ইতিহাসঃ ফরাসী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট | TRT Bangla
Home আন্তর্জাতিক ইতিহাসঃ ফরাসী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট

ইতিহাসঃ ফরাসী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট

0
ইতিহাসঃ ফরাসী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট

• লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে এক বিপুল পরিবর্তন আসে! জ্ঞানবিজ্ঞানের বজ্রমুষ্ঠি ধর্মান্ধতার দুয়ারে খটখটাতে থাকে! অন্ধকারময় ইউরোপীয় সমাজে যুক্তি ও তর্কের মশাল নিয়ে হাজির হন একদল সত‍্যানুসন্ধানী একটি শ্রেণীর। যারা মানুষ কে সামন্ত তন্ত্র, স্বৈরাচারী, ধর্মান্ধদের যাযকশ্রেণীর কবল থেকে রুগ্ন মাতৃভূমিকে মুক্ত করার সংগ্রামে ইউরোপবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেন। এরফলে ইউরোপ এগিয়ে যায় বিপ্লবের দিকে।

ইউরোপের বিপ্লবের মাতৃভূমি হল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের যুদ্ধ বা সপ্তবর্ষব‍্যাপী যুদ্ধের পর ফরাসী বিপ্লব ছিল ইউরোপের যুগান্তকারী ঘটনা। ১৭৫৬ খৃস্টাব্দে শুরু হওয়া সপ্তবর্ষব‍্যাপী যুদ্ধই একপ্রকার ফরাসি বিপ্লবের সূচক। আর্থার ইয়ং এ প্রসঙ্গে বলেন,

“The American Revolution laid foundation of another in France.”

আসলে আমেরিকা বিপ্লবের ফলে ফরাসী বাসীর মনে এই ধারণার জন্ম দেয় যে, ফ্রান্সের ‘বুরবোঁ’ রাজতন্ত্রের দূর্বল ও অত‍্যাচারী রাজপ্রাসাদকেও ধ্বংস করা সম্ভব! আমেরিকার গণতন্ত্রের হাওয়ার স্পর্শ ফরাসিদের হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়, নাড়িয়ে দেয় স্বৈরাচারীদের দূর্গকে। ঠিক যেমন মিশরের আরব বসন্তের সুবাতাস আরবীয়দের হৃদয়কে ছুঁয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ লাফায়েৎ দের মতো ফ্রান্সের বহু সেনা আমেরিকাবাসী কে সহায়তা করেন। আর সেখানেই তাঁরা গণতন্ত্রের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং দেশে ফিরে গণতন্ত্রের চেতনায় ফরাসীবাসিকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। এজন্য কোবান বলেছেনঃ

‘…the price to be paid for American independence was a French Revolution.”

আমরা জানি যে, যেমন ইটের উপর ইট সাজিয়ে যেমন সুদঢ় প্রাসাদ তৈরী হয় তেমনি বিভিন্ন ঘটনার পর একটি বিপ্লবের সূচনা হয় ‌। বিপ্লব এক দিনে আসে না। ফরাসী বিপ্লব ও বহু ঘটনার ফলশ্রুতিতে এসেছিল। ঐতিহাসিক লেফেভর তাঁর দ‍্য ফ্রেন্চ রিভোলুশন গ্রন্থে লিখেছেন,

“The origin of the Revolution of 1789 lies deep in French History”.

ঐতিহাসিক আলফ্রেড কোবান বলেছেন,

“It was rather the result of the confluence of a host of contributory currents, small and great , flowing together to swell suddenly into a mighty flood. ”

(A history of Modern France)

যাইহোক, ফরাসী বিপ্লবের পেছনে থাকা কারণগুলোর কিছু আমরা আলোচনা করব।

ফরাসী বিপ্লবের পেছনে তদানীন্তন ফরাসী বুরবোঁ রাজবংশ অনেকটাই দায়ী ছিল। এবিষয়ে মাঁদেলা বলেছেন,

It was the French monarchy who made the Revolution”

