প্রথম সৌদি সাম্রাজ্যের পতন

পবিত্র হিজাজ শরীফে আজ হতে প্রায় দুই শতাব্দী পূর্বে ওহাবী বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। ওহাবী বিপ্লবের নামকরণ করা হয় মুহাম্মাদ ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব নজদী নামক নজদের জনৈক ধর্মগুরুর নামানুসারে। মূলতঃ ইবনে আব্দিল ওহাবের নব্য মতবাদের  মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিপ্লব পরবর্তীতে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে এবং ইবনে সৌদ নামক জনৈক ব্যক্তির সংস্পর্শে এই বিপ্লব উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা শুরু করে, শুরু হয় পবিত্র হিজাজের ‘রক্তাক্ত অধ্যায়’।

হিজাজের ওয়াহহাবী বিপ্লবের মূল নায়ক ছিলেন শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী। মূলতঃ তিনি তাঁর নতুন মতাদর্শের মাধ্যমে তৌহিদের কিছু বিভ্রান্তিকর ব্যখ্যা প্রদানপূর্বক ইসলামের বহু বৈধ জিনিসকে শিরক বলে প্রচার করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ হল তাওয়াস্সুল, শাফায়াত ইত্যাদি। এরপর তিনি তাঁর বিকৃত তৌহিদের ধারণা দিয়ে মুসলিমদের তাবদী ও তাকফীর করেন এবং পবিত্র হিজাজ শরীফে একটি ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করেন। তাঁর রচিত কিতাব كتاب التوحيد হল একটি বহুল চর্চিত ও পঠিত একটি বই যাতে তিনি তাওহীদ ও আকীদাগত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়াও রয়েছে কাশফুশ শুবুহাত। এসকল কিতাবাদিতে তাঁর বিকৃত তৌহিদের ধারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।

শায়েখ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী ও ওহাবী মতবাদের বিষয়ে আমরা অনেকেই পরিচিত হলেও , শাইখ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর জীবনী ও তাঁর ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে আমরা অনেকেই এখনো সম্যক অবগত নই। বর্তমান প্রচলিত কিছু কিতাবাদি থেকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু ধারণা আমরা পেয়েছি , ততটুকু আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়।‌ আজকে আমরা সমকালীন ও পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও আলেম ওলামাদের গ্রন্থ থেকে শায়েখ আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বর্তমান সৌদি আরব ও তদানীন্তন আল হিজাজের নজদের ইয়ামামার আল উয়াইনাতে ১৭০৩ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী। তাঁর পুরো নাম হল মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব বিন সুলাইমান বিন আলী বিন আহমাদ বিন র-শিদ বিন বুরাইদ বিন মুহাম্মাদ বিন বুরাইদ বিন মুশরিফ ।

তাঁর পিতা আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী (রহঃ) ও দাদা সুলাইমান ছিলেন সেযুগের কাজী। তাঁর সহোদর ভাইয়ের নাম ছিল সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব । সুলাইমান ও তাঁর পিতা উভয়েই ছিলেন সেযুগের দুইজন বিখ্যাত হাম্বলী  আলিম। এখানে  উল্লেখ্যঃ যে, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব ছিলেন বনূ তামীমের গোত্রের মানুষ।

ছোটবেলা থেকেই মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী দ্বীনি পরিবেশে মানুষ ও অধ‍্যাবসায়ী ছিলেন। তাঁর পিতার কাছেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন ও ছোটবেলাতেই পবিত্র কুরআন শরীফ

মুখস্থ করে ফেলেন। তিনি এসময় পবিত্র কুরআন ও হাদীসের শিক্ষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।
এরপর হজ্বের লক্ষ্যে তিনি পবিত্র মক্কা আল মুকার্রামা গমন করেন। সেখান থেকে মদীনাতুল মুনাওওয়ারাহ হয়ে তিনি ফিরে আসেন আল উয়াইনাতে তাঁর বাড়িতে। অতঃপর তিনি জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করেন।

কিছুকাল পরে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো তিনি মক্কা শরীফে গমন করেন। এরপর মদীনা শরীফে গমন করেন। মদীনাতে এসে তিনি নজদী শাইখ আব্দুল্লাহ বিন ইব্রাহীম বিন সাইফ এঁর নিকট হাম্বলী ফিকহ পাঠে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এছাড়া তিনি তদানীন্তন প্রখ্যাত হানাফী আলিম শাইখ হায়াত সিন্দী (রহঃ) এঁর নিকট থেকে পাঠ গ্রহণ করেন।

