Breaking News

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর প্রাথমিক জীবন ও ওহাবী বিপ্লবের সূচনা

মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক|


হিজাজে তথা ওয়াহহাবী বিপ্লবের যিনি মূল নায়ক ছিলেন, তিনি হলেন শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী। তাঁর লেখা বই كتاب التوحيد হল একটি বহুল চর্চিত ও পঠিত একটি বই যাতে তিনি তাওহীদ ও আকীদাগত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন। শায়েখ আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী ও ওহাবী মতবাদের বিষয়ে আমরা অনেকেই পরিচিত হলেও , শাইখ আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর জীবনী ও তাঁর ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে আমরা অনেকেই এখনো অবগত নই। বর্তমান লেখকদের পুস্তক থেকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু ধারণা আমরা পেয়েছি , ততটুকু যথেষ্ট নয়।‌ আজকে আমরা সমকালীন ও পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও আলেম ওলামাদের গ্রন্থ থেকে শায়েখ আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বর্তমান সৌদি আরব ও তদানীন্তন আল হিজাজের নজদের ইয়ামামার আল উয়াইনাতে ১৭০৩ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী। তাঁর পুরো নাম হল মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব বিন সুলাইমান বিন আলী বিন আহমাদ বিন র-শিদ বিন বুরাইদ বিন মুহাম্মাদ বিন বুরাইদ বিন মুশরিফ ।

তামীম যাঁর নামে আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর গোত্র বনু তামীমের নামকরণ করা হয়েছে, তিনি তুরস্কের বুরসা থেকে এসেছেন।

তাঁর পিতা আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী (রহঃ) ও দাদা সুলাইমান ছিলেন সেযুগের কাজী। তাঁর ভাইয়ের নামও ছিল সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব । সুলাইমান ও তাঁর পিতা উভয়েই ছিলেন সৎ আলিম। উল্লেখ্যঃ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব ছিলেন বনূ তামীমের গোত্রের মানুষ। এখানে একটি কথা বলে রাখা অতীব জরুরি। সেযুগের বিখ্যাত আরবী কবি হুমাইদান আল শুয়াইয়ির তাঁর একটি কাব্যে লিখেছেন যে, তামীম যাঁর নামে আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর গোত্র বনু তামীমের নামকরণ করা হয়েছে, তিনি তুরস্কের বুরসা থেকে এসেছেন। হুমাইদান বলেনঃ

وأظنه محمد
يعني محمد الوهابية
يقول أصله من تميم
تميم (برصه) التركية

( تاريخ آل سعود، ناصر سعيد، صـ ٢٦)

ছোটবেলা থেকেই মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী দ্বীনি পরিবেশে মানুষ ও অধ‍্যাবসায়ী। তাঁর পিতার কাছেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন ও ছোটবেলাতেই পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করে ফেলেন। তিনি এসময় পবিত্র কুরআন ও হাদীসের শিক্ষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

এরপর হজ্বের লক্ষ্যে তিনি পবিত্র মক্কা আল মুকার্রামা গমন করেন। সেখান থেকে মদীনাতুল মুনাওওয়ারাহ হয়ে তিনি ফিরে আসেন আল উয়াইনাতে তাঁর বাড়িতে। অতঃপর তিনি জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করেন।

কিছুকাল পরে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো তিনি মক্কা শরীফে গমন করেন। এরপর মদীনা শরীফে গমন করেন। মদীনাতে এসে তিনি নজদী শাইখ আব্দুল্লাহ বিন ইব্রাহীম বিন সাইফ এঁর নিকট হাম্বলী ফিকহ পাঠে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এছাড়া তিনি শাইখ হায়াত সিন্দী (রহঃ) এঁর নিকট থেকে পাঠ গ্রহণ করেন।