ফরাসী রাজা চতুর্দশ লুই একজন সুদক্ষ শাসক ছিলেন। তাঁর আমলে কার্ডিনাল রিশলু ও ম‍্যাজরীন ফ্রান্স কে সুদৃঢ় করে তোলেন। কিন্তু তাঁর পরবর্তী শাসক পঞ্চদশ লুই ছিলেন বিপরীত। “Butterfly Monarch” নামে পরিচিত এই শাসক ছিলেন দূর্বল ও অকর্মণ্য। তাঁর আমলে প‍্যারিসে অরাজকতা ও বিশৃংখলায় পূর্ণ হয়। আর তাঁর পরবর্তী শাসক ষোড়শ লুই ছিলেন আরো দূর্বল। তাঁর আমলে ফরাসি রাজতন্ত্র ও ফ্রান্স একেবারে দূর্বল হয়ে পড়ে‌। এই ব‍্যক্তি ছিলেন আমোদপ্রিয় ও অদক্ষ। বিলাস ব‍্যাসনে তাঁর জুড়ি পাওয়া ছিল ভার। কেবল রাজপরিবারের দছখাশুনার জন‍্য প্রায় ১৮০০০ কর্মচারী সদাব‍্যস্ত থাকতেন। কেবল তাঁর রানী মেরি আঁতোয়ানেতকে ৫০০ জন সেবায় নিয়োজিত থাকতেন। অপরদিকে প্রমোদ ভ্রমণের জন্য থাকত ২ হাজার ঘোড়া ও ২০০ টি শকট! এছাড়া তাঁর রাজনৈতিক দূর্বলতা ও ছিল প্রবল। পঞ্চদশ লুই বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে বেকার অর্থ অপচয় করেন। অপরদিকে ষোড়শ লুই আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করলে অর্থনৈতিক অবস্থা আরো দূর্বল হয়ে পড়ে।

ফ্রান্সের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা অনেকটা বড় ভূমিকা পালন করেছে এই বিপ্লব তরান্বিত করতে। এসময় ফ্রান্সে সামন্ত তন্ত্রের প্রবলতা দেখা দেয়। ফ্রান্সের সমাজ তিনটি প্রধান ভাগে বা Estate এ বিভক্ত হয়ে পড়ে । প্রথম এস্টেটে ছিল সুবিধাবাদী যাযক সম্প্রদায়। ১৭২০ সালে তারা ছিল প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার যা ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ ও নয়। কিন্তু এত কম সংখ্যক হয়েও ভারতের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মতো সকল সুবিধা ভোগ করত। তারা ছিল সকল আইনের উর্ধ্বে। তারা বিচার ব‍্যবস্থা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ভোগ করত । শিক্ষা ব‍্যাবস্থা ছিল তাদের অধীনে। এমনকি ফ্রান্সের কৃষি জমির দশ ভাগের একভাগ ছিল গীর্জার। কিন্তু এত অর্থের মালিক হবার সত্বেও তারা কেবল Contact of Poissey নামক স্বল্প কর ছাড়া কোন কর দিত না উপরন্তু টাইদ , মৃত্যু কর, বিবাহকর দিত। এরা নানান অনাচারে লিপ্ত ছিল। এদের অবস্থা দেখে একবার ষোড়শ লুই বলেছিলেন ঃ

“Let us at least have a Archbishop who believes in God!”

তবে সকল সমাজে যেমন ভালো ও প্রকৃত ধর্ম যাজক থাকেন তেমনি ফ্রান্সেও এক শ্রেণীর সৎ ধর্ম যাজক ছিলেন। এঁরা হলেন গ্রামীন নিম্ন শ্রেণীর যাজক। দারিদ্র্যতা ছিল এঁদের নিত‍্য সঙ্গী। এঁরা পরবর্তীকালে তৃতীয় শ্রেণীর নিপিড়িতদের পাশে দাঁড়ান। উচ্চ যাজকদের প্রতি নিম্ন যাজকদের এই বিরোধ ফরাসি বিপ্লবকে অনেকটাই সাফল্যমন্ডিত করে। এবিষয়ে অধ‍্যাপক স‍্যালভামিনি বলেনঃ

“This dissension between the higher and lower clergy was one of the potent causes leading to the early victory of the revolution.”

