আরবী সাহিত্যের অমর লেখক জিব্রান খলীল জিব্রান

• লেখকঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক

“The mountain veiled in mist is not a hill; an oak tree in the rain is not a weeping willow”

—Gibran Khalil Gibran ( Sand and Foam)

আধুনিক আরবী সাহিত্যের দিকপাল লেখকদের মধ‍্যে একজন অন‍্যতম প্রাণবন্ত লেখক হলেন জিবরান খলীল জিবরান। কেবল আরবী সাহিত্যের মনোহর অঙ্গনেই নয়; ইংরেজি সাহিত্যের মনোরম উদ‍্যানেও ছিল তাঁর স্বাধীন বিচরণ। ভালোবাসার এই উপাসকের তুলির টানে সাহিত‍্যের হৃদয়ে জন্ম দিয়েছে এমন ভালোবাসার সংস্কৃতির পরশ পাথর, যা আজও বিশ্ব বাসিকে মুগ্ধ করে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যের পাতার মতো তাঁর জীবনের পাতাগুলি এতটা রঙীন ছিল না। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে শুকিয়ে যাওয়া বকুল গাছটির শুকনো পাতার মাঝে জন্ম নেওয়া একটি কচি পাতার মতো জিব্রানের জন্ম একটি রুগ্ন পরিবেশের একটি মধ‍্যবিত্ত পরিবারে।

১৮৮৩ খৃষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি আরবের রপের নগরী লেবাননের ‘আল ওয়াদী আল মুকাদ্দাসে’র নিকটবর্তী বাশার্রী নামক গ্রামের একটি মধ‍্যবিত্ত বা দরিদ্র খৃষ্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহাপুরুষ। এসময় লেবানন ছিল উসমানীয়া খিলাফতের অধীনস্থ বৃহদসিরীয়ার অন্তর্ভুক্ত। শোনা যায়, লেখকের পূর্বপুরুষরা আরবের জান্নাত সিরিয়ার দামেশ্কের অধিবাসী ছিলেন। তাঁরা সেখান থেকে দেশত‍্যাগ করে চলে আসেন লেবাননের উর্বর ভূমিতে।

তাঁর শৈশব অন‍্য শিশুদের মতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে হয় নি। তাঁর পিতা খলীল সা’দ জিবরান একজন মদপায়ী অসৎ চরিত্রের মানুষ ছিলেন। তিনি বহু সময় শ্রীঘরের প্রোকোষ্ঠের মধ‍্যে কাটিয়েছেন। যদিও তাঁর মাতা কামিলা রহমা ছিলেন সদ্বংশীয়। কামিলার পূর্ব স্বামী হতে তাঁর পিটার নামক এক সন্তান ছিল । জিবরানের পিটার ছাড়া সুলতানা ও মারয়ানা নামে দুই আদরের ভগিনীও ছিল।

শৈশবে তিনি বাশার্রী গ্রামের নিকটেই মাদরাসাতু দের মার ইলীশা নামক এক বিদ‍্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু লেবাননে আর বেশি দিন থাকা হল না! করফাঁকির জেরে তাঁর পিতা যখন জেলের মধ্যে কালাতিপাত করছিলেন তখন তাঁর মাতা সংসার গুটিয়ে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে নিজ ভায়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির। মামার বাড়িতেই লেখক দীর্ঘ দিন অতিবাহিত করেন। এসময় তাঁর মাতা শহর – শহরতলীর অলিতে গলিতে ফেরি করে বেড়াতেন । তাঁর বোন মারয়ানা সেলাইয়ের কাজ কাজ করতেন ও পিটার ছোট খাটো এক ব‍্যবসা শুরু করেন। এভাবেই তাঁদের সংসার চলত। বড় ভাই পিটার তাঁর স্নেহের ছোট ভাইকে একটি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষার জন্য ভর্তি করেন । এসময় জিবরান ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি চিত্রাঙ্কন ও উপন‍্যাস পাঠ করে নিজেকে সুদক্ষ করে তোলেন।

এরপর আরবীতে আরো পারদর্শী হতে তিনি চলে গেলেন লেবাননে তাঁর মাতৃভূমির মাতৃক্রোড়ে। এখানে তিনি মাদরাসাতুল হিকমাতে ভর্তি হন এবং আরবী, ফারসি ও বাইবেল শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এসময় তরুণ প্রেমিক এক লেবাননী তরূণীর প্রেমে পড়েন‌। প্রেয়সীর মধ‍্যেই গড়ে তোলেন তাঁর প্রেমের উপাসনালয়। কিন্তু দারিদ্র্যতা ও সমাজের কৌলিন্য তাঁর পবিত্র প্রেমাপোসনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় তিনি বাশার্রীর কোন এক গহীন বনে চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলেন তাঁর স্বপ্নের রাজকুমারী কে। আর পাওয়া হল না তাকে। এই কষ্টে তাঁর হৃদয় যখন ভেঙে পড়ে তখন সূদূর আমেরিকা থেকে তাঁর বোন সুলতানার অসুস্থতার খবর আসে। তিনি বোস্টনে ফিরতে না ফিরতেই তাঁকে ছেড়ে চলে যায় প্রিয় বোনও। ভাগ‍্যের পরিহাস এতটাই নির্মম যে যখন আসে সর্বস্বান্ত করে দেয়। কয়েকদিন গেল না, ইতিমধ‍্যে লেখককে একা ফেলে রেখে চাঁদের দেশে পাড়ি দেন তাঁর বড়ভাই পিটার ও মাতা কামিলা। লেখকের বোন মারিয়ানা ও উপরওয়ালা ছাড়া লেখকের আপন বলতে কেও ছিল না।