কিন্তু এসময় থেকেই মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর মধ‍্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। তিনি এসময় থেকেই ইসলাম নিয়ে নিজের মতো ফতোয়া জারি করতে শুরু করেন। তাঁর এধরনের আচরন তাঁর পিতা আব্দুল ওয়াহহাব ও তাঁর ভাই শাইখ সুলাইমানের সহ তাঁর শায়েখদের পছন্দ হয়নি। তাঁরা মুহাম্মাদের মধ‍্যে অশনী সংকেত দেখতে পান। তাঁরা একপ্রকার ভবিষ্যতবাণী করে দেন যে, এই ছেলে ভবিষ্যতে পথভ্রষ্টতার দিকে এগিয়ে যাবে। এ বিষয়ে তদানীন্তন বিখ্যাত শাফেয়ী ইমাম এবং পবিত্র মক্কা শরীফের গ্রান্ড মুফতি শাইখুল ইসলাম ইমাম হযরত জাইনী দাহলান কুদ্দিসা সির্রুহু তাঁর কিতাব ‘فتنة الوهابية’ তে লেখেনঃ

وكـان في ابـتـداء أمـره مـن طلبة العلم بالمدينة المنورة على ساكنها أفـضـل الصلاة والسلام وكان أبوه رجلا صالحاً من أهل العلم وكذا أخـوه الشيخ سـلـيـمـان وكان أبوه وأخوه ومشايخه يتفرسون فيه أنه سـكـون مـنه زيغ وضلال لما يشاهدونه من أقواله وأفعاله ونزعاته في كثير من المسائل ، وكانوا يو بخونه ويحذرون الناس منه فحقق الله فـراسـتهـم فـيـه لمـا ابـتدع ما ابتدعه من الزيغ والضلال الذي أغوى به الجاهلين وخالف فيه أئمة الدين وتوصل بذلك إلى تكفير المؤمنين فزعم أن زيارة قبر النبي صلى الله عليه وسلم والتوسل به و بالأنبياء والأولياء والصالحين وزيارة قبورهم شرك ، وأن نداء النبي صلى الله عليه وسلم عند التوسل به شرك ، وكذا نداء غيره من الأنبياء والأولياء والصالحين عند التوسل بهم شرك ، وأن من أسند شيئا لغيرالله ولو على  سبيل المجاز العقلي يكون مشركا… “

(فتنة  الوهابية، صـ ٤)

তদানীন্তন নজদের বিখ্যাত হাম্বলী আলিম ইমাম হযরত ইবনে হুমাইদ আন নাজদী আল হাম্বলী রহঃ তাঁর প্রণীত কিতাব ‘السحب  الوابلة علي ضرائح الحنابلة’ তে ইবনে আব্দিল ওয়াহহাবের পিতা আব্দিল ওয়াহহাবের জীবনী রচনা করেছেন। সেই জীবনীতে ওহাবী মতাদর্শের গুরু ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একই কথা লিখেছেনঃ

وأخبرني بعض من لقيته عن بعض أهـل العلم عن من عاصر الشيخ عبدالوهاب هذا أنه كان غضباناً على ولده  محمد لكونه لم يرض أن يشتغل بالفقه كأسلافه وأهل جهته ويتفرس فيه أن يحدث منه أمر فكان يقول للناس ياما ترون من محمد من الشر

(السحب الوابلة، ص ٢٧٥)

পরবর্তীতে আব্দুল ওয়াহহাব নজদীর ভবিষ্যতবাণী সত্য প্রমাণিত হয় এবং মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহহাব নজদীর থেকে নানান ফিতনা জুহূর হতে শুরু করে। একসময় তা প্রকট হয়ে ওঠে। সে যুগের বিখ্যাত আরবী কবি হুমাইদান আল শুয়াইয়ির তাঁর একটি কাব্যে মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহহাব নজদীর ফিতনা কে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেনঃ

ما همنّ ذيب في عوصا همنّ عود في الدرعية
ما أخشى ذيب في عوصا أخشى شيخ في الدرعية
قوله حق وفعله باطل! واسلاحه كتب مطوية
خلّى هذا يذبح هذا وهو جالس في الزولية
يدعو باسم دين امحمد وأفعاله كفر وأذية
يبرأ منها دين امحمد أعماله الشيطانية
واظنه بمحمد يعني امحمد الوهابية
يقول أصله من تميم تميم (بورصه) التركية!
امحمد عبد الوهاب ومحمد السعودية
هم طيزين في سروال ذياك ايشرّع ـ لذيّه
تشاركوا باسم الدين واثنينهم حرامية
أما امحمد ابن اسعود فمن اصول يهودية
ابوه اصله مردخاي راعي الملة العبرية
ضحك على بعض اعنزه وقال ان أمه مصلوخية
وجابوه لنا من البصرة حتّى أوصوله الدرعية
بزعمهم درع النبي شروه القينقاعية
حط درعيه بالقطيف! ومن بعد صارت نجديه!
وزعم انّه ارض أجداده وهي من شرّه بريّة

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর পথভ্রষ্টতার বিষয়ে সতর্ককারী যেসকল আলেম ওলামা ছিলেন তাঁদের মধ‍্যে তাঁর শায়েখ হায়াত সিন্দী ও মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আল কুর্দী ছিলেন অন‍্যতম। এবিষয়ে বিখ্যাত আলেম ও আরবী সাহিত্যের অন্যতম নক্ষত্র জামীল স্বিদক্বী আয যাহাউই তাঁর আল ফজরুস স্বদিক্ব গ্রন্থে লিখেছেনঃ

