Friday , February 26 2021
Breaking News

তুর্কি সিটি হাসপাতালগুলো ইউরোপ তথা বিশ্বের এক নম্বর রয়েছেঃ এরদোগান!

স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রাচীন কাল থেকেই প্রসিদ্ধ তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চল। থার্মাল স্পা, ঐতিহাসিক হাসপাতাল ও তুর্কি স্নানঘর দেশটির স্বাস্থ্যসেবার চিরাচরিত দিকগুলোর নিদর্শন। ২০০৩ সালে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া ‘হেলথ ট্রান্সফরমেশন প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে সারা দেশে স্বাস্থ্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। উন্নতমানের এবং সহজলভ্য পরিষেবার জন্য অনেক নীতিমালা প্রয়োগ করা হয়েছে।

তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ১৮ বছরে তুরস্কে ৬৭৮টি হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩৮টি হাসপাতাল পেয়েছেন তুরস্কবাসী। চলতি বছরে আরও ৫৪টি হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

সিটি হাসপাতাল নির্মাণ প্রসঙ্গে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, ‘আমাদের দেশ গত ৮ মাসে ১৮ বছরের স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের সুফল ভোগ করছে। মহামারির মধ্যে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে যে স্বাস্থ্য সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে, আমরা সেখানে স্বাস্থ্যখাতে উন্নত ব্যবস্থা নিয়ে এসেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো নাগরিককে হাসপাতালের দরজা থেকে ফিরিয়ে দেই না।’

স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে মৌলিক প্রয়োজনীয় বস্তু যেমন মাস্ক, ওষুধ এবং খাবারের কোনো বিষয়েই কোনো অভাব নেই বলেও এক বক্তব্যে উল্লেখ করেন এরদোয়ান।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বলছি যে, আমাদের সিটি হাসপাতালগুলো ইউরোপ তথা বিশ্বের এক নম্বর স্থানে রয়েছে। আল্লাহর শুকরিয়া যে, আমরা এই পর্যায়ে পৌঁছেছি।’

উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে অনলাইন আবেদন করলে তুরস্কের সরকার ডাকযোগে মাস্ক জনগণের বাসায় পাঠিয়ে দিত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষও বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাস্ক বিতরণ করেছে।

এছাড়া, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিত।

৪৫ দিনে দুই হাসপাতাল
মহামারির মধ্যে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নির্দেশে সাবেক আতার্তুক বিমানবন্দর এবং ইস্তাম্বুলের সানজাকটেপে অধ্যাপক দুটি জরুরি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয় ৪৫ দিনে।

ইউরোপের বৃহত্তম এবং বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম
২০১৯ সালের ১৪ মার্চ আঙ্কারা বিলকেন্ট সিটি হাসপাতালের উদ্বোধন করেন এরদোয়ান। ১৩ লাখ ১২ হাজার বর্গ মিটার আয়তনের বদ্ধ অঞ্চলসহ ৮টি পৃথক হাসপাতাল নিয়ে এটি গঠিত। জেনারেল হাসপাতাল ছাড়াও সেখানে রয়েছে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিস হাসপাতাল, নিউরোলজিকাল সায়েন্সেস এবং অস্থি চিকিৎসা হাসপাতাল, শিশু বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল, অনকোলজি হাসপাতাল, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি হাসপাতাল, শারীরিক থেরাপি এবং পুনর্বাসন হাসপাতাল এবং উচ্চ সুরক্ষা ফরেনসিক সাইকিয়াট্রি বিভাগ।

হাসপাতালটিতে মোট ৩ হাজার ৭১১ শয্যা এবং ৬৭৪টি আইসিইউ বেড রয়েছে। হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার এবং জরুরি বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব।

ইস্তাম্বুলের বাশাখশেহির চাম এবং সাকুরা সিটি হাসপাতাল, তুরস্ক ও জাপানের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত। ৭ লাখ ৮৯ হাজার বর্গমিটার জমিতে নির্মিত। ১০টি ব্লক নিয়ে গঠিত এই হাসপাতালের মোট শয্যা ২ হাজার ৬৮২টি, আইসিইউ আছে ৪৫৬টি। হাসপাতালটিতে প্রাপ্তবয়স্ক, শিশু, ট্রমা এবং স্ত্রীরোগ সহ চারটি আলদা জরুরি পরিষেবা রয়েছে।

হাসপাতালটির বহির্বিভাগে দৈনিক ৩৫ হাজার রোগীর ধারণক্ষমতা, ৭২৫ পলিক্লিনিক রুম এবং ৯০ টি অপারেটিং থিয়েটার রয়েছে।