কিন্তু এসময় থেকেই মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর মধ‍্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। তিনি এসময় থেকেই ইসলাম নিয়ে নিজের মতো ফতোয়া জারি করতে শুরু করেন। তাঁর এধরনের আচরন তাঁর পিতা আব্দুল ওয়াহহাব ও তাঁর ভাই শাইখ সুলাইমানের সহ তাঁর শায়েখদের পছন্দ হয়নি। তাঁরা মুহাম্মাদের মধ‍্যে অশনী সংকেত দেখতে পান। তাঁরা একপ্রকার ভবিষ্যতবাণী করে দেন যে, এই ছেলে ভবিষ্যতে পথভ্রষ্টতার দিকে এগিয়ে যাবে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পবিত্র মক্কা শরীফের শাফেয়ী মাজহাবের গ্রান্ড মুফতি ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক শাইখুল ইসলাম আহমাদ যাইনী দাহলান তাঁর ‘ফিতনাতুল ওয়াহহাবিয়া গ্রন্থে এবিষয়ে লিখেছেনঃ

“وكان أبوه و اخوه و مشايخه يتفرسون فيه أنه سيكون منه زيغ و ضلال…”

(كناب فتنة الوهابية ، شيخ الإسلام احمد زيني دحلان الشافعي المكي رحـ، صـ ٤)

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর পথভ্রষ্টতার বিষয়ে সতর্ককারী যেসকল আলেম ওলামা ছিলেন তাঁদের মধ‍্যে তাঁর শায়েখ হায়াত সিন্দী ও মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আল কুর্দী ছিলেন অন‍্যতম। এবিষয়ে বিখ্যাত আলেম ও আরবী সাহিত্যের অন্যতম নক্ষত্র জামীল স্বিদক্বী আয যাহাউই তাঁর আল ফজরুস স্বদিক্ব গ্রন্থে লিখেছেনঃ

“وممن أخذ عنه في المدينة الشيخ محمد بن سليمان الكردي و الشيخ محمد حياة السندي، و كان الشيخان المذكوران و غيرهما من المشايخ الذين أخذ عنهم يتفرسون فيه الغواية و الإلحاد”

( الفجر الصادق في الرد على الفرقة الوهابية المارقة ، الشيخ جميل صدقي الزهاوي رح، صـ ١١)

অতঃপর আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী মুসলিমদের তাকফীর করতে শুরু করলেন, সেইসাথে শরয়ী কিছু বিধান কে নিজের মতো করে বিদাত ও শিরক বলে ফতোয়া দেন। এরমধ্যে রয়েছে কবর জিয়ারত, তাওয়াস্সুল প্রভৃতি।

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর পথভ্রষ্টতার বিষয়ে সতর্ককারী যেসকল আলেম ওলামা ছিলেন তাঁদের মধ‍্যে তাঁর শায়েখ হায়াত সিন্দী ও মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আল কুর্দী ছিলেন অন‍্যতম।

অতঃপর তিনি উয়াইনাতে ফিরে আসেন। এবং সেখানে তিনি একবছর অতিবাহিত করেন। এরপর তিনি ইরাকের বস্বরাতে গমন করেন ও সেখানে ফিকহ সহ বিভিন্ন জ্ঞান অর্জন করেন।

এবিষয়টা আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, মূলতঃ ইরাক থেকেই তিনি ওহাবী আন্দোলনের সূচনা করেন। এবিষয়ে সমকালীন আলেম শাইখ আব্দুল ওয়াহহাব বিন তুরকী (মৃঃ ১৮৪১ খৃঃ) এঁর লেখা ফিতনাতুল ওয়াহহাবিয়াহ ওয়া আহওয়ালু নাজদ গ্রন্থের সমাপনীতে টিকাতে বলা হয়েছেঃ

“محمد بن عبد الوهاب، اول ما أظهر دعوته السلفية في مدينة البصرة في العراق”
(فتنة الوهابية و احوال نجد، الشيخ عبد الوهاب بن تركي ، صـ ٨٠)

নাজদী সাহেব এসময় ভয়ংকর কাজকর্মে লিপ্ত ছিলেন। তিনি অমুসলিমদের সম্পর্কিত আয়াত মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে তাকফীর করতে শুরু করলেন। একারণে স্বভাবতই ইরাকের আলেম ওলামারা এই ব‍্যক্তির ভ্রষ্টতার বিরোধিতা করতে শুরু করেন। শায়েখ তুরকির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসময় ইরাকের বড়বড় আলেম যেমন, শাইখ আল মুহাদ্দিস ইসমা’য়ীল আস স্বান’য়ানী, হাফিজ্ব মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল আফালিক্ব, শাইখ আল কুব্বানী আল বাস্বরী সহ অন‍্যান‍্যরা তাঁর বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন।

