Home Turkey জীবনের প্রথম তুরস্ক যাত্রা: আমি, মূস’আব, আল্প ওরফে রোয়ান অ্যাট কিনসন ও...

জীবনের প্রথম তুরস্ক যাত্রা: আমি, মূস’আব, আল্প ওরফে রোয়ান অ্যাট কিনসন ও আমার ব্যাগ হারানোর গল্প

ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে বাসে ওঠার সময় ৩ ব্যাগের একটা হারিয়ে ফেলেছি এটা জানার পর থেকেই নিজের নির্বুদ্ধিতার উপর অনাবিল পাশবিক আনন্দ হচ্ছে আর একজটলা বাঙাল, আফগান, তুর্ক, এবং অ্যারাবিয়ানদের সামনে দাঁড়িয়ে খিলখিলিয়ে হাসছি, মাঝে সাঝে আবার কেউ দেখে না ফেলে এই ভয়ে হাত দিয়ে গোঁফের নিচে মিটমিটিয়ে হাসার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছি। আমি হাসছি এটা আবার কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে! ভাববে আমি ছোটবেলার বইয়ের রাখাল ছেলের মত মশকরা করছি। তখন আর কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে না।
হুট করে মনে হলে ব্যাগটিতে আমার সব অরিজিনাল সার্টিফিকেট, মার্কশীট এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ছিল। ব্যাগটা না পেলে নির্ঘাত যে পথে এসেছি ঠিক সে পথ ধরেই দেশে ফিরে যেতে হবে। যেটা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। এই প্রথম পড়াশোনার উদ্দেশ্যে দেশের বাহিরে এসেছি। তুরস্কের মাটিতে পদার্পণ করেছি সবে আড়াই ঘণ্টা হলো মাত্র, এরই মধ্যে আমার দেশে ফিরে যাওয়ার সব ব্যবস্থা হয়ে গেল এটা ভেবেই পাসপোর্টের ফাঁকা পৃষ্ঠা যেগুলোতে সাড়ে ৫ বছরের ভিসার সিল বসত সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বড্ড মায়া হচ্ছে! আহ! বেচারারা এ যাত্রায় সিল খাওয়ার হাত থেকে বড্ড বাঁচা বেঁচে গেল।
ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইস্তানবুল নিউ এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি ভোর ৬টা ২৫ মিনিটে। এয়ারপোর্টে কয়েক দফায় প্যান্টের বেল্ট থেকে শুরু করে জুতা পর্যন্ত খুলে চেক করায় আবেগে, রাগে, ক্ষোভে একত্রে আপ্লুত হয়ে খুবই ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম পুরোটা সময় জুড়ে। তবে ফ্লাইং টাইমের পুরো সাড়ে আট ঘণ্টা জুড়ে নিজেকে শুধু John Steinbeck-এর বিখ্যাত উক্তি, “All great and precious things are lonely” এটাই বুঝিয়ে এসেছি। সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্য দুটোই হলো যে, সেই যে ক্লাস ফাইভের পিএসসি পরীক্ষার সময় রুমের সবাই এক বেঞ্চে দু’জন বসে পরীক্ষা দিল আর আমি দিলাম একা বসে, সেখান থেকেই আমার এই great and precious হয়ে ওঠার গল্পটা শুরু।
ফ্লাইটের পুরোটা সময় জুড়ে সবাই পাশাপাশি সিটে দু’জন বসে গেলেও আমার পাশের সিটটা ঠিকই ফাঁকা! এমনকি এই যে এখন, বহুল আকাঙ্ক্ষিত গভর্নমেন্ট ডরমিটরিতে থাকছি, যেখানে সবার রুমের সবগুলো সিট পরিপূর্ণ এবং কোনো ফাঁকা সিট নেই, ঠিক সে মূহুর্তেও তুরস্কে আসার পর থেকে আমার পাশের সিটটি যথারীতি ফাঁকা! এখানে সৌভাগ্য হলো আমার। কেননা বরাবরই আমি রাজসিক কায়দায় একা দু’জনের সিটের সুবিধা ভোগ করেছি, আর দূর্ভাগ্য হলো আমার পাশে অনুপস্থিত থাকা লোকগুলোর! যারা আমার মত এত মহৎ ও দামী একজন বন্ধুর বা সঙ্গীর সঙ্গ হারিয়েছে !
ফ্লাইটের পুরো সময় একা থাকলেও সময়টাকে নিজের মত করে উপভোগ করার চেষ্টা করেছি। কিছু সময় জানালা দিয়ে উঁকি মেরে আকাশের মেঘরাজি দেখে, কিছু সময় সিটের সামনে রাখা ট্যাবলেটে অ্যানিমেটেড মুভি দেখে, নতুবা নিজের সাথে নিজে কথা বলে অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি। আর বাকি সময় খাওয়া-দাওয়া, ওয়াশরুমে যাওয়া আর ঘুমিয়েই পার হয়েছে। অথচ বিমানে ওঠার আগ পর্যন্তও মনে মনে কত ছক কষে এসেছি, পাশে যে বসবে সে যদি পুরুষ হয় তাহলে তার সাথে কত কথা বলব! কি কি প্রশ্ন করব, সব ঠিক করে রেখেছিলাম। আর মহিলা হলে চুপ থাকব। একান্ত প্রয়োজন এবং সে আগে থেকে কথা বলা ছাড়া আমি কোনো কথা বলব না। আর খুব অল্প কথা বলে বুঝিয়ে দেব আসলে আমি ভ্রমণের সময় কথা বলা খুব অপছন্দ করি কিন্তু বাস্তবে আমি খুব মিশুক প্রকৃতির।
আর তাছাড়া একেবারেই কথা না বললে সেটা এক প্রকার অসৌজন্যতা ও অভদ্রতা হবে বৈকি! যেটা আমি কখনোই করিনা ও করতে ও চাইনা। তবে চুপচাপ থাকার এই প্লান এটা আমার তখনকার ভাবনা হলেও তুরস্কে আসার পর ঠিকই দেখতে পেলাম এটা তুর্কদের বাসে বা ট্রেনে ভ্রমণের সময়কার দৈনন্দিন পালনীয় রীতি। তারা ভ্রমণের সময়টুকু খুবই নিরব, নিস্তব্ধ থেকে কাটাতে চায়। ফোনে বা পাশের কারো সাথে কথা বলাকে যথারীতি পরিহার করে এবং এটা তাদের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় কাজ। তো ভ্রমণের পুরো সময় জুড়ে একটা চিন্তাই আমাকে খুবই ভাবাচ্ছিল সেটা হলো, তিন তিনটা ব্যাগ নিয়ে কি আমি আসলেই সব ঠিকমত সামলে চুড়ান্ত গন্তব্য ‘সাকারিয়াতে’ পৌঁছাতে পারব? যে জিনিসটা নিয়ে সবথেকে ভয় পেয়েছি ঠিক সেটাই ঘটেছে আমার সাথে।
বিমানে থাকা অবস্থায় কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের বিমানবালারুপী সেবাদাসদের অন্তঃসারশূণ্য ‘স্যার’ ডাক শুনতে শুনতে দুপুর বেলা ২:৫০ মিনিটে ইস্তাম্বুল নিউ এয়ারপোর্টে অবতরণ করি। এয়ারপোর্টের মধ্যকার সকল অফিশিয়াল কার্যক্রম শেষ করে এক্সিটের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা দেশত্যাগী ৫ জন বীর বাহাদুর বাঙালী স্কলারশিপ কমিটির রিসিপশন বুথ খোঁজ করতে থাকি। আমাদের ফ্লাইটটি ছিল বাংলাদেশ থেকে তুরস্কে নিয়ে আসা সকল স্কলারশিপ হোল্ডারদের প্রথম ফ্লাইট। সে কারণে একেবারে প্রথম দিন স্কলারশিপ কমিটির বুথের কোনো ব্যানার বা কোনো চিহ্ন ছিল না। জাস্ট এয়ারপোর্টের বেরুনোর দরজার মুখে একটা কফি শপের সামনে স্কলারশিপের লোগোখচিত সাদা গেঞ্জি পরিহিত একদল স্বেচ্ছাসেবক জটলা পাকিয়ে বসে ছিল আমাদের অপেক্ষায়।
তাদের সাথে সাথে অবশ্য আমাদের দু’একজন পুরোনো বাঙালী ভাই-ব্রাদার ও আপুরাও আমাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিল। আমরা আসার পর সুহৃদ হেলালী ভাই হতদন্দ্ব হয়ে ছুটে এসে আমাদেরকে মৌখিক অভ্যর্থনা জানালেন। সাথে ছিলেন মামুন ভাই সহ নাম না জানা আরেক আপু। তাদের বদন্যতায় ‘গ্লোরিয়া জিন্স’ কফি শপে বেসে এক পশলা কফির চুমুকে খানিক আড্ডা জমে উঠল বঙ্গদেশ থেকে ৭ হাজার কিলোমিটার দূরের তুর্কী মূলুকে। তো কফি শপের নামকে গুরুত্ব দেয়ার কারণ হলো এটা আমার স্মৃতি রোমান্থনের বিভিন্ন উপাদানগুলোর একটি। স্মৃতি আমার কাছে বড়ই মূল্যবান। প্রতিবার ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট মাড়ানোর সময় ঠিক ঐ কফিশপটার প্রথম বসা জায়গাটাতে বসে কড়া এককাপ কফি খেয়েই তবে আমি সামনে বাড়বো এবং এটাই আমার পণ!