“وممن أخذ عنه في المدينة الشيخ محمد بن سليمان الكردي و الشيخ محمد حياة السندي، و كان الشيخان المذكوران و غيرهما من المشايخ الذين أخذ عنهم يتفرسون فيه الغواية و الإلحاد”

( الفجر الصادق في الرد على الفرقة الوهابية المارقة ، الشيخ جميل صدقي الزهاوي رح، صـ ١١)

অতঃপর আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী মুসলিমদের তাকফীর করতে শুরু করলেন, সেইসাথে শরয়ী কিছু বিধান কে নিজের মতো করে বিদাত ও শিরক বলে ফতোয়া দেন। এরমধ্যে রয়েছে কবর জিয়ারত, তাওয়াস্সুল প্রভৃতি, যেমনটি ইতিপূর্বে বলেছি।

যাইহোক, অতঃপর তিনি উয়াইনাতে ফিরে আসেন। এবং সেখানে তিনি একবছর অতিবাহিত করেন। এরপর তিনি ইরাকের বস্বরাতে গমন করেন ও সেখানে ফিকহ সহ বিভিন্ন জ্ঞান অর্জন করেন।

এবিষয়টা আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, মূলতঃ ইরাক থেকেই তিনি ওহাবী আন্দোলনের সূচনা করেন। এবিষয়ে সমকালীন আলেম শাইখ আব্দুল ওয়াহহাব বিন তুরকী (মৃঃ ১৮৪১ খৃঃ) এঁর লেখা ফিতনাতুল ওয়াহহাবিয়াহ ওয়া আহওয়ালু নাজদ গ্রন্থের সমাপনীতে টিকাতে বলা হয়েছেঃ

“محمد بن عبد الوهاب، اول ما أظهر دعوته السلفية في مدينة البصرة في العراق”
(فتنة الوهابية و احوال نجد، الشيخ عبد الوهاب بن تركي ، صـ ٨٠)

নাজদী সাহেব ধীরে ধীরে উগ্রবাদী এবং অনৈসলামিক কাজকর্মে লিপ্ত হতে শুরু করেন। তিনি অমুসলিমদের সম্পর্কিত আয়াত মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে তাকফীর করতে শুরু করলেন। একারণে স্বভাবতই ইরাকের আলেম ওলামারা এই ব‍্যক্তির ভ্রষ্টতার বিরোধিতা করতে শুরু করেন। শায়েখ তুরকির কিতাবে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসময় ইরাকের বড়বড় আলেম যেমন, শাইখ আল মুহাদ্দিস ইসমা’য়ীল আস স্বান’য়ানী, হাফিজ্ব মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল আফালিক্ব, শাইখ আল কুব্বানী আল বাস্বরী সহ অন‍্যান‍্যরা তাঁর বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন।

অবশেষে বস্বরার ওয়ালী (গভর্নর) উসমান বিন মু’য়াম্মার যখন দেখলেন যে ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব নাজদী  শহরে ফাসাদাত সৃষ্টি করছেন ও তওহীদের  ভুল ব্যখ্যা দিয়ে ভন্ডামি শুরু করেছেন তখন তিনি বস্বরা থেকে নাজদীকে তাড়িয়ে দেন। শোনা যায় ইরাকে অবস্থান করার সময় তিনি জনৈক ব্রিটিশ চরের সংস্পর্শে আসেন। যা আমরা Confessions of a British Spy গ্রন্থ থেকে বিস্তারিত জানতে পারি। তবে এর সত্যতা কতটুকু সেটা দেখার বিষয়।

অতঃপর নজদী আজ জুবায়ের ও আল আহসা হয়ে দিরি’ইয়‍্যাতে আসেন। এখানে ফিরে তিনি তদানীন্তন দিরিয়ার মোড়ল মুহাম্মাদ ইবনে সাউদের সাথে একত্রিত হয়ে ওহাবী মতবাদ প্রচার শুরু করেন। ইবনে আব্দিল ওয়াহহাব নাজদীর মতবাদ ধীরে ধীরে ধর্মীয় গন্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। তিনি তৌহিদের ভুল ব্যখ্যা দিয়ে পবিত্র হিজাজে ব্যপক সন্ত্রাসবাদ, ফিতনা ও ফাসাদাত শুরু করেন । তিনি  মুসলিমদের এমনকি উসমানীয় শাসকদের মনগড়া ব্যখ্যার মাধ্যমে তাকফীর করে ব্যপক হত‍্যাকান্ড শুরু করতে থাকেন। এবিষয়ে আমার লেখা পূর্বের প্রবন্ধে কিছুটা পাবেন এছাড়া ভবিষ্যতে লেখা প্রবন্ধ সমূহেও পাবেন ইন শা’আল্লাহ। ওহাবীরা ওসমানীয়দের আমভাবে তাকফীর করত এবং মুশরিক মনে করত। সেযুগের বিখ্যাত ওহাবীদের ইমাম শায়েখ আব্দুল লত্বীফ বিন আব্দুর রহমান বিন হাসান বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবে লেখা  ‘عنوان الرسائل و الأجوبة علي المسائل’ নামক দুই খন্ডের গ্রন্থ হতে এর প্রমাণ মেলে। সেখানে তিনিস উসমানী খিলাফতের সেনাবাহিনীকে ‘মুশরিক সেনাবাহিনী’ এবং ‘আল্লাহ ও দ্বীনের দুশমন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। উক্ত কিতাবে হুতাবাসীর কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন তিনি। যাতে তিনি বলেনঃ