ধর্ম যাজকদের এই শোচনীয় অবস্থা জনগণের মন থেকে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তিকে মুছে দিয়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয় এবং তারা এদের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে শুরু করে।
ফরাসী সমাজের দ্বিতীয় শ্রেণী বা এস্টেটে ছিল অভিজাতরা। দেশের প্রশাসন কাঠামো ও চাকরি বাকরি সব কিছু তাদের অধীনে ছিল। এঁরা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র দেড় ভাগ। তৃতীয় তথা Third Estate এর নিম্ন জাতির প্রতি ছিল এদের তীব্র ঘৃণা। এদের মধ‍্যেও প্রথম শ্রেণীর মতো দুইটি ভাগ ছিল। যথাঃ

ক) Nobility of the Sword (অসিধারী অভিজাত)

খ) Nobility of the Robe (পোশাকী অভিজাত)

প্রথম শ্রেণীর অভিজাত রা ছিল বংশগত অভিজাত। বংশের বড়াই ও দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিজাতদের প্রতি ঘৃণায় তাদের মন ও হৃদয় পূর্ণ ছিল। রাজার সভাসদ , ইন্টেন্ডেন্ট এবং সামরিক সকল সুযোগসুবিধা এরা ভোগ করত। অপরপক্ষে পোশাকী অভিযাতরা হল জন্মগতভাবে বুর্জোয়া শ্রেণীর কিন্তু তদানীন্তন রাজারা তাদের কাছে কিছু পদ বিক্রি করে অভিজাত হিসেবে বরণ করে নেন। এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অভিজাত হবার সত্বেও অভিজাতরা এদের মর্যাদা দিত না এবং এদের মধ্যে সর্বদা বিবাদ লেগে থাকত।

আর বাকি দেশের জনগণ ছিল তৃতীয় এস্টেটের এদের মধ্যে ছিল লেখক, দার্শনিক, ব‍্যবসায়ী, কৃষক সবাই। এঁরা ছিলেন অবজ্ঞা ও অত‍্যাচারের শিকার। এদের মধ‍্যে সব থেকে উল‍্যেখযোগ‍্য ছিলেন বুর্জোয়া শ্রেণী বা মধ‍্যবিত্তরা।

উল‍্যেখ‍্য প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট জনগণের মাত্র পাঁচ শতাংশ হয়েও দেশের ৯৫% সম্পদের মালিক ছিলেন কিন্তু করের ক্ষেত্রে তাঁরা কিছুই দিতেন না অপরপক্ষে দেশের ৯৫ শতাংশ দেশের জনগণ মাত্র ৫ শতাংশ সম্পদের মালিক হলেও ৯৫ শতাংশ সম্পদের কর বহন করত। এদের মধ্যে কৃষকরা ছিল সর্বাধিক নিপীড়িত। এদের উপর থেকে গীর্জা ও প্রশাসন একাধারে টাইদ , কার্ভি, ভিটিংয়েম, গ‍্যাবোলা, ক‍্যাপিটেশন , টেইলি, এইডস কর আদায় করত। এরা ছিল করভারে জর্জরিত। এছাড়া তাদের উপর চলত নানান অত‍্যাচার। এই অর্থনৈতিক বৈষম‍্যের জন‍্য ফ্রান্সকে অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ ‘Meuseum of Economic Errors’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

যাইহোক , এইভাবে যখন ফ্রান্স নানান সমস্যায় জর্জরিত ছিল তখন অত‍্যাচারিতরা নতুন বিপ্লবের অপেক্ষায় ছিল। এই সময় ফরাসি শিক্ষাজীবী বিশেষতঃ দার্শনিক রা মানুষের মধ‍্যে বিপ্লবের বীজ বপন করতে থাকেন। রুশো, ভলতেয়ার, মন্তেস্কুদের মতো পন্ডিতরা অরাজকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
এসময় ফ্রান্সে চরম অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। তুর্গো ও নেকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কোন কাজে আসল না। পরে ক‍্যালোন নামক এক ব‍্যক্তিকে অর্থমন্ত্রী করা হলে এই অর্থনীতি সামাল দিতে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের উপর কর আরোপ করেন। ফলে সুবিধাবাদী অভিজাতরা বিদ্রোহী হয়। পরে ক‍্যালোন তা সামাল দিতে অভিজাতদের নিয়ে কাউন্সিল অব নোটেবলস ডাকেন।

