বাব যুয়াইলাহ: ইতিহাস যেখানে থমকে দাঁড়ায়.. | TRT Bangla
Home Religion & History বাব যুয়াইলাহ: ইতিহাস যেখানে থমকে দাঁড়ায়..

বাব যুয়াইলাহ: ইতিহাস যেখানে থমকে দাঁড়ায়..

0
বাব যুয়াইলাহ: ইতিহাস যেখানে থমকে দাঁড়ায়..

• লেখকঃ নুসায়ের তানজিম

কায়রোর ডায়েরি–১

১২৬০ ঈসায়ীতে হালাকু খানের ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ চিঠি নিয়ে যখন তার দূতগণ কায়রোয় প্রবেশ করেছিলো তখন মামলুক সুলতান কুতুজ তাদেরকে হত্যা করে ছিন্ন মস্তক কায়রোর ফটকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো, হালাকুকে এই বার্তা দেয়া যে, কায়রো — বাগদাদ, দামেস্ক আর খাওয়ারিজম নয়। মিসর ভিন্ন একটি জনপদ। এখানে তুমি অন্য কিছুর মুখোমুখি হবে।
ঘটনাটি ইতিহাসে খুবই প্রসিদ্ধ। মোঙ্গলদের ইতিহাস যারা পড়েছেন, তারা জানেন। তবে, যে তোরণের সামনে হালাকুর দূতদের ছিন্ন মস্তক ঝুলানো হয়েছিল, সেই তোরণের নাম হয়তো অনেকে জানে না। সেটা হচ্ছে, ছবির এই তোরণটি। নাম ‘বাব যুয়াইলা’। এটি তখনকার স্থাপনা। দীর্ঘ ৯২৭ বছর ধরে এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। যদিও কারুকার্য, রঙ এবং আস্তরনের উপর কাল- পরিক্রমার পষ্ট ছায়া পড়েছে, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে।
তবে, চমক এখানেই শেষ না। এই সেই তোরণ, যার সামনে সর্বশেষ মামলুক সুলতান তুমান বাঈকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল ১৫১৭ সালে। এখন এমবিসি টেলিভিশনে ‘মামালিকুন নার’ বা ‘কিংডম অব ফায়ার’ নামে যে সিরিয়ালটি সম্প্রচার করা হচ্ছে — তার নায়ক হচ্ছেন মামলুক সুলতান তুমান বাঈ। অটোমান সুলতান ১ম সেলিমের হাতে তাঁর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে গৌরবময় মামলুক সালতানাতের সর্বশেষ সুর্য অস্ত যায়। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! যে ফটকে একদিন মামলুকরা আক্রমনকারীদের মস্তক ঝুলিয়েছিলো, সেই ফটকেই হতভাগ্য মামলুক সুলতানের লাশ ঝুললো। যে তোরণটি এক কালে মামলুক শাহীর শৌর্যবীর্য এবং উত্থানপর্বের নিদর্শন ছিলো, সেটাই হয়ে রইলো তাদের পতনের সুকরুন সাক্ষী।
মধ্যযুগের অন্যান্য শহরের মতো কায়রোও ছিলো উঁচু পাঁচিল ঘেরা সুরক্ষিত দূর্ভেদ্য শহর। শহরের সাথে বাইরের যোগাযোগ এবং নগরবাসীর গমনাগমনের জন্য চতুর্পার্শে দু’টি করে বিশালকায় তোরণ ছিলো। উত্তর পাশে ছিলো — ‘বাব আল ফুতুহ’ এবং ‘বাব আন-নাসর’। পূর্ব দিকে ছিলো — ‘বাব আল-বারফিয়্যাহ’ এবং ‘বাব আশ-কারাতী’। পশ্চিম দিকে ছিলো — ‘বাব আস-সাআদাহ’ এবং ‘বাব আল-কানতারাহ’। দক্ষিন দিকে ছিলো — ‘বাব আল-ফারাহ’ এবং ‘বাব যুয়াইলাহ’।
এগুলোর মধ্যে বর্তমানে কেবল ৩ টি তোরণই অক্ষত আছে। বাব আল-ফুতুহ, বাব আন-নাসর এবং বাব যুয়াইলাহ।
বর্তমানে বাব যুয়াইলাহ তোরণের যে স্থাপনাটি দেখা যাচ্ছে সেটা নির্মিত হয়েছিলো ফাতেমী যুগে। ফাতেমী সালতানাতের সেনাপ্রধান বদর আল-জাম্মালী ৪৮৫ হিজরী মোকাবেক ১০৯২ ঈসায়ীতে এই বৃহাদাকারের তোরণটি নির্মান করেছিলেন। সে হিসেবে তোরণটির নির্মানকাল থেকে নিয়ে এখনো পর্যন্ত অতিবাহিত হয়েছে সুদীর্ঘ ৯২৭ টি বছর। ‘বাব যুয়াইলা’ নামকরণের কারণ হিসেবে জানা যায় যে, তৎকালীন উত্তর আফ্রীকার (বর্তমানে তিউনিসিয়ার) ‘যুয়াইলা’ নামে একটি বারবার কবিলার যোদ্ধারা ফাতেমী ফৌজের সদস্য হিসেবে ফাতেমীদের মিসর অভিযানে অংশগ্রহন করেছিলো। তারা পরবর্তিতে মিসরেই থেকে গিয়েছিলো। এই কবিলার নাম অনুসারে ফাতেমীরা এই তোরণের নাম রাখে বাব যুয়াইলাহ। এখনো তিউনিসিয়ার ‘আল-মাহদিয়্যা’ শহরে এই কবিলার নামে একটি তোরণ আছে। তার নামও ‘বাব যুয়াইলাহ’।