“وقد اناخ بساحتكم من الفتن و المحن ما لا نشكوه الا الي الله، فمن ذلك: الفتنة الكبرى و المصيبة العظمى، الفتنة بعساكر المشركين أعداء الملة والدين”

(عنوان الرسائل و الأجوبة علي المسائل، ص ٩٤٠ ، المجلد الثاني)

উক্ত কিতাবের টিকাতে  স্পষ্ট বলা হয়েছে যে এখানে মুশরিক বলতে উসমানীয় সেনাবাহিনীকে বোঝানো হয়েছে। এছাড়া ওহাবীদের নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার কিতাব “الدرر السنية في الاجوبة النجدية’  তে উসমানীয়দের তাকফীর করে বলা হয়েছেঃ

فمن لم يكفر المشركين من الدولة التركية ( العثمانيين ) و عباد القبور، كاهل مكة ( يعني المتوسلين و المسلمين الذين يقولون ‘ يا رسول الله نسألك الشفاعة’ و يظن  محمد بن عبد الوهاب النجدي الخبيث انهم مشركون)، و غيرهم ممن عبد الصالحين ( يتوسل بالصالحين ) و عدل عن توحيد الله الي الشرك و بدل سنة رسول الله بالبدع ، فهو كافر مثلهم”

(الدرر السنية في الاجوبة النجدية ٩/٢٩١)

এখানে উসমানীয়দের পাশাপাশি আহলে কুবূরদের তাকফীর করা হয়েছে।  আহলে কুবূর বলতে তিনি তাওয়াস্সুলকারী, কবর জিয়ারতকারী , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবরের পাশে শাফায়াত প্রার্থীদেরও বুঝিয়েছেন যা আগে দেখিয়েছি। এখানে বলছেন যারা ওসমানীদের তাকফীর করবে না ওরাও কাফির!

এছাড়া তাদের ইমাম শাইখ সুলাইমান বিন সাহমানের লেখা منهاج اهل الحق والاتباع কিতাবেও ওসমানীদের তাকফীর করে বলা হয়েছেঃ

وكذلك قوله رحمه الله: وقد استزل الشيطان اكثر الناس في هذه المسألة فقصر بطائفة فحكموا بإسلام من دلت نصوص الكتاب والسنة والإجماع علي كفره.

قلت: وهولاء كامثال الذين حكموا بإسلام طائفة الترك و اشباههم …”

(منهاج اهل الحق والاتباع ص ٧٨)

নজদে এভাবে তাকফীর ফিতনা ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়লে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের তদানীন্তন বড়বড় আইম্মায়ে কিরাম তাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। এসময় অন‍্যান‍্য আলেম ওলামাদের মতো ইবনে আব্দিল ওহাব নাজদীর ভাই সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী রহঃ ওহাবী মতবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। তিনি ওহাবীদের মতবাদ খন্ডন করে লিখে ফেললেন “الصواعق الالهية في الرد على الوهابية” ।

ওহাবীরা কেবলমাত্র ওহাবী মতাদর্শীদেরকেই মুসলিম হিসেবে মনে করত এবং যারা এই মতাদর্শ গ্রহণ করত না অথবা তাদের খাওয়ারিজ বলত তাদেরকে তারা তাকফীর করত। এবিষয়ে তাদের উপরোক্ত ফতোয়ার কিতাব আদ  দুরারে স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। সেখানে একটি ফতোয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে যারা ওহাবিয়্যাত গ্রহণ করবে (তাদের মতে ইসলাম) অথচঃ এটাও মনে করবে যে তাদের পিতা মাতা যারা ওহাবিয়্যাত গ্রহণ করে নাই তারা ইসলামের উপর ইন্তেকাল করেছেন তারা কাফির। সেখানে বলা হয়েছেঃ

المسألة الخامسة عشرة : فيمن عاهد على الإسلام ، والسمع والطاعة ، والمعاداة والموالاة ، ولم يف بما عاهد عليه من الموالاة والمعاداة ، ولا تبرأ من دينه الأول ويدعي أن آباءه ماتوا على الإسلام ، فهل يكون مرتداً ؟ وهل يحل أخذ ماله وسبيه إن لم يرجع ؟ ،

الجواب : إن هذا الرجل ، إن اعتقد أن آباءه ماتوا على الإسلام ، ولم يفعلوا الشرك الذي نهينا الناس عنه ، فإنه لا يحكم بكفره ، وإن كان مراده أن هذا الشرك الذي نهينا الناس عنه ، هو دين الإسلام ، فهذا كافر ، فإن كان قد أسلم فهو مرتد ، يجب أن يستتاب ، فإن تاب وإلا قتل ، وصار ماله فيئاً للمسلمين ، وإن تاب قبل موته أحرز ماله ، والله أعلم .