কফির আড্ডায় আমি মদনমোহন তর্কালঙ্কার সহ উপস্থিত সকল বাঙালীগণ। তবে তুরস্কে আসার পরে আমি নাকি আগের থেকে প্রসুর স্মার্ট বনে গিয়েসি এরকমটাই একজন বললেন!
সে যা হোক, আড্ডা শেষে রিসিপশন টিমের প্রধানের কাছে সকলে আমাদের পাসপোর্ট জমা দিলাম। আমাদের বাসের টিকিট কেটে দিয়ে আমাদের চুড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া তাদের দায়িত্ব। কেননা আমরা ৫ জনের সকলেই যাব ‘সাকারিয়া’ শহরে যেটা ইস্তাম্বুল থেকে বাসে করে মাত্র ঘণ্টা তিনেকের দূরত্বে অবস্থিত। বাসের টিকিট ও অবশ্য মূল্যবিহীন। স্কলারশিপ কমিটি এটাও নিজ থেকে পরিশোধ করে দিয়েছে। তবে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই আমরা আমাদের সাকারিয়াগামী মূল বাসে উঠব না। এয়ারপোর্ট থেকে মিনিবাসে করে আধঘণ্টা যাওয়ার পর একটা বাস-স্ট্যাণ্ডে নামব, তারপর সেখান থেকে সাকারিয়ার বাসে চড়ে রওনা হব। সবকিছুই পরিকল্পনা মোতাবেক এগুচ্ছিল। আমরা ঠিক এয়ারপোর্টের বের হবার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি মিনিবাসের অপেক্ষায়। আমাদের সাথে আরও অনেকগুলো দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা আছে।
হঠাৎ একটা কালো মিনিবাস এসে থামল আমাদের সামনে। আমি হাতের একটি হ্যান্ডব্যাগ পাশের বসার একটা ছোট্ট বেঞ্চের উপর রেখে বাকি ১টি ব্যাগ আমার কাঁধে নিয়ে বড় ল্যাগেজটা মিনিবাসের পিছনের বাঙ্কারে দেয়ার জন্য কসরত করতে লাগলাম। ল্যাগেজটা রেখে মিনিবাসের সামনের দিকে এসেছি, তখনই বাঙালী ভাইয়েরা বলে উঠল, গাড়িতে আর মাত্র ১টা সিট ফাঁকা আছে, আমরা এর পরের মিনিবাসে সবাই একসাথে যাব। তখন আমি বললাম, আমি তো আমার ল্যাগেজ বাঙ্কারে তুলে দিয়েছি। তারা বলল, নামিয়ে নাও, পরেরটাতে সবাই একসাথে যাব। আমি তখন ভাবলাম, এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কে বা কার? সুঃখে, দুঃখে এই বাঙালী ভাইয়েরাই তো একমাত্র অবলম্বন। তাদের রেখে আমি একা একা যাই কিভাবে? যদিও বিমানে উঠলে বাঙালী বেঈমান হয়ে যায় এই মর্মে বহু কুকথা প্রচলিত আছে। কিন্তু নিতান্তই সেসব কথা পাঁশ কাটিয়ে আবার মিনিবাসের পিছনে গিয়ে স্তুপ মারা ল্যাগেজের মধ্য থেকে আমার ল্যাগেজখানা বহু কষ্ট করে নামিয়ে আনলাম।
নামিয়ে এনে পরের মিনিবাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। পরের মিনিবাস আসল আর আমরা সকল বাঙালি সোৎসাহে আমাদের ল্যাগেজগুলো বাঙ্কারে দিয়ে আমার ইয়াতিম নিঃসঙ্গ ঐ ব্যাগখানা ঐ বেঞ্চের উপর ফেলে রেখে সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে একত্রে মিনিবাসে চেপে বসলাম। আর আমার ই কি-ইবা দোষ? আমি তো তখন ভয়ানক ক্লান্ত-শ্রান্ত। আর তাছাড়া পারিবারিক জিনিওলজি কপচিয়ে যতদুর জানতে পারি, মনভুলো রোগটা আমার বাবার থেকে জিনগত ভাবেই আমি পেয়েছি। যদিও আমার বাবা এটা সারিয়ে উঠে এখন নেহায়েত একজন সচেতন মানুষ, আর আমি তার ভুলো-মনো ছেলে হয়ে তার লিগ্যাসি বহন করে বেড়াচ্ছি। তো মিনিবাসে চড়ে হাস্যরস করতে করতে এক তরফা ঘুমিয়ে নিলাম সবাই, যেহেতু সবাই-ই খুব ক্লান্ত ছিলাম। এর মাঝে একবারের জন্যেও আমার মনে হয়নি আমার সাথে আমার একটা ব্যাগ নেই! অথচ ব্যাগ হারানোর পরেও গাড়ির মধ্যে কি শান্তির ঘুমটা না ঘুমিয়েছি! কি আছে আর এ জীবনে?