স্বাস্থ্য বীমা
সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য বীমা থাকলে নাগরিকরা সরকারি হাসপাতাল থেকে ফি ছাড়াই চিকি়ৎসা পান। আর পরিপূরক স্বাস্থ্য বীমা থাকলে বেসরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসা নেয়া সম্ভব।

অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পরিষেবা
জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে যেমন – সড়ক দুর্ঘটনা, হার্ট অ্যাটাক, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, গুরুতর আঘাত, অচেতন হয়ে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, বৈদ্যুতিক শক, জলে ডুবে যাওয়া, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, উচ্চ
রক্তচাপ, রক্তক্ষরণ এবং শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে শহরে ১০ মিনিটের মধ্যে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ৩০ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়।

মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স
২০০৯ সালে তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক দুই চাকার (বিশেষভাবে সাজানো মোটরসাইকেল) অ্যাম্বুলেন্স চালু করে। যেসব এলাকায় সহজে বড় অ্যাম্বুলেন্সগুলি পৌঁছাতে পারে না, ভারী যানজট, বৃষ্টি ও কাদামাটির মধ্যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এগুলো রোগীর কাছে পৌঁছায় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। তুরস্কে ৬২ টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এগুলো সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করে।

তুরস্ক ২০০৮ সাল থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা শুরু করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থায় ৩টি বিমান এবং ১৭ টি হেলিকপ্টার রয়েছে। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত হেলিকপ্টার অ্যাম্বুলেন্সে ২ হাজার ৪৬২ জন এবং বিমান অ্যাম্বুলেন্সে ৮৪২ জন রোগী পরিবহন করা হয়েছে।

সিএনএন তুর্কের তথ্য অনুযায়ী, পরিষেবার ১২ বছরে হেলিকপ্টার অ্যাম্বুলেন্স ৩২ হাজার ৫০৭ জন রোগী এবং বিমান অ্যাম্বুলেন্স ১৩ হাজার ৯৪১ জন রোগী পরিবহন করছে।

এ পর্যন্ত এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ৭১৫ জন রোগীকে অন্য দেশ থেকে তুরস্কে আনা হয়েছে। হেলিকপ্টার অ্যাম্বুলেন্সগুলি সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে রোগী পরিবহনের কাজ করে। আর বিমান অ্যাম্বুলেন্সগুলো ২৪ ঘণ্টাই সেবা দিয়ে থাকে।

মহামারি মোকাবিলা
চলমান করোনাভাইরাস মহামারিতে দেশটিতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তুর্কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, শুধু ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত স্থল অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ৫৯ লাখ ৪১ হাজার ৯৪০ জন, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ৩ হাজার ৩০৪ জন এবং নৌ অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ২ হাজার ৮৩৯ জন রোগীকে পরিবহন করা হয়। গত বছর প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার রোগীকে পরিবহন করেছে অ্যাম্বুলেন্সগুলো।

হেলথ ট্যুরিজম
গত ১৮ বছর স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রযুক্তিগত বিকাশের সঙ্গে দ্রুত অভিযোজন এবং নামকরা সব চিকিৎসকের কারণে তুরস্ক চিকিৎসা সেবার জন্য বিশ্বের অন্যতম পছন্দের দেশ হয়ে উঠেছে।
তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২০ সালে তাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৬ জন বিদেশি রোগী। এ সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য পর্যটন থেকে আয় হয়েছে ১৮ কোটি ৭৯ লাখ ৫৫ হাজার ডলার।

বিনামূল্যে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি থেকে চীনের সিনোভ্যাক ভ্যাকসিনটি বিনামূল্যে প্রয়োগ শুরু করে তুরস্ক। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। পরে ঝুঁকি বিবেচনায় টিকা দেয়া হচ্ছে।
১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তুরস্কে ৪৪ লাখ জনের বেশি করোনার ভ্যাকসিন দিয়েছে। দ্বিতীয় ডোজও নিয়েছেন ৭ লাখের বেশি মানুষ। ক্রমান্বয়ে সবাইকে বিনামূল্যে এই ভ্যাকসিন দেয়া হবে।

বর্তমানে তুরস্কে অভিজ্ঞ, দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের কোনো অভাব নেই। নাগরিক ও পর্যটকদের জন্য আধুনিক হাসপাতাল এবং উন্নত চিকিৎসা দিচ্ছে দেশটি। স্বাস্থ্যসেবায় এই দ্রুত অগ্রগতি বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

360Locker

Check Also

জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি দিলে করোনার টিকা দিবে ইসরাইল!

যেসব দেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে তাদের জন্য করোনাভাইরাসের টিকা পাঠাচ্ছে দেশটি। সেই সাথে এ টিকা …

Leave a Reply

You cannot copy content from this site.