(الدرر السنية في الاجوبة النجدية)

বিখ্যাত আরবী সাহিত্যিক ও আলেম শাইখ জামীল স্বিদকী আয যাহাবী রহঃ তাঁর লেখা রদ্দে ওহাবিয়ার উপর কিতাব ‘الفجر الصادق في الرد علي الفرقة الوهابية المارقة’ তে  এই বিষয়ে লিখেছেনঃ

“و يكفر كل من لا يتبعه و ان كان من اتقي المسلمين …”

(الفجر الصادق في الرد على الفرقة الوهابية المارقة للشيخ جميل صدقي الزهاوي رحمه الله، صـ ١٢)

নজদীদের উপরোক্ত ফতোয়ার কিতাব আদ দুরারের প্রথম খন্ডের ৬৩ পৃষ্ঠায় ফতোয়াতে স্পষ্ট প্রমাণ মেলে  যে, যারা ওহাবীদের বিরুদ্ধে যেত অথবা খাওয়ারিজ বলত , যদিও তারা মু’মিন ও তৌহিদী হত তবুও তাদেরকে নজদী তাকফীর করতেন।ঃ

“فإن قال قائلهم: انهم يكفرون بالعموم؛ فنقول سبحانك هذا بهتان عظيم؛ *الذي نكفر، الذي يشهد أن التوحيد دين الله، و دين رسوله، و أن دعوة غير الله باطل، ثم بعد هذا يكفر اهل التوحيد، و *يسميهم الخوارج؛”

(الدرر السنية في الأجوبة النجدية ، جـ ١ ، صـ ٦٣)

ওহাবীদের তাকফীরী আন্দোলনের ফলে ওহাবীরা মক্কা জুড়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড শুরু করে। বর্তমান সৌদি আরবের রূপকার ইবনে সৌদের পরামর্শদাতা এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা জন ফিল্বী তাঁর কিতাবে ওহাবীদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে লিখেছেন যে, তারা ঐ সমস্ত মুসলিম দের তাকফীর করত যারা তাদের মতের অনুসরণ করত না ঃ

“And almost before the year was out Ibn Sa’ud found himself in command of a voluntary territorial army composed entirely of Badawin turned yeomen , on whose loyalty he could count to the death , though their undisciplined courage always needed a backing of steadier troops from the towns and villages to make them an effective force , while their fanatical zeal for the destruction of the infidel ( a term liberally interpreted by them to include not only non – Muslims but also all Muslims who did not share their fundamentalist conception of the true faith ) had often to be kept in check in the hour of victory , and in times of peace . ”

(Saudi Arabia, pg. 262)

একসময় আরবরা অতীষ্ঠ হয়ে শুরু করে বিপ্লব। বিপ্লবটা ছিল আরবজুড়ে। মিথ‍্যার বিরুদ্ধে সত‍্যের , অত‍্যাচারের বিরুদ্ধে অত‍্যাচারিতের ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন‍্যায়ের।  তাকফীর ও হহত্যাকান্ডের ফলে নজদের জণগণ প্রথম থেকেই ওহাবী সৌদী দের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ ছিলেন। অতঃপর সৌদ আল আওওয়ালের রাজত্বে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ও শুরু হয় ওহাবী সৌদি বিরোধী বিপ্লবের।

১৮৬৫ সালে সংঘটিত বনী খালিদ, ওজমান ও নাজরান বাসীদের ওহাবী সৌদ বিরোধী বিপ্লব সংঘটিত হয়। এটি সাওরাতুল ইয়াম বা ইয়ামের বিপ্লব নামে পরিচিত।

এর পর দিরিয়াতে ওহাবী-সৌদীদের বিরুদ্ধে যে ভয়ঙ্কর বিপ্লব শুরু হয় যেটি ওহাবী ও সৌদ সাম্রাজ্যের প্রথমবারের মতো ইতি টেনে দেয় সেটিই  ছিল আরব বিপ্লব , যা কেবল হিজাজ শরীফ নয় ছাড়িয়ে পড়ে সারা আরবে।

১২২০ খৃষ্টাব্দে দিরিয়ার তদানীন্তন শাসক সৌদ আল আওওয়াল বা প্রথম সৌদ উসমানীয়দের সাথে একটি চুক্তির ভিত্তিতে পবিত্র হিজাজ শরীফে প্রভাব স্থাপন করেন । শাসন ক্ষমতা পেয়ে পূর্ববর্তী দিরিয়ার সৌদি ওহাবি শাসকদের মতো সাধারণ মানুষের উপর অত‍্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়ে দেন।