কিন্তু পরবর্তী অর্থমন্ত্রী ব্রিয়াঁ এই কাউন্সিল ভেঙে দিয়ে পার্লামঁ অফ প‍্যারিসে কর প্রস্তাব পেশ করলে অভিজাতরা আবার বিদ্রোহী হয় ও ব্রিয়াঁকে খুনের হুমকি দেয়। এতে লুই রেগে গিয়ে Lit De Justice অধিবেশন ডেকে বিলগুলো পাস করান। ফলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় ও পার্লামেন্ট রাজায় দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পরে রাজা লুই পার্লামেন্ট মুলতবি করে ৫৭ টি আদলত নির্মানের প্রস্তাব দিয়ে সংস্কার গুলো কে আইনে পরিণত করলে সমগ্র অভিযাতরা বিদ্রোহী হয় ও নানান স্থানে দাঙ্গা শুরু হয়। পরে যাজকরাও এতে যোগ দেয় , যোগ দেয় বুর্জোয়া রাও। অবশেষে লুই ১৭৮৯ সালের পয়লা মে তে স্টেটস জেনারেল এর আহ্বান করে।

স্টেটস জেনারেল এর অধিবেশনে ছিল প্রত‍্যক্ষ বিপ্লবের শুরু। ১৭৮৯ সালের ১৭ জুন তৃতীয় শ্রেণী বা Third Estate এর প্রতিনিধিরা তৃতীয় শ্রেণীকে সমগ্র ফরাসী জাতির প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে ও তাদের সভাকে জাতীয় সভা বলে দাবি করে ।এর তিন দিন পর তৃতীয় শ্রেণীর সদস্য রা তাদের সভাকক্ষে প্রবেশে বাঁধা পেলে মিরবো ও অ‍্যাবে সিয়েসের নেতৃত্বে একটি টেনিস কোর্টে Tenis Court Oath এর শপথ নেন। ২২ জুনে রাজা ষোড়শ লুই জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী নেকার কে পদচ‍্যুত করলে শুরু হয় প্রবল গণ অভ্যুত্থান। জনগন রাস্তায় নেমে আসে। লুঠ হয় গির্জা, বন্দুকের দোকান ও কর্মশালা। এভাবেই শুরু হয় ইউরোপের যুগান্তকারী বিপ্লব ফরাসী বিপ্লব। ১৪ জুলাই জনগণ বাস্তিল দূর্গ দখল করলে ভীত রাজা বলে ওঠেন “That is a revolt”. এর প্রত‍্যোত্তরে তার জনৈক সঙ্গী বলে ওঠে “Sire! It is not a revolt , it is a revolution”!

ফ্রান্সের এই বিপ্লব পরবর্তী তে একনায়ক স্বৈরাচারীদের প্রাসাদ কে ধ্বংস করে ফেলে ও ধীরে ধীরে এই বিপ্লব ইউরোপীয় বিপ্লবের রূপ পরিগ্রহ করে এবং শুরু হয় নতুন যুগের। সাম্প্রতিক আরবেও শুরু হয়েছে বিপ্লব। নির্যাতিত আরব বাসীও অপেক্ষায় রয়েছে সেই সুদিনের, যেদিন তারা স্বাধীন ভাবে উন্নতি ও শান্তির চাদরে আরবকে মুড়ে ফেলবেন।

 

আপনাদের প্রিয় ওয়েবসাইট TRT Bangla এন্ড্রয়েড এপ্স লঞ্চ করেছে। প্রত্যেকে নিজের মোবাইলে ইন্সটল করতে ছবিতে ক্লিক করুন।
TRT Bangla

FREE
VIEW