এবিষয়টা আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, মূলতঃ ইরাক থেকেই তিনি ওহাবী আন্দোলনের সূচনা করেন।

অবশেষে বস্বরার ওয়ালী (গভর্নর) উসমান বিন মু’য়াম্মার যখন দেখলেন যে নাজদী সাহেব শহরে ফাসাদাত সৃষ্টি করছেন ও তওহীদের নামে ভন্ডামি শুরু করেছেন তখন তিনি বস্বরা থেকে নাজদীকে তাড়িয়ে দেন। শোনা যায় ইরাকে অবস্থান করার সময় তিনি জনৈক ব্রিটিশ চরের সংস্পর্শে আসেন। যা আমরা Confessions of a British Spy গ্রন্থ থেকে বিস্তারিত জানতে পারি।

অতঃপর তিনি আজ জুবায়ের ও আল আহসা হয়ে দিরি’ইয়‍্যাতে আসেন। এখানে ফিরে তিনি তদানীন্তন দিরি’ইয়‍্যার মোড়ল মুহাম্মাদ ইবনে সাউদের সাথে মিলে ব‍্যাপক ফিতনা ও ফাসাদাত শুরু করেন । এমনকি মুসলিমদের , উসমানীয় শাসকদের মনগড়া তাকফীরী করে ব্যপক হত‍্যাকান্ড শুরু করতে থাকেন। এবিষয়ে আমার লেখা পূর্বের প্রবন্ধে কিছুটা পাবেন এছাড়া ভবিষ্যতে লেখা প্রবন্ধ সমূহেও পাবেন ইন শা’আল্লাহ। এসময় অন‍্যান‍্য আলেম ওলামাদের মতো নাজদীর ভাই সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী রহঃ ওহাবী মতবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। তিনি ওহাবীদের মতবাদ খন্ডন করে লিখে ফেললেন “الصواعق الالهية في الرد على الوهابية” ।

এটাই ছিল ওহাবী মতবাদ প্রসারের প্রথম পর্ব। অনেক আলেম এটিকে খাওয়ারিজ মতবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

______________________
তথ্যসূত্রঃ

১/ كتاب فتنة الوهابية للامام الشيخ احمد زيني دحلان الشافعي المكي رحمه الله

২/ كتاب الفجر الصادق في الرد على الفرقة الوهابية المارقة للامام الشيخ جميل صدقي الزهاوي رحمه الله

৩/فتنة الوهابية و احوال نجد للشيخ عبد الوهاب بن تركي رحمه الله

৪/ خروج الوهابية على الخلافة العثمانية لياسين بن علي

৫/تاريخ آل سعود لناصر سعيد

৬/ Confessions of a British Spy by Hempher

•লেখক পরিচিতিঃ লেখক মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক হলেন টি আর টি বাংলার একজন সাংবাদিক।


©টি আর টি বাংলা ডেস্ক

Check Also

তুরস্কে নতুন সন্ত্রাস দমন অভিযান শুরু

ইস্তাম্বূল নতুন করে সন্ত্রাস দমন অভিযান শুরু করেছে তুরস্ক। উত্তর ও দক্ষিণ তুরস্ক জুড়ে এই …

One comment

  1. Md Shakil Ahmed

    মুহাম্মদ ইবন আব্দ আল-ওয়াহাব ছিলেন একজন মুসলিম পন্ডিত। তিনি সেসময়ে আরবে প্রচলিত কবর পুজা, কবরে সিজদাহ করা ও বিভিন্ন প্রকারের কুসংস্কার, শিরক, বিদ‘আতের প্রতিবাদ করেছেন। তার বিরোধীরা তার আন্দোলনকে ওয়াহাবী আন্দোলন নামে নামকরণ করেছে। বিশেষত সেসময়ের তুর্কী খলীফা এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালান। প্রাক্তন সৌদি বাদশাহ মুহাম্মদ বিন সৌদের সাথে মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবএর চুক্তি বর্তমান সৌদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য সহায়ক হয়েছিল। তার উত্তরসূরী আল আশ শাঈখ ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব রাষ্ট্রের ওলামাদেরকে পরিচালনা করেছেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.