ধর্মঃ ভারতের রাম না বেদের রাম? | TRT Bangla
Home Religion & History ধর্মঃ ভারতের রাম না বেদের রাম?

ধর্মঃ ভারতের রাম না বেদের রাম?

0
ধর্মঃ ভারতের রাম না বেদের রাম?

•লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক

সকাল থেকে ঝুম ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। চারিদিকে মেঘের ঘনঘটা। সকালের একঘেয়েমি কাটাতে এক কাপ চা খেতে খেতে খবরের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ‘বাবরী মসজীদের স্থানে তৈরি হতে যাচ্ছে রাম মন্দির’। আসলে রামের জন্মভূমি নামে পরিচিত অযোধ‍্যায় মধ‍্যযুগীয় একটি মসজিদ নিয়ে যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় সেটির নিষ্পত্তি হল।

যাইহোক, এবিষয় নিয়ে তো আমরা অনেক লেখাই পড়েছি। অনেক ইতিহাস জেনেছি! কিন্তু আমরা রামের জন্মভূমি তে পৌঁছে গেলেও রামকেই আমরা চিনলাম না!তো আজ আমরা রামটা কে? এবিষয়ে সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করব।

‘ভগবান’ রাম কে জানার পূর্বে আমরা হিন্দু ধর্ম তথা সনাতন ধর্মে ভগবান বা ঈশ্বর নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা যদি করতে পারি, তাহলে রাম ও তাঁর জন্মভূমির যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করতে আমাদের বেশ সুবিধা হবে।

সনাতন ধর্ম তথা হিন্দু ধর্মে ঈশ্বর নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে আমরা হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ সমূহ নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে জানব। যাতে করে আমরা এবিষয়ে ও সম‍্যক জ্ঞান অর্জন করতে পারি। হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থ গুলির মধ‍্যে সবথেকে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হল বেদ । আর বেদ সমূহের মধ‍্যে সবথেকে পবিত্র হল ঋগ্বেদ। ঐতিহাসিকদের মতে ভারতে আর্যদের আগমনের পর যে যুগটির সূচনা হয় , যে যুগে ঋষিগণ শ্রুতির মাধ‍্যমে বেদ সংরক্ষণ করতেন এই যুগে ঋগ্বেদবেদ রচিত হয়েছিল। তাই এই যুগকে ঋগ্বৈদিক যুগ বলে। আর তার বেশ কয়েক শতাব্দী পর পরবর্তী বৈদিক যুগে চারটি বেদের অপর তিনটি বেদ (সাম, যযুর্বেদ ও অথর্ব) রচিত হয়।

বেদ , বিশেষতঃ ঋগ্বেদ হল অলঙ্কারে পরিপূর্ণ। এজন্যই বেদের Verse তথা মন্ত্রগুলোর প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করা খুবই কঠিন কাজ। আর ঠিক এই কারণেই বেদের অনেক মন্ত্রের সঠিক অর্থ আজও নির্ধারণ করা যায় নি এবং একারণেই হিন্দুদের মধ‍্যে ত্রিত্ব, বহুত্ব ইত‍্যাদি মতবাদ প্রসারিত হয় যার ফলে প্রকৃত ঈশ্বরের বদলে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা আরম্ভ হয়।

এছাড়া অন‍্যান‍্য মূল ধর্ম গ্রন্থ হল পুরাণ ও উপনিষদ সমূহ ও ভগবদগীতা। ভগবদগীতা হল হিন্দু ধর্মের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল চর্চিত ও পঠিত ধর্মগ্রন্থ। আর রয়েছে দুইটি মহাকাব‍্য রামায়ণ ও মহাভারত। রামায়ণ ও মহাভারতকে অধিকাংশ পন্ডিতই কল্পকাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

যাইহোক, হিন্দু সমাজে ভগবান কে? এবং কতজন? এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক রয়েছে। কেও বলেন ঈশ্বর এক কিন্তু তিনি বিভিন্ন রূপে ধরাবক্ষে অবতার রূপে অবতীর্ণ হন। আবার কেও বলেন ব্রহ্ম , বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই তিনে মিলে ঈশ্বর! আবার কেও বলেন সবেতেই ঈশ্বর। তাই তাঁরা ৩৩ কোটি দেবদেবীর পূজা অর্চনা করে থাকেন।