বাব যুয়াইলাহর আকৃতি অনেকটা চতুর্কোনী। প্রস্তে ২৫ মিটার এবং এর পুরো বা ব্যাসও ২৫ মিটার। উচ্চতায় ২৪ মিটার। বলতে গেলে একটি ৪ তলা বিল্ডিং এর সমান। দুই পাশে মসজিদের মেহরাবের মত গোলাকৃতির দুইটি বৃহদাকারের বুর্জ। এগুলো মূলত সিকিউরিটি রুম ছিলো। প্রহরীরা এগুলোতে বসে পাহারা দিতো। তোরণের উপরে যে দু’টি লম্বা মিনার দেখা যাচ্ছে, সেগুলো মূল তোরণের অংশ ছিলো না। ৮১৮ হিজরীতে মামলুক সুলতান আল-মালিকুল মুআয়্যিদ তোরণের পাশে একটি বিশাল জামে মসজিদ নির্মান করেন। তখন সেই মসজিদের দু’টি মিনারকে বাব যুয়াইলার বুর্জের উপর স্থাপন করে মসজিদের প্রকৌশলীরা। তাই এখন দেখতে মিনার দু’টিকে তোরণের অংশ মনে হয়।
‘বাব যুয়াইলাহ’ আয়তনে যেমন কায়রোর অন্য সব তোরণ থেকে বড়, তেমনি ঐতিহাসিকভাবেও তার গুরুত্ব বেশি। ফাতেমী, আইয়ুবী, মামলুকী, উসমানী, ফরাসী, পূনরায় উসমানী এবং বৃ্টিশ আমল’সহ দীর্ঘ ৯২৭ বছর অতিক্রম করে বর্তমানে আধুনিক গণতান্ত্রিক মিসরের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনরুপে টিকে আছে। মিসরের সকল ইতিহাসবিদগণ তাদের কিতাবাদিতে এই তোরণের কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিক কালাকশান্দী তাঁর কালজয়ী কিতাব ‘সুবহুল আ’শা’য় এই তোরণ সম্পর্কে লিখিত একটি কবিতার কয়েকটি চরন উল্লেখ করেছেন:
“ওহে নকীব, তুমি যদি বাব যুয়াইলাহ দেখতে, তবে তার শৈল্পিক স্থাপত্যের কদর বুঝতে…
যদি ফেরআউন এটি দেখতো, তাহলে তার সুউচ্চ বুর্জ নির্মান করতে মন্ত্রী হামানকে নির্দেশ দিতো না।”
‘বাব যুয়াইলাহ’ বর্তমানে মধ্য কায়রোর (পুরান কায়রোর/ ফাতেমী কায়রোর) মুয়িজ লি দ্বীনিল্লাহ রোডের পাশে অবস্থতি। ‘আল-আযহার’ থেকে খুব কাছে। তার পাশেই জামে-আল-মুআয়্যিদ’ মসজিদ। তবে স্থানীয় লোকেরা তোরণটিকে ‘বাব আল-মুতাওয়াল্লী’ নামেও ডাকে।
এই তোরণের নিচ দিয়ে বহুবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। যতবারই গিয়েছি প্রত্যেকবার পেছনে ফিরে কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি। তখন ইতিহাসের পাতাগুলো যেন নিজ থেকেই একটির পর একটি উল্টে যায়। যেন পাগলা রাজা হাকেম বিআমরিল্লাহ থেকে নিয়ে, সালাহউদ্দীন আইয়ুবী, কুতুজ, বাইবার্স সবার ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ এখনো শুনতে পাই। হতভাগা তুমান বাঈ’র শবদেহ যেন এখনো ঝুলে আছে। অটোমান জানেসারী বাহিনীর লাল সারিগুলো যেন এখনো জীবন্ত হয়ে আছে এই তোরণের নিচে। তবে, তোরণের নিচ দিয়ে প্রতিনিয়ত গমন করা কায়রোর নির্লিপ্ত ব্যস্ত নাগরিকদেরকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। দেখলে মনে হবে, ঐতিহ্যের নগরী কায়রোতে বসবাস করা লোকগুলোর কাছে এসবের তেমন কোন আবেদন নেই।

আপনাদের প্রিয় ওয়েবসাইট TRT Bangla এন্ড্রয়েড এপ্স লঞ্চ করেছে। প্রত্যেকে নিজের মোবাইলে ইন্সটল করতে ছবিতে ক্লিক করুন।
TRT Bangla

FREE
VIEW