শাসনে আসার পর সৌদ আল আওওয়াল শুধু হিজাজ নয় অন‍্যান‍্য আরবীয়দের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। তিনি এসময় মিসরীয় ও সিরীয়দের হজ্ব বন্ধ ঘোষণা করেন ও তাদের বিরুদ্ধে কড়া শর্ত আরোপ করেন। হাজীদের বিরুদ্ধে দমন পীড়নের ব্যপারে ঐতিহাসিক যাইনী দাহলান বলেন যে, সৌদ মিশরীয় ও সিরীয় হাজীদের পালকিগুলো তিনি পুড়িয়ে দেন। ঐতিহাসিক নাসির সুয়াইদ লিখেছেন যে, এসময় মক্কাতে মিশরীয় ও সিরীয় হাজীদের পাল্কী আনার বিরুদ্ধে তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পাল্কী আনলে মিশরীয় ও সিরীয়দের হত‍্যার হুমকি দেন সৌদ আল আওওয়াল। এছাড়া পরবর্তী বছর সাইয়‍্যেদ আব্দুল্লাহ পাশার নেতৃত্বে একদল সিরিয়ার হাজী হজ করতে আসেন কিন্তু সৌদ আল আওওয়াল তাঁদের হজ্ব পালনে বাঁধা দেয়। ফলে পবিত্র হিজাজে এসেও শামের হাজীরা বিনা হজে ফিরে যান।

ওহাবীরা একসময়  মিশরীয় হাজীদের তাকফীর করতঃ হজ পালনে বাধা প্রদান করে।নাজদির সমসাময়িক মিশরের প্রখ‍্যাত হানাফী ঐতিহাসিক ইমাম জাবরাতি তাঁর লেখা ইতিহাসের বই তারীখে জাবরাতীতে ওহাবীদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি আলোচনা প্রসঙ্গে এক পর্যায়ে মিশরের হাজীদের তাকফীর করার বিষয়ে আলোচনা করেন। কেবল দাড়ি না রাখার জন্য তাদের তাকফীর করে মুশরীক হিসেবে হজে আসতে মানা করে এবং মুশরীকদের বিষয়ে আসা আয়াত তাদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। তারীখে জাবরাতীর (عجائب الاثار) চতুর্থ অধ‍্যায়ের ৮৯ পাতায় বলা হয়েছেঃ

“وفيه وصل ثلاث داوات من جدة الي ساحل السويس فيها اتراك و شوام في و اجناس اخرون و ذكروا ان الوهابي نادي بعد انقضاء الحج ان لا يأتي الي الحرمين بعد هذا العام من يكون حليق الذقن، وتلا في المناداة قوله تعالي ﴿يا ايها الذين آمنوا إنما المشركون نجس فلا يقربوا المسجد الحرام بعد عامهم هذا﴾

এবিষয়য়ে  ইমাম শাইখুল ইসলাম হযরত যাইনি দাহলান কুদ্দিসা সির্রুহু তাঁর তারীখে দাহলানে (خلاصة الكلام) এর ৩৮১ পাতায় আলোচনা করেন। ১২২১ হিজরীতে ওহাবীরা এভাবে  শামী ও মিশরীয় হাজীদের হজে আসতে নিষেধ করে ফলে অগত‍্যা হাজীরা চলে যান। তিনি লিখেছেনঃ

“و في سنة احدي و عشرين كان امير الحج الشامي عبد الله باشا فلما وصل هدية جائته مكاتيب من الوهابي لا تأتي الا علي الشرط الذي شرطناه عليك في العام الماضي فلما قرؤوا تلك المكاتيب رجعوا من هدية من غير حج.

ঐ একই পাতাতে একই সালে মিশরীয় হাজীদের মাহমালকে বেদাত ঘোষণা করে পুড়িয়ে দেন বলে তথ‍্য দিয়েছেন শাইখুল ইসলাম রহঃ।

সিরিয়ার হাজীদের হজে আসতে বাধাদানের করার বিষয়টি  ওহাবীদের লেখা ইতিহাস থেকেও প্রমাণ মেলে । বিখ্যাত তাকফীরী নাজদী ঐতিহাসিক উসমান বিন আব্দুল্লাহ বিন বাশার তাঁর লেখা ‘عنوان المجد في تاريخ نجد’ এর প্রথম খন্ডের ২৯২ পৃষ্ঠায় ১২২১ হিজরীর আলোচনায় শামী হাজীদের হজে আসতে নিষেধ করার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেনঃ

“فلما خرج سعود من الدرعية قاصدا مكة أرسل فراج بن شرعان العتيبي و رجاله معه، لهولاء الامراء المذكورين و ذكر لهم ان يمنعوا الحواج التي تأتي من جهة الشام و استنبول و نواحيها”

প্রখ‍্যাত সৌদি ঐতিহাসিক নাসির সুয়াইদ  নাজদীদের আরোপিত চুক্তি ও হাজীদের হজে আসতে মানা করার বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেন তাঁর লেখা তারীখে আলে সৌদে। সৌদরা যেহেতু হাজীদের মুশরিক মনে করত তাই জিজিয়া ও আরোপ করে হাজীদের উপর। তারিখে আলে সৌদে লেখক মাহমাল না আনা, ইয়া মুহাম্মাদ না বলা এসব শর্তের বিষয়ে ও হজে আসা বারণ ও জিজিয়া আরপের বিষয়ে বলেনঃ