ঘুম থেকে উঠে দেখি ‘অতুগার’ (তুর্কি ভাষায়) আইমিন বাস স্ট্যান্ডে চলে এসেছি। বাস স্ট্যান্ডে নেমে মিনিবাস থেকে একেক করে সবাই সবার ল্যাগেজ আর ব্যাগপত্র নামাচ্ছে। আমিও সুবোধ বালকের মত বড় ল্যাগেজটা নামালাম। বড় ল্যাগেজ নামিয়ে মোট ব্যাগ গুনতে গিয়ে এবার আমার চোখ চড়ক গাছে। হৈ হৈ রৈ রৈ একটা আমেজ ফেলে দিলাম ব্যাগ হারিয়ে গেছে বলে। বাঙালী ভাইয়েরা বলল, গাড়ির ভিতরে ভালো করে খুঁজে দেখো। আমি বললাম, আমি মনভুলো হলেও চোখ দু’টো এখনো দিব্যি ভালো আছে। জীবনে কখনো আলাদা জোড়াচোখ লাগানোর প্রয়োজন পড়েনি। এখন ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু কোথায় হারিয়েছি সেটাও মনে করতে পারছিনা ঠিকমত।
সাথে স্কলারশিপ কমিটির একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিল। এবার তাকে ধরলাম। বললাম এই এই কাণ্ড, এখন কিছু একটা করো। সে গোবেচারা খুবই ভালো মানুষ যেটার প্রমাণ পরে পেয়েছি, কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত সে ইংরেজি জানেনা। আমাদের কারো কাছে আবার তার্কিশ কোনো সিমকার্ড নেই। কারণ এয়ারপোর্ট থেকে নেমে এয়ারপোর্টের মধ্য থেকে গলাকাটা ডাবল দাম দিয়ে আমরা কেউ সিমকার্ড কিনতে রাজী হইনি। সবাই সাকারিয়া গিয়ে সাধারণ দাম দিয়ে সিম কিনব বলে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলাম। পরে গাড়ির ড্রাইভারকে আরেক আফগানী দোভাষীকে দিয়ে বলে কয়ে তার ফোনটা নিলাম। নিয়ে হেলালী ভাইকে ফোন দিয়ে জানালাম। উনি বললেন, উনারা পুরোনো যারা ছিলেন তারা ইতোমধ্যেই এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে বেশ দূরে চলে গেছেন, এ মুহূর্তে আবার এয়ারপোর্টে ফিরে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এদিকে স্বেচ্ছাসেবককে গুতিয়ে গুতিয়ে জানতে পারলাম সে এয়ারপোর্টে না গিয়ে এখান থেকে কিছুই করতে পারবে না। সে এয়ারপোর্টে থাকা অন্য স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে কথা বলেছে, তারাও একই কথা বলেছে।
ব্যাগ ফিরে পেতে হলে আমাকেই আবার এয়ারপোর্টে ফিরে যেতে হবে। নতুবা তারা কোনো বিহীত করতে পারবে না। কারণ তারা আমার ব্যাগ চিনেনা, আর এতক্ষণে ব্যাগ কেউ নিয়ে গেলে তো সেটা আল্লাহর রাস্তায় সদকা বলে গণ্য করতে হবে, আর সিকিউরিটির হাতে পড়লে আমি না গেলে কোস্মিনকালেও ব্যাগ অন্য কারো হাতে দিবে না। সুতরাং, অগত্যা বাধ্য হয়েই আমাকে আবার এয়ারপোর্টে ব্যাক করতে হবে। এদিকে আমাদের সাকারিয়াগামী মূল বাস ততক্ষণে চলে এসেছে। বাঙালী ভাইয়েরাও আমার জন্য এ মুহূর্তে কিছু করতে পারছে না। কারণ তাদের কারো কাছে কোনো লিরা নেই। সবার কাছেই ডলার। তারা এই বাস মিস করলে নিজ খরচে সাকারিয়া যেতে হবে। সুতরাং, তারাও একটা দোটানার মধ্যে পড়ে গেছে। পরে আমি বললাম আপনারা সকলে চলে যান। আমি একাই দেখি কি করা যায়। এই বলে উনাদের সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। আমার পৃথিবীতে আমি তখন একা।
দুপুরের রুক্ষ রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। সাথে যতগুলো ছাত্র-ছাত্রী ছিল তারা ইতোমধ্যে নিজ নিজ শহরের বাসে উঠে চলে গেছে। তখন শুধু আমি, আফ্রিকান একটা ছেলে আর সেই স্বেচ্ছাসেবক কর্মীটি দাঁড়িয়ে আছি। আমার কাছে একটা ইয়া বড় ট্যাব ছাড়া কোনো ফোন নেই। ট্যাবে আবার তুর্কিশ কোনো সিম না থাকায় ইন্টারনেট ও নেই। তারমানে গুগল ট্রান্সলেটর ইউজ করার ও কোনো স্কোপ নেই। এখন এখানের পথঘাট কিছুই আমি চিনিনা। স্বেচ্ছাসেবক ছেলেটা আবার ইংরেজি জানেনা, আমাকে আবার নিজ খরচে এয়ারপোর্টে ফেরত যেতে হবে, কাছে কোনো লিরা নেই, আশ পাশ থেকে ডলার ভাঙিয়ে লিরা করতে না পারলে এই মাঠেই মারা যেতে হবে। আবার এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য গাড়ির টিকিট করতে হবে, যেটা স্বেচ্ছাসেবক ছেলেটা ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার সামনে দুস্তর সরিশা ফুলের গাছ দেখতে লাগলাম। এতকিছুর পরও আমার হাসি মোটেই থামছে না। পাশের ওরাও থেকে থেকে অবাক হচ্ছে। সবথেকে সিরিয়াস মোমেন্টগুলোতে খিলখিলিয়ে হাসার কারণে জীবনে কতবার যে কত বিব্রত পরিস্থিতে পড়েছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আফ্রিকান ছেলেটা ইংরেজি জানে, তাও আবার চোস্ত ইংরেজি, তার সাহায্য নিয়ে ভলান্টিয়ার ছেলেটাকে বললাম, ব্যাগ হারিয়ে তো কম্ম সেরেছি, আবার বাস ও মিস করলাম, এখন বলো এর পরে কি?
সে বলল, “পারা ভার মা?” মানে সাথে টাকা-কড়ি কিছু আছে কিনা। বললাম, আছে কিন্তু সব ডলার। ডলারে পকেট ফুলে আছে কিন্তু এই ডলার দিয়ে তো কাজ হবে না, এগুলোকে লিরা করা লাগবে, কোথা থেকে করব? সে পাশের একটা বড় বিল্ডিং দেখিয়ে দিয়ে বলল, ওখানে গিয়ে খুঁজে বের করো, ওখানে মানি এক্সচেঞ্জের দোকান আছে। আর আমি ততক্ষণে আফ্রিকান ছেলেটাকে ওর গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি। আমি তখন বললাম, ও চলে গেলে তাহলে তোমার সাথে আমি কথা বলব কিভাবে? ও বলল, সমস্যা নেই, গুগল ট্রান্সলেটর আছে আমার কাছে। আমি বললাম, অকা, তাই-ই হোক তবে। এই বলে ও আফ্রিকান ছেলেটাকে বাসে তুলে দিতে গেল, আর আমি বড় ল্যাগেজ আর আরেকটা কাঁধ ব্যাগ নিয়ে হেলতে দুলতে গেলাম ডলার ভাঙাতে। ডলার ভাঙিয়ে ও আমাকে একটা গাড়িতে উঠিয়ে দিল। গাড়ির ছিটে বসে হেলান দিয়ে ভাবতে লাগলাম, তুরস্কে এসেছি মাত্র আড়াই ঘণ্টা হলো, অথচ কি ঝড়টাই না বয়ে যাচ্ছে এই অল্প সময়ে। সুন্দরবন না হয় বুলবুলকে ঠেকিয়ে দিল, কিন্তু আমি কি দিয়ে ঠেকাতাম এই ঝড়?