কিন্তু সনাতন ধর্মের বিদগ্ধ পন্ডিত গণ গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে হিন্দু ধর্ম আসলেই এক ঈশ্বরের কথা বলে এবং সনাতন ধর্মে মূর্তি পূজার কোন স্থান নেই। এই মতবাদের প্রবক্তাগণের মধ‍্যে একজন অন‍্যতম প্রবক্তা হলেন বৈদিক সংস্কৃতির বিদগ্ধ পন্ডিত স্বামী দয়ানন্দ স্বরস্বতী।

প্রকৃতপক্ষে হিন্দু ধর্ম একেশ্বরবাদের কথাই বলে। এবিষয়ে আমরা বেদ , গীতা ইত‍্যাদি গ্রন্থে ভুরি ভুরি প্রমাণ পাই। আমরা যদি ঋগ্বেদের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব যে, ঋগ্বেদ বলেঃ

হে মানুষ সকল! তোমাদের নিতান্তই উচিৎ যে, আমাকে ব‍্যতীত উপাসনা করার যোগ্য অন‍্য কাওকে মনে করবে না। কেননা একমাত্র আমি ছাড়া অন‍্য কোন ঈশ্বর নেই।

(মন্ডল ১ ঃ সুক্ত ৭ ঃ মন্ত্র ১০)

আমরা যদি গীতা খুলে দেখি তাহলে গীতার সপ্তম অধ‍্যায়ের সপ্তম শ্লোকে দেখতে পাব যে, পরমেশ্বর মূর্তি পূজা ও বহুত্ববাদ কে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেনঃ

“But those whose minds are distorted by desires resort to other gods , observing various rites , constrained by their own natures….But temporary is the fruit gained by these men of small minds. The worshippers of the God goes to the Gods but my devotees come to me. ( CH. 7 Shloka 20-23)

অতয়েব আমরা জানলাম যে, যে, ব‍্যক্তি পরমেশ্বর ব‍্যতিত অন‍্য কোন দেবতার পূজা কারী পরমেশ্বরের সন্তোষ্টি লাভ করতে পারবে না।
তবে এখন কেও বলতে পারেন, মূর্তি বা কোন কিছুর পূজা ও আরাধনার মাধ‍্যমে আসলেই পরমেশ্বরকেই পূজা করা হয় ! অথবা যেহেতু ঈশ্বর থেকেই সমস্ত কিছুর সৃষ্টি তাই “প্রণমেদ্দন্ডবৎ ভূমাবেশ্চন্ডাল গোখরম” শ্লোগান দিয়ে সবকিছু কে ঈশ্বর হিসেবে পূজা দেওয়াতে কোন ভূল নেই।

কিন্তু যদি তাই হয় তাহলে সবেতেই তিনি বিদ‍্যমান! অতয়েব সবকিছুই পূজনীয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে গীতার ৭:২০-২৩ মন্ত্র অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার কথা। কারন সব কিছুই যেহেতু পরমেশ্বর বিদ‍্যমান তাহলে অন‍্যদেবতা হিসেবে যাদের পূজা করা হয় তাদের মধ‍্যেও তাহলে পরমেশ্বর বিদ‍্যমান। অতয়েব তাদের পূজা করলেও কোন ক্ষতি নেই। কারণ আমরা পরমেশ্বরকেই পূজা করছি! কিন্তু আসলে এই ধারণা হল ভ্রান্ত। পরমেশ্বর কেবল তাঁকেই উপাসনা করতে বলেছেন এবং মূর্তি পূজা বা অন‍্য দেব দেবীর পূজা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

আগেই বলেছি সনাতন ধর্ম অনুযায়ী ঈশ্বর কেবল এক। শুধু তাই নয় সনাতন ধর্ম অনুযায়ী তিনি নিরাকার ও বটে। শ্বেতাশ্বতরোপোনিষদ অনুযায়ী, তাঁর কোন আকৃতি বা অবতার বা মূর্তিও নেই (न तस्य प्रतिमा अस्ति यस्य नाम महधश: / न तस्य कायें करणं च विधते)। এছাড়া ঈশ্বরের আরশে আসীন হওয়ার ব‍্যাপারে ইসলামের সাথে সনাতন ধর্ম অনেকটাই একমত। ইসলাম যেমন বলে ঈশ্বর আরশে সমাসীন । তেমনি সনাতন ধর্ম ও একপ্রকার এর স্বীকৃতি দেয় ও স্পষ্ট ঘোষণা করে যে তিনি সপ্ত লোকের মধ‍্যে সর্বোচ্চ লোকে অধিষ্ঠিত আছেন এবং সেখানে সূর্য, চন্দ্র বা তারা কিছু নেই।

