ওরা এখনো উসমানীদের পিছু ছাড়ছে না..

লিখেছেনঃ নুসাইর তানজীম

ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে সংঘটিত হওয়া উসমানী-মামলুক লড়াই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাসে দেখা যায়, উসমানীদের সাথে মামলুকদের সম্পর্ক প্রথম দিকে খুব ভালো ছিলো। এরতুগ্রুল তাতারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মামলুক সুলতান বাইবার্সের সহযোগীতা নিয়েছিলেন। সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ যখন কনস্টান্টিনোপল বিজয় করেন তখন কায়রোতে মামলুক সুলতান এবং আব্বাসী খলীফার কাছে সুসংবাদসহ দূত পাঠিয়েছিলেন। মামলুক সুলতান সে সময় গোটা মিসর এবং শামে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের উৎসব পালন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই সুসম্পর্ক টিকে থাকে নি। ধীরে ধীরে দুই সালতানাতের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। এক পর্যায়ে তা দুই সালতানাতের মধ্যে যুদ্ধে রুপ নেয় এবং উসমানীদের হাতে মামলুকদের পতনের মধ্য দিয়ে সুদীর্ঘ মামলুক সালতানাতের ইতি ঘটে। তারপর থেকে মিসরে উসমানী যুগ শুরু হয়।
কী কারণে উসমানীরা মামলুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলো — ইতিহাসে তার একাধিক কারণ পাওয়া যায়। তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে:
১.
মামলুক সালতানাত ছিলো বিশাল এক মুসলিম সাম্রাজ্য। এখনকার মিসর, সুদান, জর্দান, সিরিয়া, ফিলিস্তীন, উত্তর ইরাক (মসুল) এবং হেজায (মক্কা-মদীনা) ছিলো তাদের সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত। সে হিসেবে মামলুক সালতানাতের উত্তর সীমান্ত ছিলো উসমানী সালতানাতের আনাতোলিয়ার সাথে লাগোয়া। বর্তমানে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত এলাকা। সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের সময় এই এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই সালতানাতের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ হয় বেশ কিছু। এর পর, সুলতান ২য় বায়েজীদের আমলে বায়েজীদের বিদ্রোহী ভাই ‘জম সুলতান’ পালিয়ে গিয়ে মামলুকদের আশ্রয় চাইলে মামলুকরা তাকে আশ্রয় দেয়। এটাও দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হওয়ার একটা বড় কারণ ছিলো। এর পর, উসমানী সুলতান প্রথম সেলিমের আমলে এসে এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য শত্রুতায় রুপ নেই। সুলতান সেলিম ইরানের শিয়া সাফাভী সালতানাতের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ করছিলেন তখন মামলুকগণ স্বগোত্রীয় ‘সুন্নী শক্তি’ হিসেবে উসমানীদের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে উল্টো সাফাভীদের পক্ষ অবলম্বন করেছিলো। হয়তো সরাসরি সাফাভীদের পক্ষ অবলম্বন করে নি, তবে তখন উত্তর ইরাক, উত্তর সিরিয়া এবং আনাতোলিয়ার কিছু এলাকা নিয়ে ‘বনি যুল কদর’ নামে একটি রাজবংশের রাজত্ব ছিলো। সেলজুকদের পতনের পরে এই বংশটি এই এলাকায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলো। এরা ছিলো মামলুকদের প্রভাবাধীন এবং অনুগত। এই রাজ্যটি উসমানী-সাফাভী যুদ্ধে উসমানীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো। তাদের রসদের উপর হামলা করেছিলো। যেহেতু রাজ্যটি মামলুকদের অনুগত ছিলো তাই এর দায়ভার উসমানীরা মামলুকদের উপর চাপায়। এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সুলতান সেলিম মামলুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন।
২.