বাসে উঠে বসে আছি, বাস মিনিট পনের পর ছাড়বে। আমার হাতের বাম পাশের সিটের সারিতে দেখি সমবয়সী একটা ছেলে বসে আছে। কি বলে কথা শুরু করব এই ভেবে হুট করে জিজ্ঞাসা করে বসলাম, “এক্সকিউজ মি, ডু য়্যুউ নো ইংলিশ?”। ও বলল, ইয়েস আই নো ইংলিশ। এটা শুনে জানে পানি ফিরে পেলাম। যাক, একজনকে পেলাম অবশেষে। এবার তাকে বললাম, তুমি কোথায় যাবে? সে বলল, সে ও ইস্তাম্বুল নিউ এয়ারপোর্টে যাবে, ইন্ডিয়া থেকে নেদারল্যান্ডস যাবে তার এক বন্ধু, মাঝে ঘণ্টা পাঁচেকের জন্য ট্রানজিট পাবে ইস্তাম্বুল নিউ এয়ারপোর্টে, সেই ঘণ্টা পাঁচেকের জন্য বন্ধুর সাথে দেখা করতেই সে এয়ারপোর্ট যাচ্ছে। আমি শুনে বললাম, তোমাদের বন্ধুত্ব হাজার বছর বাঁচুক । আমি এক জায়গায় যাব, অথচ মানুষের সাথে কথা না বলে ভং ধরে বসে থাকব, এই জিনিসটা আমার ন্যাচারের সাথে কখনোই যায় না। একটু কথা বলতেই দেখলাম কথা জমে উঠছে। ও তখন বাম পাশের সারি থেকে উঠে আমার পাশের ফাঁকা সিটে এসে বসল। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম কোন দেশের। বলল ইয়েমেনের, ইস্তাম্বুল য়্যুনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স এণ্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের জানার পর তো, আরবীতে কথা না বলে থাকতে পারলাম না।
ক্লাস নাইন-টেনে থাকতে কত আন্তরিকতা দিয়েই না মারুফ রুসাফী আর ইমরুল কায়েসের সাহিত্যকর্ম ও তার ব্যাখ্যাগুলো পড়তাম! আরবী সাহিত্য ছিল আমার সবথেকে ফেভারিট সাবজেক্ট। নাম্বার পেতামও সবথেকে বেশি। পরে এসে অবশ্য সে ভালোলাগার জায়গাটা ইংরেজি দখল করে নেয়। তো কমিউনিকেটিভ আরবী জানার বহর যা ছিল সবটুকু উজাড় করে দিয়ে তার সাথে কনভার্সেশন চালাতে লাগলাম, এক পর্যায়ে আমার সাথে এয়ারপোর্ট থেকে নেমে যা যা হয়েছে সব খুলে বললাম, ও শুনে খুবই অবাক হলো আর সান্ত্বনা দিল। বলল চিন্তা করো না, তুরস্কে সাধারণত চুরি হয় না বললেই চলে, চুরির কথা সে এখনো পর্যন্ত শোনেনি কখনো। আর সিরিয়া থেকে উদ্বাস্তু আসার আগে তো চুরি হতোই না এক প্রকার। আর এয়ারপোর্ট এরিয়ায় তো চুরি হওয়ার প্রশ্নই আসে না এত এত সিকিউরিটির মধ্যে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, ভালো কিছুই হবে। এরপর তার দেশের বর্তমান যুদ্ধ-পরিস্থিতি নিয়ে কিছু রাজনৈতিক আলাপ হলো। কে লাভবান হচ্ছে, কে কেমন ভুমিকায় আছে ইত্যাকার আলাপ দিয়েই শেষ পর্যন্ত কথা চলল।
কথার এক পর্যায়ে ও আমাকে ওর ইস্তাম্বুলের সিভিল বাস কার্ড হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এটা তোমার। আমি বললাম, এটা আমাকে এভাবে কেন দিচ্ছ? তোমার লাগবে না? বলল, না। এটার দাম মাত্র ৫ লিরা হবে হয়ত। তুমি এটা রাখো। এই কার্ডে কিছু টাকা আছে। ইস্তাম্বুলে চলাচল করতে গেলে এটা তোমার লাগবেই। মেট্রো থেকে শুরু করে বাস, সবখানেই এই কার্ড লাগবে। না হলে বিপদে পড়বে। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে কার্ডটা মানিব্যাগে পুরো নিলাম। পরে ১ মাস পর যখন প্রথম সাকারিয়া থেকে ইস্তাম্বুল ভ্রমণে গেলাম, তখন আমার বিপদের বন্ধু আল জারাদি মোহাম্মাদের দেয়া কার্ডটাই সবখানে কাজে লেগেছিল। তার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে অবশ্য আমি কোনো অংশে কমতি করিনি। এখনো আমাদের যোগাযোগ আছে ফেসবুকে। তো ওর সাথে একত্রে এয়ারপোর্টে নামলাম। ও আমাকে বলল, চলো তোমার স্কলারশিপের বুথে নিয়ে চলো। আগে গিয়ে ওদের সাথে কথা বলে ওদেরকে ব্যাপারটা জানাই। আমি বললাম, চলো, আমাকে একটু সঙ্গ দাও, আমি ভাষা জানিনা। ওরা আবার ইংরেজি না জানলে খুব বিপদে পড়ব।
যদিও পরে জানতে পারি ওদের ঐ ১ জন স্বেচ্ছাসেবক যার সাথে প্রথম ‘অতুগারে’ কথা হয়েছিল, ও বাদে বাকি সবাই-ই ইংরেজি জানে। এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকে যে জায়গায় ওদের বুথ ছিল সেখানটাতে গিয়ে দেখলাম অনেকে বেশ আয়েসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। একজনকে গিয়ে প্রথমে সালাম দিলাম। দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম ইংরেজি জানে কিনা। ইংরেজিতেই উত্তর দিল, জানে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আবারও। তাকে এক নাগাড়ে সব খুল বললাম, কি কি হয়েছে। সে শুনে বলল, চলো দেকিনি কোথায় রেখেছিলে তোমার ব্যাগটা সেখানে সবার আগে যাই। আমি বললাম, হ্যাঁ, এতক্ষণে আমার মনে এসেছে কোথায় রেখেছিলাম। তাকে বললাম সেই বেঞ্চের কথা। বলল, চলো। এদিক দিয়ে আসো। যেতে গিয়ে দেখি সজিব বসে আছে।
ও আচ্ছা, সজিবের কথা তো বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম। আমরা বাংলাদেশ থেকে একই ফ্লাইটে যতজন এসেছি, তাদের সকলেই সাকারিয়াতে যাব শুধু সজিব ছাড়া। তার শহর এবং গন্তব্যস্থল ইলাজিগ শহর। যেটা ইস্তাম্বুল থেকে বেশ দূরে। ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট থেকে তাকে আবার আরেকটা ফ্লাইট ধরে সেখানে যেতে হবে। সে তার দ্বিতীয় ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছে। তাকে অবশ্য ‘অতুগার’ তথা বাস স্ট্যান্ড থেকেই ফোন করেছিলাম আর বলেছিলাম আমার ব্যাগ হারানোর কথা স্কলারশিপ কমিটির বুথে গিয়ে বলতে। সে বোধহয় বলেছিল কিন্তু আমি না আসা পর্যন্ত স্কলারশিপ কমিটির স্বেচ্ছাসেবক দল কিছুই করতে পারবে না এই ধরণের উত্তর হয়ত তারা সজিবকে দিয়েছিল। সজিবের সাথে সামান্য কথাবার্তা শেষে আমি স্বেচ্ছাসেবকটির পিছুপিছু ছুটে চললাম তুর্ক মুলুকে আমার হারানো ব্যাগ ফিরে পাওয়ার এক বুক আশা নিয়ে।

মোহাম্মাদের দেয়া ইস্তাম্বুল কার্ড। যেটা দিয়ে সাকারিয়াতে আসার ১ মাস পর প্রথম ইস্তাম্বুল ভ্রমণের সময় মেট্রো এবং বাসের সুবিধা কোনো ঝামেলা ছাড়াই উপভোগ করেছি।
তার সাথে যাওয়ার আগে আল জারাদি মোহাম্মাদকে বললাম, তুমি চাইলে এখানে দাঁড়াতে পারো আর নতুবা তুমি চলে যেতে পারো, এতক্ষণ পর্যন্ত আমার সঙ্গ দেয়ার জন্য তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আর তোমার দেয়া কার্ডটার কথা আমি আজীবন মনে রাখব। ও বলল, কোনো সমস্যা নেই। তুমি যাও। আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তোমার যতক্ষণ সময় লাগে সময় নাও। আমার এখানে দাঁড়িয়ে থাকাই কাজ। আমার বন্ধু কখন এসে পৌঁছাবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। তুমি যাও, এক চক্কর দিয়ে এসে আমাকে জানাও ব্যাগটা পেলে কিনা। আমি বললাম তোমাকে এখন এত ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে যে, এত ধন্যবাদ দেয়ার পর সেগুলো আর রাখার জায়গা পাবে না। এই বলে আমি অপরিচিত সেই স্বেচ্ছাসেবকের সাথে হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে তাকে ইংরেজিতে বোঝাচ্ছি ঐ ব্যাগটা ফিরে পাওয়া আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। না পেলে আমার ভাগ্যে কি কি হতে পারে। সে শুনছে আর তার কপাল চিন্তার ভাঁজে কুঞ্চিত করছে। তখন আমি বিশ্বের অন্যতম সবথেকে বড় বিমানবন্দরের লবিতে হেঁটে চলা বিশ্বের সবথেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ একজন মানুষ। যে এক বুক আশা নিয়ে তার হারানো ব্যাগ ফিরে পাওয়ার আশায় হণ্যে হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। যেটা ফিরে না পেলে সে জীবনের অনেক কিছু হারাবে।

এয়ারপোর্টের মধ্যকার আন্তর্জার্তিক বহির্গমনের ছবি।
দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে সে বেঞ্চের নিকটে পৌঁছে খুবই আশাহত হলাম ব্যাগটা যেখানে রেখেছিলাম সেখানে দেখতে না পেয়ে। আমি তো মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার মত অবস্থা। ততক্ষণে নাম না জানা স্বেচ্ছাসেবকটি আমাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলতে লাগল, তুমি চিন্তা করো না। এয়ারপোর্ট এরিয়ার মধ্য থেকে কখনো কোনো জিনিস চুরি হয় না সাধারণত। এখানে এক জায়গায় কোনো ব্যাগ আধা ঘণ্টার বেশি পড়ে থাকতে দেখলে সেটাকে সিকিউরিটিরা সাধারণত বিস্ফোরক কোনো দ্রব্য বা হারানো কিছু ভেবে তুলে নিয়ে গিয়ে এয়ারপোর্টের নির্দিষ্ট “লস্ট এণ্ড ফাউন্ড” সেকশানে জমা দেয়। আশাপাশের ক্যামেরা দেখিয়ে আরও বলল, আর তাছাড়া এই সব ক্যামেরা দেখছো না? আমরা সিসিটিভি কন্ট্রোলরুমের ও সাহায্য নিতে পারব জরুরি মনে হলে। চলো এবার পাশের দায়িত্বরত সিকিউরিটি অফিসারকে জিজ্ঞাসা করি।
আমিও এটা শুনে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম এই ভেবে যে, আসলেই তো, এই এয়ারপোর্টের ব্যাপারে যখন উইকিপিডিয়াতে পড়েছিলাম, তখন তো পড়েছিলাম এই এয়ারপোর্টে সার্বক্ষণিক ৩৫০০ সিকিউরিটি পারসোনাল নিয়োজিত আছে, তাছাড়া এয়ারপোর্টের প্রতি ৬০ মিটার জুড়ে এরিয়া জুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা, প্রতি ৭২০ মিটার জায়গা জুড়ে থার্মাল এবং ফাইবার অপটিক ক্যামেরা, আর সবমিলিয়ে মোট ৯০০০ সিসিটিভি ক্যামেরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে, এত এত নিরাপত্তা বেষ্টনির পরও আমার মত সুবোধ একটি ছেলের হারানো ব্যাগ ফিরে পাব না?
