ধারাবাহিকঃ সর্বশ্রেষ্ঠ মামলুক সুলতানঃ রুকনুদ্দিন বাইবার্স

সুলতান রুকনুদ্দীন বাইবার্স এঁর একটি মূর্তি ।

 

•লেখকঃ নাসরুল্লাহ কায়সার

( প্রথম পর্ব )

খৃস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কাল। মুসলিম
দুনিয়া তখন অতিক্রম করছে নিজেদের ইতিহাসের
কঠিনতম ক্রান্তিকাল। চারদিকে শুধু আগুন, রক্ত আর ধ্বংসের কল্লোল। পশ্চিম থেকে বানের মতো
ধেয়ে আসছে একের পর এক সিরিজ ক্রুসেড। পূর্ব দিকে কিয়ামতের বিভীষিকা নিয়ে কড়া নাড়ছে তাতারি মরুঝড়। গোবি’র বুক চিরে ওঠা এই ঝড়; সভ্য দুনিয়ার সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে হিংস্র গতিতে আগাচ্ছে।দানবের গ্রাসে ইনসানিয়্যাত হয়ে পড়েছে অপাংক্তেয়। কাপালিকের কৃপাণে মানবতার খাক-খুন গড়াগড়ি ছিল নৈমত্তিক। বিধ্বংসী মরু সাইমুমের এই তাণ্ডব সবচে’ বেশি কিন্তু সইতে হয়েছে মুসলিম উম্মাহকেই! আব্বাসী খিলাফতের বাইরে মধ্য ও পূর্ব এশিয়া নিয়ে গড়ে ওঠা বিশাল মুসলিম খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য ছিল মোঙ্গল তুফানের প্রথম শিকার। মাত্র তিন বছরের মাথায় সমগ্র
খাওয়ারিজম চলে গেলে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের পেটের গভীরে।

মোঙ্গলরা ছিল লম্বা-চওড়া চেহারার মানুষ। গায়ের রঙ
হলদেটে। এদের ঘোড়াগুলি খর্বকায় হলেও, ছিল ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন। এরা ছিল লক্ষ্যভেদী তীরান্দাজ। এদের দূরপাল্লার তীর-ধনুক ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম। এদের দ্রুতগতি, তীরের অপ্রতুলতা, হিংস্রতা এবং পঙ্গপাল সদৃশ সংখ্যাধিক্যের কারণে মানুষ এদেরকে ইয়াজুজ-মাজুজ বলেই ভাবতো। এদের সংগঠক ছিলেন অখ্যাত এক তেমুজিন। ইতিহাস বিখ্যাত চেঙ্গিস খান।

১২৩৭ সাল। মোঙ্গল সেনাপতি সুবুদাই।সাম্রাজ্যহারা শাহে খাওয়ারিজম, সুলতান আলাউদ্দিনকে তাড়া করে
ঢুকে পড়লেন নতূন এক ভূখণ্ডে—কিপচাক।

কিপচাপ। রাশিয়ার ইয়াইক ও ভল্গা নদীর মধ্যবর্তী
ককেশাস পর্বতমালার পাদদেশে ছোট্ট এক ভূখণ্ড।
এখানেই অন্যান্য তুর্কী গোত্রের সাথে কুমান
সম্প্রদায়ের বাস। জাতিতেকিপচাপের প্রায় সবাই
মুসলমান। শৈশবে বন্য নেকড়ে, কৈশোরে বাঘ আর যৌবনে সিংহের সাথে টক্কর দিয়েই এরা বেড়ে ওঠে।
তাই প্রাকৃতিকভাবেই এরা দুরন্ত। দুর্ধর্ষ যুদ্ধাজাত। এই
কুমান সম্প্রদায়েই ১২৩৩ সালে জন্ম নেন দুর্ধর্ষ এক
সেনানায়ক—বাইবার্স।তুর্কীতে বাইবার্স মানে প্রধান চিতা। তাই ইতিহাসে আজো তিনি দ্য প্যান্থার।