“فابلغ السعود اهالي مصر و الشام قائلا ( انكم يا اهالي مصر و الشام إذا فعلتم ذلك بعد هذا العام فاني اكسر المحمل الشامي و المصري ، و اقتل جميع الحجاج، و كذلك شروط أخري عليكم يا اهالي مصر و الشام اولا ان لا تحلقوا لحاكم ، ثانيا ان لا تذكروا الله باصوات عالية او تنادوا بقولكم <<يا محمد>> ثالثا – ان يدفعوا كل حاج منكم جزية قدرها عشرة جنيحات”

(تاريخ آل سعود لناصر سعيد ، ص 34)

ঐতিহাসিক জাবরাতির ইতিহাসে ওহাবীদের অত‍্যাচার থেকে বাঁচতে একদল ওলামায়ে কিরামের মক্কা থেকে পালিয়ে আসার ঘটনা উল্লেখ করেন। মক্কার কিছু ওলামায়ে কেরাম ও গণ‍্যমাণ‍্যরা নাজদিদের অত‍্যাচারে পালিয়ে ইস্তাম্বুলে খবর দিতে যান যাতে উসমানীয়গণ তাকফীরীদের থেকে তাঁদের রক্ষা করেন। এ বিষয়ে জাবরাতী লিখেছেনঃ

“وفيه، حضرت جماعة من اشراف مكة و علمائها هروبا من الوهابيين و قصدهم السفر إلي اسلامبول يخبرون الدولة بقيام الوهابيين. و يستنجدون بهم لينقذوهم منهم و يبادروا لنصرهم عليهم… ( تاريخ الجبرتي ، جـ ٣، صـ ٣٢٧)

ইবনে আব্দিল ওহাব নাজদীর ফেতনার একটি জঘন্য উদাহরণ হল যে, তিনি হাজী মহিলাদের নেড়া করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। এবিষয়ে শাইখুল ইসলাম হযরত যাইনি দাহলান কুদ্দিসা সির্রুহু তাঁর তারীখের ৩১০ পৃষ্ঠায় এবিষয়ে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যার নাম “ابن عبد الوهاب يأمر بحلق رؤوس النساء” নামে। এবিষয়ে অন‍্য একটি বইতে আলোচনা পড়েছি।

যাইহোক, সৌদ ও ওহাবীদের অত‍্যাচার তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। বহু মানুষ হিজাজ থেকে সিরিয়া, ইয়ামেন, মিশর, সুদান, তুরস্ক প্রভৃতি জায়গায় হিজরত করেন।

ওসমানী এবং আরবীয়দের তাকফীর করে হত্যা করলেও ইরানের সাথে ওহাবীদের দহরম মহরম ছিল। সৌদ আল আওওয়াল ইরানের শীয়া রাজবংশ শাহদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেছিলেন। এসময় তিনি ইরানের শাহ প্রথম প‍্যাহলভী ও ইহুদীদের সাথে উপঢৌকন, গোলাম ও বাঁদী বিনিময় করতেন ।  যা নজদবাসী ও আলেম ওলামাদের চরম রাগান্বিত করে।

সৌদ আল আওওয়াল কেবল সিরিয়া বা মিশরীয় নয় তিনি ইয়েমেনীদেরকেও হজ্ব পালনে বাঁধা দেন। সৌদদের এই আচরন হিজাজের বাইরের আরবীয়দেরকেও প্রচন্ড ক্ষুব্ধ করে ও তাঁরা আলে সৌদ ও ওহাবীদের বিরুদ্ধে বিপ্লব শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে মিশরে এই বিপ্লবের বীজ দানা বাঁধতে থাকে।

এদিকে ওহাবীদের অত্যাচারে অতীষ্ঠ মিশরবাসী তুর্কি শাসকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে ওহাবী ও সৌদ দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে । ফলে সুলতান সেলীম রহঃ মিশরকে আদেশ দিলে মিশর শাসক মুহাম্মাদ আলী তাঁর পুত্র তুসূন পাশার নেতৃত্বে একটি মিশরীয় বাহিনী হিজাজে পাঠান । তুসূন বীর বিক্রমে ওহাবী ও সৌদদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালাতে থাকেন।‌ কিন্তু এসময় হিজাজ থেকে সৌদ দের মুলোৎপাটন করতে সক্ষম হলেন না। কারণ সৌদ আল আওওয়াল উসমানীয়দের সাথে চুক্তি করেন ও তিনি পবিত্র হিজাজে উসমানীয়দের কর্তৃত্ব মেনে নেন। ফলে উসমানী সুলতান তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করেন।

এর ফলে আরবীয়রা উসমানীয়দের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন।কারণ তাঁরা চেয়েছিলেন সৌদি ও ওহাবীদের মুলোৎপাটন করতে। কিন্তু তা আর হল না।