এভাবেই দুঃখ কষ্ট সহ্য করেই লেখকের জীবনের চাকা ঘুরে চলছিল। এসময় ১৯০৪ সালে একটি এক্জিবিশনে লেখকের সাথে পরিচিত হন আমেরিকার এক ধনী মহিলা মেরি হাসকল। জিব্রানের প্রতিভায় মোহাবিষ্ট হয়ে তিনি তাঁকে সুদূর ফ্রান্সের প‍্যারিসে পাঠিয়ে দেন। এখানে রোদিঁ নামক এক ফরাসী চিত্রকারের নিকট থেকে চিত্রশিল্পে পারদর্শী হন। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি কর্মজীবনে অভিষিক্ত হন ও নিউইয়র্কে একটি স্টুডিও খুলে সেখানে তিনি চিত্রশিল্প ও মসীশিল্পে মনোনিবেশ করেন।

উল‍্যেখ‍্য এসময় আমেরিকার নিউইয়র্ক ছিল প্রবাসিদের স্বর্গোদ্যান। ১৯২০ খৃষ্টাব্দে বেশ কতিপয় আরবী সাহিত্যিক মিলে একটি চাঁদের হাট খুলে বসেন। ‘The Pen Association’ নামক এই সাহিত্যসমাজ প্রতিষ্ঠা পেলে জিব্রান এর সভাপতিত্ব লাভ করেন।

১৯২৪ সালের শুরুতে আরবী সাহিত্যের আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করল। লেখকের স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হল। তার কয়েকবছর পর ১৯৩১ সালে তদানীন্তন আরবী সাহিত্যের আকাশ থেকে এই উজ্জ্বল নক্ষত্র টি খসে পড়ে। নিউ ইয়র্কের এক হাসপাতালে নিভে যায় এই মহা মনীষীর জীবন প্রদীপ। তাঁর দেহকে বাশার্রীতে তাঁর মায়ের ক্রোড়েই চিরদিনের মতো শায়িত করা হয়।

লেখক জিব্রান বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত উপন্যাসগুলির মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য হল عرائس المروج (Nymphs of the Valley)। এতে তিনি সমাজের উচ্ছিষ্ট কীটের কারণে রক্তকরবী, গোলাপ গুলো কিভাবে নষ্ট হয়ে যায় তা সুনিপুণ সাহিত্যের মাধ‍্যমে তুলে ধরেছেন, তুলে ধরেছেন পবিত্র শিশু মারতা আল বানিয়ার অপবিত্র পরিণামের কাহিনী। এছাড়া আছে রমাদুল আজিয়ালের সেই রোমিও জুলিয়েটের মতো দুই প্রেমিক প্রেমিকার অমর প্রেমের অমর কাহিনী।

জিব্রানের সবথেকে বিখ্যাত গ্রন্থ হল আন নবী (The Prophet) । এই গ্রন্থ টি চল্লিশোধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়া লেখকের الأرواح المتمردة (Spirits Rebellious) , دمعه وابتسامه (Tears and Laughter) , رمل و زبد (Sand and Foam) , الأجنحة المتكسرة ( The Broken Wings) ইত‍্যাদী। তাঁর লেখা ইংরেজি গ্রন্থগুলোর মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য হল The Madman (المجنون) ও The Forerunner (السابق) ।

উপসংহারে বলতে হবে, এই বিখ্যাত লেখক তাঁর লেখনীর পরশে সমগ্র বিশ্বের হৃদয় জয় করেছেন। তিনি আজও বিশ্ববাসীর হৃদয় মাঝে অমর রয়েছেন।

•সূত্রঃ

১।الشعر و الشعراء في الادب العربي الحديث ,
লেখকঃ প্রফেসর ডক্টর আয়‍্যুব তাজ নাদভী ।

২। আধুনিক আরবী সাহিত্যের ইতিহাস (দিকপাল কবি ও লেখকগণ), লেখকঃ অধ‍্যাপক ডক্টর মেহেদী হাসান ।

৩| Complete Works of Kahlil Gibran , Shrijee’s Book International, New Delhi- 110 049।