শ্বেতাশ্বতোরোপোনিষদে এবিষয়ে স্পষ্ট বলা হয়েছেঃ

“ন তস‍্য সূর্য ভাতি ন চন্দ্র তারকং।
নেমা বিদ‍্যুতোভান্তি কুতোৎয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্ত মনু ভাতি সবর্বং।
তস‍্য ভাষা সর্বমিদং বিভাতি।।

এপর্যন্ত আমরা সনাতন ধর্মে ঈশ্বর সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা লাভ করলাম যে ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি নিরাকার ও আরশে সমাসিন।

যাইহোক এবার আসি রামের প্রসঙ্গে।

আগেই বলেছি রামায়ণের মহাকাব‍্যের রাম আর বৈদিক রাম এক নয়। মানুষ যে রাম সীতার গল্প শুনে আসছে তা একটি কল্পকথা বৈ অন‍্য কিছু নয়। আমাদের জেনে রাখা উচিৎ যে, রামায়ণের রচয়িতা বাল্মীকির জন্মের আগেই বেদে রামের কথা এসেছে। ডক্টর শিব প্রসাদ সিংহ তাঁর লেখায় জানিয়েছেন যে, বেদে একবার মাত্র যে ‘রাম’ শব্দ এসেছে তা মহান সত্তা তথা পরমেশ্বরকে বলা হয়েছে। এছাড়া আমরা ভগবৎ গীতার দশম অধ‍্যায় খুললে ৩১ নম্বর শ্লোকে স্পষ্ট দেখতে পাব যে,

“O purifiers I am the Wind; of Warriors I am ‘Ram’ , of fishes I am alligator, and of rivers I am Ganges”

এখানেও রাম শব্দটি পরমেশ্বরের ক্ষেত্রে ব‍্যবহৃত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো , রাম যদি পরমেশ্বর হন, তাহলে তিনি ভারতের অযোধ‍্যাতে জন্মালেন কি করে? অথচ বেদ/গীতা স্পষ্ট বলে ঈশ্বরের জন্ম হয় না। শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতার দশম অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকে ঈশ্বর স্পষ্ট নিজেকে জন্মহীন বলে বর্ণনা করেছেন।

এখন কেও বলতে পারেন তিনি ঈশ্বর কিন্তু অবতার হিসেবে এসেছেন। কিন্তু এরকম বলা একটি বড় ভূল। কারন প্রথমতঃ পরমেশ্বর সর্বব‍্যাপী। সুতরাং অবতার হিসেবে বর্ণনা করা তাঁর সত্তাকেই অমান‍্য করা। দ্বিতীয়তঃ আরশে সমাসীন ঈশ্বর কে অবতারের সাথে তুলনা করা ও মানুষের মতো মনে করা বড় বেয়াদবিও বটে। প্রকৃতপক্ষে অবতার হল ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কযুক্ত কেও, যাদেরকে ঋগ্বেদ ‘কীরি’ বা ঈশ্বরের প্রসংশাকারী হিসেবে বর্ণনা করেছে। এদের আমরা ঈশ্বরের দূত বলতে পারি। ঈশ্বর কে অবতার বলা ঠিক নয়।

অতয়েব পরিশেষে আমরা বলতে পারি রাম হলেন পরমেশ্বর এবং ভারতের অযোধ্যাতে রামের কোন অস্তিত্ব নেই এবং ওটা তাঁর জন্মস্থান ও নয়।

 

আপনাদের প্রিয় ওয়েবসাইট TRT Bangla এন্ড্রয়েড এপ্স লঞ্চ করেছে। প্রত্যেকে নিজের মোবাইলে ইন্সটল করতে ছবিতে ক্লিক করুন।
TRT Bangla

FREE
VIEW