অবশ্য এর মাঝে অবিরাম ইন্নালিল্লাহ আর বিভিন্ন দোয়া দুরুদ পড়েই যাচ্ছি। পাশে দাঁড়ানো সিকিউরিটি অফিসারকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, তাদের বিভিন্ন শিফট ভাগ করা আছে। প্রতি দু বা তিন ঘণ্টা অন্তর তাদের শিফট পরিবর্তন হয় এবং তারা জায়গা পরিবর্তন করে ডিউটি করে। সে সবে মাত্র মিনিট বিশেক হবে এখানে এসেছে। সে এখানে কোনো ব্যাগ জাতীয় কিছু পড়ে থাকতে দেখেনি। আহা! এটা শুনে তো আমার মাথার মধ্যকার ক্যামেরার পরিসংখ্যানগুলো এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেল এবং এত এত ক্যামেরা, গার্ড সবকিছুকেই চরম মূল্যহীন মনে হতে লাগল। এখন তাহলে উপায়? সাথে থাকা ছেলেটা আমাকে বলল, তুমি শুধু আমাকে অনুসরণ করো। চিন্তা, ভয়, উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তা নিয়ে গুটি গুটি পায়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে একটা টেবিলের উপর রাখা টেলিফোন নিয়ে নিজের কানের কাছে উচিয়ে ধরল। উচিয়ে ধরে তুর্কিশ ভাষায় কথা বলতে লাগত। কি বললা তার একটা শব্দ ও বুঝলাম না। কথা শেষ করে আমাকে সহজ ভাষায় তরজমা করে বোঝাল, সে এয়ারপোর্টের “লস্ট এণ্ড ফাউন্ড” সেকশনে ফোন দিয়েছিল। এয়ারপোর্ট এরিয়ায় কোনো কিছু হারালে সব সেখানে গিয়ে জমা হয়। তাদেরকে ফোনে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেছে তারা এমন কোনো ব্যাগ পায় নি। হয়ত তারা ফোনে কো-অপারেট করতে চাচ্ছে না। আমাকে বলল তুমি আমার সাথে চলো, তাদের সাথে গিয়ে সরাসরি কথা বলি তখন হয়ত তারা ব্যাপারটা গুরুত্বের সাথে নিবে।
আমি আশার শেষ আলোটুকু দেখতে পেয়ে তার কথা অনুযায়ী আবার তার পিছু পিছু হাঁটা শুরু করলাম। এয়ারপোর্টের লবি যেন অসীম, সীমাহীন। যার কোনো এ মাথা ও মাথা নেই। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় গিয়ে পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত জায়গায়। কাঁচের জানালার ওপাশে দু’জন হিজাব পরিহিতা ভদ্র মহিলাকে দেখতে পেলাম। রুমের ভিতরে দেখি ৩টি ব্যাগ সাজিয়ে রাখা। ৩টি ব্যাগের মাঝখানে আমার ব্যাগটা দেখতে পেয়ে রীতিমত আনন্দের আতিশয্যে জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম। অনবরত আলহামদুলিল্লাহ জপ করে চলেছি। চোখমুখ দিয়ে খুশি ঠিঁকরে বেরুচ্ছে। আমার এমন হণ্যে খুশি হওয়া দেখে ছেলেটা ও বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, পেয়েছ কি খুঁজে তোমার হারানো প্রেয়সিকে? আমি বললাম, পেয়েছি পেয়েছি। তাকে বোধহয় অক্ষত অবস্থাতেই খুঁজে পেয়েছি। ব্যাগটা দেখতে পেয়ে মনে মনে ভাবলাম, তুরস্ক সম্পর্কে দেশের অজ্ঞ মানুষদের থেকে যে পরিমাণ Prejudice নিজের মধ্যে ধারণ করে এসেছি, সেগুলোর জন্য মাফ চাওয়া কেবল শুরু হলো মাত্র। ঢাকা এয়ারপোর্টে কর্মরত শত শত অফিসারের মধ্য থেকে এক বানসূরি মোহাম্মদ ইউসুফ সাহেব নিজের উপর অর্পিত কাজটা ঠিকঠাকমত করেন বলে আমরা তাকে যেভাবে জাতীয় সেলেব্রেটি বানিয়ে ফেলি, সেখানে তুর্কি জাতি আমাদের মত এমন হুজুগে হলে ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে কর্মরত নাম না জানা এমন হাজার হাজার বানসূরি ইউসুফকে কিভাবে মাথায় নিয়ে নাচত সেটাই ভাবছি।
এখন হারানো ব্যাগ খুঁজে পেয়ে ব্যাগটা আমার সেটা দাবী করলেই তো আর ফর্মাল ড্রেস পরিহিতা অফিসারদ্বয় আমার হাতে ব্যাগটা হস্তান্তর করবে না। কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করল, ব্যাগটা কার, ব্যাগে কি কি কিসিমের জিনিসপাতি ছিল, ব্যাগে পাওয়া সার্টিফিকেটে কার নাম লেখা আছে এইসব। সবগুলো প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেয়ার পর বলল, পাসপোর্ট দিন। পাসপোর্ট দেয়ার পর সেটার দু’কপি ফটোকপি করে নিয়ে রেখে দিল এবং একটা কাগজে আমার দুই দুটো সাইন নিয়ে তারপর ব্যাগটি হস্তান্তর করল। আমি তখন ও হাসছি। তবে এই হাসি লজ্জার, সংকোচের বা তাচ্ছিল্যের কোনো হাসি নয়। অনেক বড় প্রাপ্তির হাসি। হাসতে হাসতেই ছেলেটাকে বলছি, দেখো তোমাকে কিভাবে ধন্যবাদ দিব সেটা জানিনা। তবে আগে শ’কয়েক বার আলহামদুলিল্লাহ পড়ে নিতে দাও। তারপর তোমাকে কিভাবে ধন্যবাদ দেয়া যায় সেটা নিয়ে ভাবছি। ও বলল ধন্যবাদ দেয়ার দরকার নেই। তোমার মত আগত ছাত্রদেরকে সাহায্য করাই আমাদের কাজ। একজন বিপদগ্রস্থ বিদেশী মানুষকে সাহায্য করতে পেরেই আমি খুশি। আর তোমার মুখের এই যে হাসিটা দেখছো না? ওটাই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি বললাম, তারপরেও তোমাকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আচ্ছা আমরা সেই কখন থেকেই তো এক সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছি অথচ এখনো পর্যন্ত তোমার নামটাই জানা হলো না।