এরপর বিক্ষুব্ধ আরবরা উসমানীয়দের উপর আবার ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। অতঃপর মিশর শাসক মুহাম্মাদ আলী পাশা তাঁর অপর সন্তান আব্দুল্লাহ পাশাকে ওহাবী সৌদিদের মুলোৎপাটন করার জন্য আরব বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন। ঐতিহাসিক নাসির সুয়ায়িদ তাঁর ইতিহাস বইতে লিখেছেন যে, এবারেও সৌদিরা উপঢৌকন দিয়ে উসমানীয়দের সাথে চুক্তি করতে চাইল। সৌদ আল আওওয়াল মিসরীয় শাসক মুহাম্মাদ আলী পাশার কাছে চুক্তির লক্ষ্যে দূত পাঠালেন। কিন্তু আরবীয়রা সৌদের পাঠানো দূতকে তিনটি শর্ত দিল যার ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নি। এসকল শর্তের মধ‍্যে ওহাবী সৌদি বর্বরতার ফলে নিহত হওয়া মানুষদের রক্তপণ দিতে হবে‌।

এরপর আরবরা সৌদ ও ওহাবীদের মূলোৎপাটন করার জন্য অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।‌এদিকে সৌদ আল আওওয়াল আরবদের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন‌ । তিনি সম্ভাবতঃ বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর দায়েশী স্বপ্নের সমাধী রচনা করতে আরবরা প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আরবীয় অভিযানের পূর্বে ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে একটি মহামারীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর পূর্বে সৌদ আল আওওয়াল তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ বিন সৌদকে মনোনিত করেন। কিন্তু নজরের আলেম ওলামা আব্দুল্লাহ বিন সৌদের মনোনয়নের বিরুদ্ধে আরবীয় জনগণের পাশে দাঁড়ান।

এদিকে আরব বিপ্লবীরা যখন সৌদ ওহাবী বিরোধী বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন পার্শ্ববর্তী ইয়েমেনী রাজা আলে সৌদের সাথে চুক্তি করে আব্দুল্লাহ বিন সৌদের সহায়তায় সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ইয়েমেন বাসী তা অস্বীকার করে ও এক বিশাল সংখ্যক ইয়েমেনী আরবীয় বিপ্লবী বাহিনীতে যোগদান করেন। ওমানেও বিপ্লবের আগুন ধিকধিক করে জ্বলতে থাকে ও আলে সৌদের ওলিকে হত‍্যা করে ও আরব বিপ্লবী বাহিনীতে যোগদান করেন।

এদিকে হিজাজের আল কাসীম ও নাজদের আলেম ওলামারা সৌদ ওহাবীদের নির্মূলের জন্য প্রচারণা শুরু করেন। তাঁরা মসজিদে মসজিদে আলে সৌদ ও আলে ওহাবের বিরুদ্ধে প্রচার করে দেনঃ

“لن يظهر دين الحق ما لم نطهر هذا الدين من هاتين العائلتين الفاسدتين بالدين و الدنيا و رقاب العرب و المسلمين”

১৮১৪ সাল। আরব বিক্ষুব্ধ বাহিনী‌ আলে সৌদ ও ওহাবীদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। বীরবিক্রমে যুদ্ধের পর আলে সৌদ ও ওহাবীদের মুলোৎপাটন করে ফেলেন। সৌদ রাজা আব্দুল্লাহ বিন সৌদকে পাকড়াও করে মিশরে পাঠানো হয়। মিশর থেকে তাঁকে মুসলিম বিশ্বের রাজধানী ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয়। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও তাকফীরি মতবাদের প্রসার ও মুসলিম হত‍্যার কারণে তাঁকে ১৯১৫ সালে ইস্তাম্বুলে শিরোচ্ছেদ করা হয়।

এদিকে আরবী বিক্ষুব্ধ বাহিনী ওহাবীদের নিধনযোজ্ঞ শুরু করেন।  মিশর বাহিনী হিজাজ ছেড়ে চলে গেলে সৌদী বংশের মিশারী বিন সৌদ শাসন ক্ষমতা দখল করে বসলেন। কিন্তু বিক্ষুব্ধ নজদবাসী তাঁকে হত‍্যা করেন। এরপর তুর্কি বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন সৌদকেও হত‍্যা করা হয়।‌ অতঃপর ১২৪৯ হিজরীতে মিশারী বিন আব্দুর রহমান সৌদ নিজেকে মু’মীন আমীর ঘোষণা করলে নযদীরা আবার ক্ষেপে যান ও তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর তুর্কি সৌদের ছেলে ফয়সাল বিন তুর্কি বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন সৌদ ক্ষমতা দখল করতে চাইলেও আরবীয়দের চাপে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। উল‍্যেখ‍্যঃ যে তাঁর পিতা তুর্কি যখন নিহত হন তখন তিনি আল কাতীফ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন।

যাইহোক এভাবেই অবসান ঘটে প্রথম সৌদি সাম্রাজ্যের ধ্বসে পড়ে আলে সৌদদের প্রাসাদ যা পরবর্তীতে বেশ কয়েক দশক আর খাড়া হতে পারে নাই, সমাপ্ত হয় ওহাবীদের  একটি কালো ইতিহাস।

 402 total views,  1 views today

Start Blogging

Register Here


Registered?

Login Here

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.