কিপচাকবাসী দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হলেও, নিজেদের ভূখণ্ডে
আচমকা নতূন এক প্রজাতির আগমন দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভেসে যায় বিদ্যুৎ গতির মোঙ্গল সয়লাবে। পতন ঘটে স্বাধীন কিপচাক ভ্যালির। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কুমানসহ কিপচাকের অন্যান্য সম্প্রদায়। পুরুষরা গণহারে নিহত হয়। মেয়ে ও শিশুরা হয় বাজারের পণ্য— মামলুক, দাস। এদের মধ্যে চার বছরের শিশু বাইবার্সও
ছিলেন। কে জানতো, কালক্রমে তিনিই হয়ে
উঠবেন মোঙ্গলদের জীবন্ত ত্রাস। ক্রুসেডের মূর্তিমান
আতংক! মোঙ্গলরা সবার সাথে তাকেও দাসবাজারে বিক্রি করে দেয়। শুরু হলো নতূন জীবন। মামলুক অধ্যায়। স্বাধীন হয়ে জন্মেও দেশ থেকে মহাদেশে চললো তার দাসত্বের ঘুর্ণন।

একবছর পর। পাঁচ বছরের বাইবার্স দাস ব্যবসায়ীদের
সাথে ইউরোপের রাশিয়া থেকে এবার এলেন এশিয়ার
দামেস্কে। মাত্র অাটশ’ দিরহামে দ্বিতীয়বার বিক্রি হলেন এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে। তিন বছর পর। চোখের ছানির কারণে সে ব্যক্তি তাকে ফিরিয়ে দেন
সেই ব্যবসায়ীর কাছেই। কিছুদিন পর আইতাকিন নামক একজন সেনানায়ক তৃতীয়বারের মতো তাকে
কিনে নেন নামমাত্র মূল্যে! এবার তার গন্তব্য আফ্রিকার
কায়রো। কারণ, আইতাকিন ছিলেন মিসরের আইয়ূবীয়
সালতানাতের একজন অভিজ্ঞ জেনারেল।

এই সেই আইয়্যূবী সালতানাত। যার ভিত্তি গড়ে ওঠেছিল গ্রেট সালাদিন খ্যাত সুলতান সালাহউদ্দিন ইউসুফের রক্ত-ঘামে। ১১৭৪ সালে গাজী সালাহউদ্দিন
তার বাবা নাজমুদ্দিন আইয়্যূবের নামানুসারে
আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশ ব্যাপি এই সুবিশাল সালতানাতের গোড়াপত্তন করেন। কিন্তু গাজী
সালাহউদ্দিনের গড়া বিশাল এই সালতানাতের ক্ষয় শুরু হয় তার জীবদ্দশাতেই। চূড়ান্ত অবক্ষয় ঘটে তার মৃত্যুর পর। সালাহউদ্দিন তার একক প্রচেষ্টাতেই ক্রুসেডারদের নাগপাশ থেকে দীর্ঘ ৮৮ বছর
পর ১১৮৭ সালে বাইতুল মুকাদ্দাস পূণরুদ্ধার করেন।
প্রতিশোধ হিসেবে ইংল্যান্ড সম্রাট রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট তুমুল যুদ্ধের পর ১১৯২ সালে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর আক্রা অধিকার করে নেন। হাতিন যুদ্ধে সুলতান
সালাহউদ্দিনের বিশাল সংখ্যক সেনা ক্ষয় হয়ে
যাওয়ায় প্রাণপণ চেষ্টা করেও আক্রার পতন তিনি
রোধ করতে পারেননি। এমন দুর্দিনে বারবার আবেদন
করার পরও আব্বাসী খলিফাহ তাঁকে একজন সৈন্য দিয়েও সাহায্য করেননি। আক্রার অসহায় পতনে
সালাহউদ্দিনের মনোবলে অনেকটাই চিড় ধরে যায়।
নিদারুণ সেনা স্বল্পতায় বিজয়ী এই সেনাপতি
রিচার্ডের সামনে বারবার হোঁচট খেতে থাকেন। তাই
বাধ্য হয়ে ১১৯২ সালে তাকে শান্তি চুক্তিতে আসতে হয়। উম্মাহ’র অবিমৃষ্যকারিতায় আক্রা তো আগেই গেছে;
এবার রমলা চুক্তির মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাস ধরে
রাখতে বিসর্জন দিতে হয় পুরো লেভান্ট! উপর্যুপরি এই
পরাজয় আর বিজিত ভূমির এমন সকরুণ হাতছাড়া হতে দেখে তার মতো অজেয় সেনানায়ক সুস্থ থাকেন কী করে? এ কষ্ট বুকে নিয়েই তিনি দু’বছরের মাথায়
ইন্তিকাল করেন। আর হাতছাড়া হওয়া ভূমির
উদ্ধারের ভার রেখে যান পরবর্তী প্রজন্মের উপর। কী
আশ্চর্য! এ ভার বহনে উম্মাহ’র দীর্ঘ ৭১ টি বছর লেগে যায়! ১২৬৩ সালে এসে আক্রা সহ পুরো লেভান্ট মাত্র একটা টর্নেডো অভিযানেই উদ্ধার করেন একজন লৌহমানব। নাম তার রুকনুদ্দিন বাইবার্স!
সালাহউদ্দিন আইয়ূবীর পর আইয়ূবী বংশের অকর্মণ্যতায় ক্ষয় হতে থাকা বিশাল এ
সালতানাত অবশেষে ৭৬ বছরের মাথায় ১২৫০ সালে
এসে বিলীনই হয়ে যায়! আইয়ূবী সালতানাতের
ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে যায় নতূন ইমারাত—মামলুক সালতানাত। তবে হ্যাঁ, আইয়ূবী বংশের সকলেই যে অথর্ব ছিলেন ঢালাওভাবে এটাও কিন্তু বলা যাবে না। উজ্জ্বল ব্যতিক্রম দু’একজন অবশ্যই ছিলেন। সুলতান আস্ সালিহ আইয়ূবী তাদেরই একজন।