ও বলল, আমার নাম মূস’আব। তোমার নাম কি? আমি বললাম, নাঈম মুছা, তবে তুমি আমাকে নাঈম বলে ডাকতে পারো। পরেরটা বাবার লকব, মূল নাম নাঈম। ও বলল, আচ্ছা। তারপরে আমাকে জিজ্ঞাসা করল আমি মূস’আব নামের সাথে আগে থেকে পরিচিত কিনা? আমি বললাম, বলো কি? মুসলিম হিসেবে মূস’আব ইবনে উমায়ের (রা.) এর নামই যদি না জানি তাহলে আর নিজেরই বা কি পরিচয় থাকল? ও বলল, যাক, খুব সুন্দর, তুমি তাহলে জানো দেখছি। এই বলে আমরা বিভিন্ন কথা বলতে বলতে আবার স্কলারশিপ কমিটির বুথের দিকে হাঁটতে থাকলাম। এর মাঝে ও আমাকে ভাই হিসেবে ১টা উপদেশ দিল। আমি বললাম একটা কেন আরও দাও। ও বলল, না একটাই যথেষ্ট। আমি বললাম, কি সেটা? ও বলল, পৃথিবীর যেকোনো এয়ারপোর্ট থেকেই কখনো কিছু কিনবে না একান্ত প্রয়োজন ছাড়া। যেমন ধরো, তোমার ইমার্জেন্সি পানির প্রয়োজন, তখন কিনতে পারো নতুবা না। আমি বললাম কেন? ও বলল, শুধু তুমি পানির উদাহরণই ধরো, ১ বোতল পানি এয়ারপোর্টের মধ্য থেকে কিনলে তোমাকে ৫ লিরা দিতে হবে, সেখানে তুমি ১ লিরা দিয়ে বাহির থেকে সেই একই পানি কিনতে পারবে। যেই সিমকার্ড এয়ারপোর্ট থেকে কিনলে ২০০ লিরা গুণতে হবে, সেটা বাহির থেকে ১০০ লিরা দিয়েই কিনতে পারবে। আমি বললাম, ও আচ্ছা। বুঝেছি তোমার কথা। যদিও এখনো পর্যন্ত আমি কিছুই কিনিনি এয়ারপোর্ট থেকে, তবে তোমার কথা ভবিষ্যত জীবনে বিদেশ ভ্রমণের সময় মাথায় রাখার চেষ্টা করব। আরেকটা ধন্যবাদ তোমার উপদেশের জন্য।
এসব সাঁতপাঁচ কথা বলতে বলতে আমরা বুথের কাছে চলে এলাম। এসে দেখি আল জারাদি মোহাম্মাদ ঠিক যেখানটাতে দাঁড়িয়ে ছিল এখনো ঠিক ওখানটাতেই দাঁড়িয়ে আছে। আমি যাওয়ার সাথে সাথে ও আমার দিকে ছুটে এল, এসে জিজ্ঞাসা করল ব্যাগ পেয়েছি কিনা। আমি খুব খুশির সাথে বললাম, হ্যাঁ পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। ও বলল, যাক অনেক বড় টেনশন থেকে মুক্ত হলাম। সজিব বসে ছিল, ওকে গিয়েও খবরটা দিলাম। এরপর মূস’আব আমাকে বলল, তোমাকে এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ তোমার জন্য আবার নতুন করে অনলাইনে বাসের টিকিট কাটতে হবে, আর ততক্ষণে আরও কয়েকটা দেশের ছাত্রদের ফ্লাইট এসে পৌঁছাবে। তখন তোমরা সকলে সংখ্য়ায় বেশি হলে সবাইকে একত্রে আমরা এখান থেকে মিনিবাসে তুলে দিয়ে ‘অতুগার’ থেকে সাকারিয়ার মূল বাসে তুলে দিব। আমি বললাম ওকে। সেই ভোরবেলা থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত এই লম্বা সফর আর এতক্ষণ দৌঁড়াদৌঁড়ি করে আমি এমনিতেই অনেক ক্লান্ত। এখন বসে বসে অপেক্ষা করতে আমার কোনোই আপত্তি নেই। যদিও এই ব্যাগ না হারালে এতক্ষণে আমার সাথের অন্য বাঙালি ভাইদের মত ডরমিটরিতে গিয়ে গরম পানিতে শাওয়ার সেরে হয়ত ধোঁয়া ওঠা চায়ের মগে চুমুক বসাতাম। ভাগ্যের লিখন যায় না খণ্ডন। থাক ওসব আর ভেবে লাভ নেই এই বলে আমি বুথের একটা সোফার উপর ধপ করে বসে পড়লাম। বসে চোখ বুঁজে একটু রিভিউ করার চেষ্টা করলাম সারাদিন আজ কি কি অভিজ্ঞতার স্বীকার হলাম।
এর মাঝে দেখি আরেকটা ছেলে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে মূস’আবকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করছে, ব্যাগ ফেরত পেয়েছি কিনা। আমি চোখ তুলে তাকালাম ওর দিকে। ছিম ছাম গড়নের হ্যাঙলা পাতলা আর মাথায় কাঁধ পর্যন্ত বড় চুলওয়ালা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে শুধু ভাবতে থাকলাম, আচ্ছা রোয়ান অ্যাটকিনসন আইমিন যাকে আমরা মি. বিন নামে চিনি, আমাদের সোনালী শৈশবকে সুন্দর স্মৃতিতে ভরপুর করে দেয়া লোকটার মাথায় কি কখনো এত বড় চুল দেখেছিলাম? নিজের কাছ থেকে উত্তর পেলাম ‘না, দেখিনি’। নেতিবাচক উত্তর না পেলে বোধহয় ছেলেটাকে সত্যি সত্যিই মি. বিন বলে চেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরতাম! দু’জন মানুষের মাঝে কিভাবে এত মিল থাকতে পারে? আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য ছেলেটাকে বলেই বসলাম, আরে তুমি তো একদম হুবহু মি. বিনের মত দেখতে! তুমি নিজে কি আসলেই মি. বিন নাকি তার কোনো আত্মীয় হও? তুমি কি মি. বিনকে চেনো? আমার সাথে কখনো কোনো কথা না বলা ছেলেটা আমার মুখ থেকে সর্বপ্রথম এই ধরণের মন্তব্য শুনে একটু হতচকিতয়ে গেল। দম ফেলে বলল, কোন মি. বিন? আমি বললাম, আরে ঐ যে ছোটবেলায় আমরা টিভিতে মানুষ মি. বিন আর কার্টুন মি. বিন দেখতাম না? তুমি ওকে চিনো না? ওর আসল নাম রোয়ান অ্যাটকিনসন? লণ্ডনে বাড়ি, কিছু মুভিতেও অভিনয় করেছে, চিনো ওকে? ও নাতিদীর্ঘ বর্ণণা শুনে বলল, ও আচ্ছা, হ্যাঁ এইবার চিনেছি।
তবে তুমি বলতে চাচ্ছ আমি তাহলে মি. বিনের মত দেখতে? আমি বললাম, দেখতে মানে, তুমি আলবৎ ওর মত দেখতে! বিশ্বাস না হলে ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে ওর ছবির সাথে তোমার মুখের ছবি মিলিয়ে দেখো। ও আমার এমন আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তা শুনে একটু চিন্তায় পড়ে গেল বলে মনে হলো। সত্যি সত্যিই পকেট থেকে ফোনটা বের করে গুগলে সার্চ করে ছবির সাথে মিলিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ করে পাশে বসে থাকা আরেক তুর্কি স্বেচ্ছাসেবককে তুর্কি ভাষায় জিজ্ঞাসা করতে লাগল, আরে হারে, সত্যিই কি আমি মি. বিনের মত দেখতে নাকি রে? এমন তো আগে কখনো কেউ বলেনি? তখন তুর্কি ভাষার একটাও শব্দ না জানা আমি ওর মুখের ভাব আর কথার ভঙ্গিমা দেখে এতটুকুই ধারণা করতে পারলাম। আমার এমন অনাহুত মন্তব্য শুনে ও খুশি হলো না বিরাজ হলো সেটা বুঝতে পারলাম না। এর মাঝে কথা বলতে বলতে সজিবের দ্বিতীয় ফ্লাইট চলে এসেছে। ও আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। বললাম, ছুটিতে অবশ্যই অবশ্যই সাকারিয়াতে এসে বেড়িয়ে যেতে। যদিও তখন অবশ্য আমার নিজেরই কোনো কুল-কিনারা নেই তাতে আবার নতুন আরেকজনকে দাওয়াত দিচ্ছি খুব আয়েশি ভঙ্গিতে। সাধ্য না থাকলেও কি? বুকের বাম পাশের কলিজাটা তো আর ছোটো না! সজিব বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই মূস’আব এসে আমাকে বলল, তোমার টিকিট রেডি। এয়ারপোর্টের গেটে মিনিবাস ও চলে এসেছে। ব্যাগগুলো সব ঠিকঠাকমত গুণে নিয়ে চলো ওঠা যাক।
