُنُونِ، وَالْجُذَامِ، وَمِنْ سَيِّئِ الأَسْقَامِ

ঘ- ডাইবেটিস না হলে প্রতিদিন আজওয়া হোক বা অন্য কোন খেজুর খাওয়া।

৪- মানুষের মাঝে ভয় ছড়িয়ে দেয়া উচিৎ নয়। বিশেষ করে আলিমগণকে খুবই সতর্ক হতে হবে এই ক্ষেত্রে। আমি দেখতে পাচ্ছি করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু আলিমের সম্প্রচার, অপপ্রচার ও আত্মপ্রচারের ব্যামো ধরেছে। মানুষকে অযথা ভয় ধরাতে যেয়ে অনেক মিথ্যার বেসাতিও বিলাচ্ছেন কেও কেও।

এইগুলো সাধারণ মুমিনগণের কাজ হতে পারেনা। এখানে আলিমগণ হবে বাশীর, সুসংবাদ দাতা, ও নাযীর বা সতর্ককারী এবং দাঈ ইলাল্লাহ, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী। বিপদে মানুষের হাত ধরতে জানাই হলো সেরা দাওয়াত।

আমি একবার কিশোরগঞ্জে যেয়ে এক বৃটিশ মেয়ের সাক্ষাত পাই। যে ছিলো লন্ডনের নামকরা ইম্পেরিয়েল ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। গ্রীস্মের ছুটিতে যে বাংলাদেশে যায় ঈসা (আ) কে খুশি করার জন্য। সে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এক রোগিনীর শরীর থেকে পায়খানা পরিস্কার করে দিচ্ছিলো, আর বলছিলো জিসাস তোমাকে ভালোবাসে। আমরা আজ কোথায়? মনে রাখা দরকার যে সব আলিম উলামা এখন আমাদের নক্ষত্র হয়ে গেছেন, তাদের মুখে অভয়ের বাণী আমরা শুনতে চাই বেশি। আগুন জ্বালাতে অনেকেই পারেন, কিন্তু নিভানো লোকের সংখ্যা খুব কম।

আল্লাহ মাফ করুন, রোগ একবার হয়ে গেলে আমাদের যে কাজ গুলো করা উচিৎ তা হলোঃ

১- চিকিৎসা গ্রহনে কোনরূপ দুর্বলতা না দেখানো উচিত। আমাদের নবী (সা) বলেছেন,
أن الله جعل لكل داء دواء، فتداوا
অর্থাৎ আল্লাহ প্রতিটি রোগেরই অষুধ দিয়েছেন, কাজেই চিকিৎসা নিয়ো।

২- চিকিৎসা হলো রোগ নিরাময়ের মাধ্যম। কাজেই আমাদের উচিৎ হলো এই মাধ্যমের যিনি সৃষ্টিকর্তা তার কাছেই ধর্ণা দেয়া। ক্বাদি ইয়াদ্ব (র) বলেনঃ আমি যখন অসুস্থ হই, তখন চার কারণে আমি আল্লাহর প্রশংসা করি। প্রথমতঃ তিনি চাইলে এর চেয়েও বড় রোগ আমাকে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি আমার উপর রহম করেছেন। কাজেই তাঁর জন্য প্রশংসা করি। তিনি এই রোগ হওয়া সত্বেও আমাকে সবর করার তাওফীক্ব দিয়েছেন। কাজেই তাঁর ই প্রশংসা করতেই হয়। তিনি আমাকে ইন্না লিল্লাহ পড়ার সুযোগ দিয়েছেন। যা বললে তিনি সালাওয়াত ও রাহমাহ দেবেন বলে ওয়াদাহ করেছেন। তাই আবারো তাঁর প্রশংসা করি। আর প্রশংসা এই জন্য যে তিনি এই বিপদ আমার শরীরে দিয়েছেন। আমার দীনে কোন বিপদ দেননি।

আসেন এই বিপদের সময় আমাদের কার্যক্রম হোক একজন খাঁটি মুসলিমের মত, যা দেখে আল্লাহ আমাদের নিয়ে গর্ব করেন। সাহায্য করেন। আর সারা বিশ্ব আমাদের কাজ দেখে অভিভূত হয়ে যায়।