আইতাকিন বাইবার্সকে নিয়ে কায়রো পৌছলেন।
সেখানে তখন দ্বিতীয় সালাহউদ্দিন খ্যাত আস্
সালিহ ক্ষমতাসীন।আইতাকিন ছিলেন আস্ সালিহ’র অধিনস্ত আইয়ূবী সালতানাতের নামকরা জেনারেল। কায়রো এসে তিনি দেখলেন, অপরাপর কুমান ক্রীতদাস শিশুদের চেয়ে বাইবার্স অধিক তৎপর ও কর্মঠ। বিশেষ করে অস্ত্র বিদ্যার উপর তার ঝোঁকটা
একটু বেশিই। তাই আইতাকিন শিশু বাইবার্সকে তলোয়ারের সাথে ধনুক ও আড়ধনু চালনার শিক্ষাও দিতে লাগলেন। আড়ধনু হচ্ছে, একধরণের দূরপাল্লার বিশেষ ধরনের। এটি চালনার জন্য চাই প্রচণ্ড শক্তি ও হাতের শক্ত পেশি। যা শিশুকাল থেকে অভ্যাস না করলে, গড়ে ওঠে না। তাই শিশুকাল থেকেই এ ধনুক চালনা শিখতে হয়। শিশু বাইবার্স একাজে এতো
সাফল্য লাভ করলেন যে, আইতাকিন বুঝে নিলেন এই
শিশু একদিন বড় যোদ্ধা হবেই। তাই নিজের শিক্ষায় তৃপ্ত না হয়ে বাইবার্সকে ভর্তি করে দিলেন নিয়মতান্ত্রিক
সেনাবাহিনীতে। ১২৪২ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে
বাইবার্স পুরোদস্তুর সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে আরম্ভ করলেন —রীতিমত আইয়্যূবী সেনাবাহিনীতে!

[আসছে….! শিগগিরই! দ্বিতীয় পর্ব। এতে থাকছে—ফেদাইন উৎপাত! আইয়্যূবী সালতানাতের স্পেশাল
ফোর্সে বাইবার্স। প্রথম কেবলার দ্বিতীয় উদ্ধারকর্তা!]

[লেখক পরিচিতিঃ লেখক নাসারুল্লাহ কায়সার হলেন এযুগের একজন তরুণ মসি বিপ্লবী। তিনি একাধারে ঐতিহাসিক ,সাহিত্যিক,লেখক ও গবেষক। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ইসলামি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি ভাষার ছাত্র। তাঁর লিখিত এই ধারাবাহিক সিরিজ হল টি.আর.টি বাংলার প্রথম ধারাবাহিক ঐতিহাসিক সিরিজ]