এই বলে ও আমার বড় ল্যাগেজের হ্যাণ্ডেল ধরে হাঁটা শুরু করল। আমি সৌজন্যতার অনুষঙ্গ হিসেবে ওকে বলার চেষ্টা করতে লাগলাম, আরে থাক থাক, তুমি এমনিতেই আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছ, আবার কষ্ট করে আমার ল্যাগেজ বহন করতে হবে না। আমাকেই দাও। আমিই পারব। ও আমার মেকি সৌজন্যতাবোধ বুঝুক আর নাই বুঝুক, আমি যে বিভৎস ক্লান্ত সেটা ও ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। আর সেটা বুঝেই খানিকটা নির্দেশের সুরেই বলল, তুমি তোমার বাকি দুটো ব্যাগ নিয়ে চলতে থাকো, ল্যাগেজের দায়িত্বটা আমার উপরেই ন্যাস্ত করো। এই বলে ও আমাকে একেবারে মিনিবাস পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসল। বুথ থেকে মিনিবাস পর্যন্ত বেশ খানিকটা হাঁটার পথ। এর মধ্যে যেতে যেতে শুনলাম, কোথায় পড়াশোনা করো, কি করো। বলল, ইস্তাম্বুল য়্যুনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়ি। ফাইনাল ইয়ারে আছি। আর বছরখানেকের মধ্যেই স্নাতকের পাঠ চুকিয়ে ফেলতে পারব বলে আশা করি। আমি বললাম তারপরে কি করবে বলে কিছু ঠিক করেছ নাকি? মাস্টার্স বা পিএইচডি’র ব্যাপারে কিছু ভেবেছ নাকি? বলল, ওদিকটাতে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। কোনোরকমে অনার্স শেষ করে একটা ভালো রেজাল্ট নিয়ে সোজা কোর্টে দৌঁড়াব। আইনজীবী আর বিচারক, যেটা হওয়ারই সুযোগ পাই না কেন ওটাই লুফে নিব। আমি বললাম, যাক খুবই ভালো চিন্তা। তুরস্ক এমনিতেই সম্প্রতি খানিকটা যুব সমাজের বেকারত্বের সমস্যায় ভুগছে। তোমার এই চিন্তার প্রভাব বেকারত্বকে কিছুটা হলেও লাঘব করবে তাহলে। ও বলল, তা অবশ্য খারাপ বলো নি।
মিনিবাসে ওঠার সময় ও আমাকে একটা কাগজে ওর ফোন নাম্বার লিখে দিল, বলল পরেরবার কখনো ইস্তাম্বুলে কোনো কাজে আসলে যেন অবশ্যই অবশ্যই ওকে ফোন করি। আমি বললাম, ওকে। চেষ্টা করব। এই বলে ও বিদায় দিতে যাবে ঠিক সে সময়ই কোথা থেকে রোয়ান অ্যাটকিনসন উদয় হয়ে বলল, আমি তোমাদের সাথে ‘অতুগার’ পর্যন্ত একই মিনিবাসে করে যাব, তারপর ওখান থেকে অন্য গাড়িতে করে আমার বাসায় চলে যাব। আমি বললাম, সেটাতো আমার সৌভাগ্য। তখন মূস’আব আর আল্পের সহায়তায় বড় ল্যাগেজ আর আরেকটা হ্যান্ডব্যাগ মিনিবাসের পিছনে দিয়ে ল্যাপটপের ব্যাগটা কোলে করে নিয়ে মিনিবাসের একটা ছিটে উঠে বসলাম। এবার অবশ্য আর ভুল করিনি ব্যাগ ফেলে যাওয়ার মত। তারপরেও নিজের উপর অবিশ্বাস করে মিনিবাসের পিছনের দিকে আরেকবার তাকিয়ে বাকি ব্যাগ দুটো দেখে সর্বতভাবে নিশ্চিত হয়ে নিলাম। পাশের ছিটে এসে রোয়ান অ্যাটকিনসন বসল। আমি বললাম, যাক ভালোই। এয়ারপোর্ট থেকে অতুগার পর্যন্ত যাওয়ার পথটুকু আর বোরিং কাটবে না তাহলে এবার। ওর সাথেই গল্প করে কাটানো যাবে সময়টুকু। রোয়ান অ্যাটকিনসন ইংরেজি পারে। সবার প্রথমে শুনলাম তোমার নাম কি? বলল, আল্প। আমি বললাম, সুলতান আল্প আরসালানের আল্প নাকি আল্পস পর্বতমালার আল্প, কোনটা? ও বলল না, আমারটা সুলতান আল্প আরসালানেরই আল্প। আমি বললাম, খুব সুন্দর।
ও আমার নাম জিজ্ঞাসা করলে মূস’আবকে ঠিক যা যা বলেছিলাম ওকেও ওভাবে একটা ছোট ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম। শুনে বলল, বুঝেছি। তারপরে কথায় কথায় অনেক কথায়ই হলো। তবে ততক্ষণে আশ্চর্য হওয়ার আরও কিছুটা বাকি আছে। আমি বললাম, তা পড়াশোনা করো কোথায়? বলল, য়িলদিজ টেকনিক্যাল য়্যুনিভার্সিটিতে পড়ি। আমি বললাম, বাবারে! ওটাতো ইস্তাম্বুলের একটা অনেক হাইলি সিলেক্টিভ ভার্সিটি। যাক খুব ভালো। তারপরে জিজ্ঞাসা করলাম কোন সাবজেক্টে পড়ো? বলল, ইলেক্ট্রিক্যাল এণ্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ি। আমি বললাম, কি বললে আবার বলো? ও বলল, ইলেক্ট্রিক্যাল এণ্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ি। আমি বললাম, নিশ্চয় তুমি আমার সাথে মশকরা করছো। ও বলল, কেন? মশকরা কেন করব? এটা নিয়ে আবার মশকরা করার কি হলো? আমি বললাম, তুমি কি জানো মি. বিন মানে রোয়ান অ্যাটকিনসন সে ও অক্সফোর্ড য়্যুনিভার্সিটি থেকে EEE নিয়ে পড়া? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তোমাদের দু’জনের মাঝে এত মিল কিভাবে থাকতে পারে? পার্থক্যটা শুধু তোমার চুল বড় আর তার চুল ছোটো। আর বাকি সবই এক, বিশ্বাস করো তোমরা দু’জন দেখতে একদম একই রকম। ও বলল, তুমি জানো আজকে আমার খুব ভালো লাগছে। এই প্রথম আমাকে কেউ বলল যে আমি নাকি মি. বিনের মত দেখতে। এর আগে কেউ কখনো আমাকে এভাবে বলেনি। আমি বললাম, কেউ বলুক আর নাই বলুক। আমি যা বললাম সেটাই সত্যি।
এর পরে পুরো পথে যেতে যেতে আমাদের অনেক কথা হলো, কে কয়টা ভাষা পারি, কার শখ কি কি, কার ফেভারিট রাইটার কে, ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি, কার কয় ভাই-বোন আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মাঝে সে আমার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে একটা সেলফি তুলল। বলল এটা ওর বন্ধুদের গ্রুপে পাঠাবে। আর ওদেরকে বলবে, এই ছেলেটা আজকে আমাকে বলেছে আমি নাকি মি. বিনের মত দেখতে। এই ঘটনার দ্বারা বুঝলাম, ছেলেটাকে বোধহয় এক কথাতেই অনেক বেশি খুশি করে ফেলেছি! ছেলে তো দেখি এখন এটাকে ভিন্ন মাত্রা দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। আমি ভাবলাম ছবি তুলে বন্ধুদের যখন দেখাতেই চাচ্ছে তখন দেখাক সমস্যা কি? একটু বুঝুক, আমরা বাঙালরা কি জিনিস, কতটা রসিক আর বন্ধুবৎসল। কই মিনিবাসে তো আরও অনেক দেশের ১০-১২ জন ছাত্র-ছাত্রী আছে, তারা তো তাকে এভাবে বলল না? মানে তাদের চোখে তো এই রকম শৈল্পিক জিনিস ধরা পড়ল না! এটা ভেবে নিজের মধ্যে এক প্রকার শিল্প বিশারদের অনুভূতি জেগে উঠল। ভাবতে লাগলাম আমরা বাঙালি জাতি আসলেই অনেক শৈল্পিক। কথা বলতে বলতে অতুগারে চলে আসলাম। ও মিনিবাস থেকে ব্যাগপত্র নামিয়ে দিয়ে মূল বাসের বাঙ্কারে ব্যাগপত্র উঠিয়ে দেয়া পর্যন্ত থাকল। ওকে বিদায় জানালাম, বিদায় বলার সময় কোলাকুলি করলাম বাঙালি স্টাইলে।
তুর্কিতে আবার কোলাকুলির সিস্টেম আমাদের দেশ থেকে আলাদা। ওরা শুধু মাথার দু’পাশে পর্যায়ক্রমে ঠোকা লাগিয়ে কোলাকুলি করে। অনেকটা আমাদের দেশে মাথায় অনিচ্ছকৃতভাবে একবার ধাক্কা লাগার পর শিং ওঠার ভয়ে যেভাবে আবার আলতো করে আরেকবার ঠোকর লাগাই ঠিক সেভাবে। তবে আমি পুরো বাঙালি স্টাইলে ওকে বুকে জড়িয়ে কোলাকুলি করে তবেই বিদায় জানালাম। দূর্ভাগ্যবশত আমার কাছে কোনো সিম না থাকায় আমাদের মধ্যে আর ফোন নাম্বারের আদান-প্রদান হলো না। সে-ও দেখলাম আমাকে বলল না ওর ফোন নাম্বারটা কাগজে লিখে নিতে যেমনটা মূস’আব বলেছিল। আমারও আর মাথায় তখন ব্যাপারটা এলো না। সোজা বাসে ওঠে বসলাম। বাসে ওঠার পরে সেই যে এক ঘুম দিয়েছি আর একদম সাকারিয়াতে গিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেছি। এর মাঝে শুধু একবার বাসে নাস্তা দেয়ার সময় ছোট্ট এককাপ চেরি ফলের জুস আর একটা কেক খেয়েছি। আমার গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো না আরেকটু বড় করি। কোনো ছোট জিনিস টেনে বড় করায় আমি বরাবরই বেশ পারঙ্গম। ভাবলাম মূস’আবের নাম্বার যখন একবার নিয়েছি, মাসখানেক পর যখন কিছুটা কাজ চালানোর মত তুর্কি ভাষা শিখব তখন ওকে একদিন হুট করে রাতের বেলায় ফোন করে সারপ্রাইজ দিব। যেই ভাবা সেই কাজ।
মাসখানেক বাদে একদিন রাতে ফোন দিয়ে বসলাম মূস’আব কে। ফোন দিয়ে সালাম-কালাম শেষে বললাম, “বু কিম?” এর অর্থ এটা কে? “বু মূস’আব মু?” এটা কি মূস’আব? ওপাশ থেকে উত্তর এলো, “এভেত, বেন মূস’আব, সয়লে”। হ্যাঁ, আমি মূস’আব, বলো। তারপর তুর্কি ভাষাতেই জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছো? দিনকাল কেমন যায়? এটুকু জিজ্ঞাসা করার পর আমার জানার বহর শেষ! তারপরে বাকিটা ইংরেজিতেই বকে গেলাম। বললাম, এক বিদেশিকে ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে হারানো ব্যাগ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিলে। মনে পড়ে? বলল, হ্যাঁ কি বলো, কেমন আছো তুমি? তোমার নাম নাঈম, তাই তো? আমি বললাম, হ্যাঁ, ঠিকই চিনতে পেরেছো দেখছি। কথায় কথায় আবারও ধন্যবাদ দিলাম সেদিনের আন্তরিক সহায়তার জন্য। বললাম, কখনো, কোনোদিন, ভুল করেও যদি ইস্তাম্বুল থেকে সাকারিয়াতে চলে আসো, অন্তত আমাকে একটা ফোন কল দিও। দু’জনে মিলে এক সাথে চা বা কফি খাব। ও বলল, ওকে ঠিক আছে। সেটা আর নতুন করে বলতে হবে না। আমি বললাম, আল্পের কোনো খোঁজ খবর জানো নাকি? ও বলল, চুল বড়ো করে ঐ ছেলেটা যাকে তুমি মি. বিন বলেছিলে? আমি বললাম, হ্যাঁ। ও বলল, আসলে তোমাদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করা ওটা আমাদের এক সপ্তাহের মত একটা প্রজেক্ট ছিল। যেই প্রজেক্টে আমরা ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছি। এর মধ্যে আমরা সবাই সবাইকে চিনি না।
আল্পের সাথে আমার এয়ারপোর্টে খুব সামান্যই কথা হয়েছে। তারপরে ওর সাথে আমার আর কখনো যোগাযোগ হয়নি। এমনকি ওর ফোন নাম্বার ও আমার কাছে নেই। আর আমরা দু’জন দুই য়্যুনিভার্সিটির। সুতরাং, ওর ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারছি না। আমি বললাম, সমস্যা নেই। আল্প ও আমাকে হেল্প করেছিল সেদিন গাড়ি থেকে ব্যাগপত্র নামিয়ে আরেক গাড়িতে তুলতে। ওর অতিরিক্ত ধন্যবাদটা না হয় তোলাই থাকল। পৃথিবী তো গোল, যদি কোনোদিন কোনোক্রমে দেখা হয়েই যায়, তাহলে না হয় সেদিনই জানাব। এই বলে আমাদের দু’জনের দুপ্রান্তের কল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আর এক জটলা মধুর স্মৃতি নিয়ে আমিও হারিয়ে গেলাম সাকারিয়ার রক্ত হিম করা কনকনে শীতের রাতে নিদ্রার অতল গহ্বরে। ঘুমের মধ্যে অনেক কষ্টে আল্পকে খুঁজে পেলাম আর ওকে অতিরিক্ত ধন্যবাদটাও জানিয়ে আসলাম, কিন্তু বাস্তবে কি আর কোনোদিন পাব আল্পের দেখা? উত্তরটা আমরা জানা নেই।
লিখেছেন:
নাঈম মুছা
শিক্ষার্থী,
সাকারিয়া ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক
আপনাদের প্রিয় ওয়েবসাইট TRT Bangla এন্ড্রয়েড এপ্স লঞ্চ করেছে। প্রত্যেকে নিজের মোবাইলে ইন্সটল করতে ছবিতে ক্লিক করুন।