মামলুক সুলতানদের অবদান ইসলামী ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। ২য় মামলুক সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুজের হাতেই হালাকু খানের সেনাবাহিনী সর্বপ্রথম পরাজয়ের স্বাদ গ্রহন করেছিলো। আইনজালুতের যুদ্ধে তাতারদেরকে পরাজিত করে কুতুজ গোটা শামকে তাতারীদের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন। তাঁর পরে, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ৩য় মামলুক সুলতান বাইবার্সের জয়যাত্রা ছিলো আরো চমকপ্রদ। তাঁর পর একে একে সুলতান কালাউন, সুলতান আশরাফ, সুলতান কায়েতবাঈ’সহ আরো বেশ কিছু মামলুক সুলতান অসামান্য বীরত্বের সাথে লড়াই করে চিরউত্তপ্ত মিসর এবং শামকে শত্রুমুক্ত রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় মামলুক সালতানাতের এই জৌলুস থাকে নি। সেই শান-শওকতও তখন আর অবশিষ্ঠ্য ছিলো না। মামলুক সেনাবাহিনীর জুলুমে এক সময় জনগণের প্রাণ উষ্ঠাগত হয়ে উঠে। প্রশাসনে শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা। কায়রোর কেল্লায় সকালে এক সুলতানের বাইআত গ্রহন করা হলে বিকেলে দেখা যায় কেল্লা থেকে তার লাশ বের হচ্ছে। সেনাবাহিনী যখন যাকে চায় ক্ষমতায় বসায় আবার উৎখাতও করে। শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানেও মিসর এবং শামবাসী পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে একই সময়ে আনাতোলিয়ায় তখন উসমানীদের সুর্য আকাশচুম্বি। তাদের শৌর্যবীর্যের সামনে তখন গোটা ইউরোপ কম্পমান। তাই স্বাভাবিকভাবে তখন মামলুক সালতানাতের অধিবাসীরা এই দূর্বল, বিশৃঙ্খল জুলুমপুরী থেকে মুক্তি পেতে উসমানীদের শাসন কামনা করছিলো। উসমানীদের কোন দূত যখন কায়রোতে আসতো তখন কায়রোর ওলামা এবং নেতৃত্বস্থানীয় লোকেরা গোপনে তার মাধ্যমে উসমানী সুলতানের কাছে এই বলে বার্তা পাঠাতো যে, আপনি দ্রুত আসুন। কায়রোর ফটকে আমরা আপনাকে স্বাগত জানাবো। ঐতিহাসিক আব্দুল্লাহ ইবনে রিদওয়ান তাঁর ‘তারীখে মিসর’-এ এ কথা উল্লেখ করেছেন।
শামবাসীর অবস্থাও ছিলো অনুরুপ। তারাও উসমানীদের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলো। শামের ২য় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর জনগণ উসমানী সুলতানের কাছে চিঠি লিখে সরাসরি শাম দখল করার প্রস্তাব দিয়েছিলো। চিঠিটির কপি তোপকাপি মিউজিয়ামে (২৬) ১১৬৩৪ নং সিরিয়ালে সংরক্ষিত আছে।
৩.
পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত প্রাচ্য এবং প্রতিচ্যের বানিজ্যের পথ ছিলো ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগর হয়ে ভারত মহাসগর পর্যন্ত বিস্তৃত সিল্করোড। ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরের মধ্যে প্রাকৃতিক সংযোগ ছিলো না। পরে এই জায়গাটায় সুয়েজ খাল খনন করে সংযোগ স্থাপন করা হয়। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের বানিজ্যিক জাহাজগুলো ভূমধ্যসাগর হয়ে মিসরের উপকূলে নোঙ্গর করতো। তারপর সেখান থেকে স্থলপথে মিসরের উপর দিয়ে ঘোড়ার গাড়ী বা উঁটের মাধ্যমে পন্য বহন করে লোহিত সাগরে এনে পূনরায় জাহাজবোঝাই করা হতো। মিসরের স্থলপথ ব্যাবহার করার কারণে তৎকালীন মামলুক সালতানাত বানিজ্যিক কাফেলাগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের টেক্স আদায় করতো। এটা ছিলো রাষ্ট্রীয় আয়ের বড় একটি মাধ্যম। কিন্তু ১৪৮৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক বার্তুলোমিও দিয়াজ (Bartolomeo Dias 1450-1500) আফ্রীকা মহাদেশ ঘুরে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরে ঢুকার পথ আবিষ্কার করেন। উদ্দেশ্য ছিলো ভারত এবং দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার সাথে বানিজ্যের জন্য মিসরের বিকল্প নৌপথ আবিষ্কার করা। কিন্তু তিনি কেপটাউনের কাছে ‘রা’সুর রজা’ নামক স্থানে এসে প্রচন্ড ঝড়োহাওয়ার কবলে পড়ে পেছনে ফিরে যান। এই জায়গার নাম অনুসারে পরবর্তিতে এই নৌপথের আরবী নামকরণ করা হয় ‘তারীকু রা’স আর-রজা আসসালিহ’। পরবর্তিতে আরেক বিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা বার্তুলোমিওর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন এবং ১৪৯৭ সালে লিসবন থেকে রওয়ানা দিয়ে গোটা আফ্রীকা মহাদেশ ঘুরে প্রথমে আটলান্টিক, তারপর প্রশান্ত মাহাসাগর এবং তার পর ভারত মহাসাগর হয়ে ১৪৯৮ সালে ভারতের কালিকট বন্দরে এসে নোঙ্গর ফেলেন।
পর্তুগিজ কর্তৃক মিসরের বিকল্প বানিজ্য-পথ আবিষ্কার করার ঘটনা ছিলো মামলুকদের জন্য এক রকম বজ্রপাত স্বরুপ। অধিক নিরাপদ হওয়া এবং মাঝপথে পন্য খালাস করার ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার কারণে ইউরোপীয়রা এই পথ ব্যাবহার করা শুরু করে। ফলে মিসর বিশাল অংকের টেক্স থেকে বঞ্চিত হয়। এর প্রভাব পড়ে গোটা মামলুক সালতানাতের উপর। অর্থনৈতিক দূর্দশায় পড়ে জবুথবু বিশাল সালতানাত আরো দূরাবস্থার শিকার হয়। এর মধ্যে পর্তুগিজদের সাথে মামলুকদের বেশ কিছু নৌযুদ্ধও হয়। তবে সেগুলোতে তারা পরাজিত হয়। পর্তুগিজরা এক সময় লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। এমনকি ১৫১৩ সালে তারা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এডেন দখল করে নেয়। এরপর তাদের দৃষ্টি পড়ে জেদ্দা এবং হেজাযের উপর। মুসলিম বিশ্বের প্রানকেন্দ্রই তখন হুমকির মুখে পড়ে। মামলুকদের সামর্থ্যও ছিলো না যে তারা পর্তুগিজদেরকে পরাজিত করে এডেন’সহ হেজায উপকূল নিরাপদ করবে। এমতাবস্থায় দুর্ধর্ষ পর্তুগিজ নৌসেনাদেরকে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিলো একমাত্র উসমানীদের। ঠিকই উসমানীরাই ১৫৪৮ সালে পর্তুগিজদের হাত থেকে এডেন পূনরুদ্ধার করে এবং লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরে পর্তুগিজ ও স্পেনিশ আধিপত্যকে বিলুপ্ত করে। ঐতিহাসিকদের দাবী হচ্ছে, পর্তুগিজ হুমকী থেকে শাম এবং হেজাযকে মুক্ত করতেই উসমানীরা দূর্বল মামলুক সালতানাতকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পূর্বোল্লেখিত অপর দুই কারণও হয়তো ছিলো।
এসব কারণে ১৫১৬ সালে বর্তমান উত্তর সিরিয়ার আলেপ্পোর উপকন্ঠে প্রথমে ‘মারাজ দাবেক’ এর যুদ্ধে উসমানী সেনাবাহানী এবং মামলুক সুলতান ঘুরীর সেনাবাহিনী মুখোমুখী হয়। যুদ্ধে মামলুকরা পরাজিত হয় এবং সুলতান ঘুরী যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হয়। এর ফলে গোটা শাম এবং হেজায অঞ্চল উসমানী সালতানাতের অধীনে চলে আসে। এরপর ১৫১৭ সালে উসমানীরা মিসর আক্রমন করে। তখন মিসরে সুলতান ঘুরীর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন নতুন মামলুক সুলতান তুমান বাঈ। তিনি যখনই সংবাদ পেলেন যে, উসমানীরা গাজা অতিক্রম করে মিসরের দিকে ধাবিত হচ্ছে তখনই কায়রোতে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরে করে দেন। কায়রোর উত্তর-পূর্ব পার্শে আগ্রাসী সৈন্যদের প্রবেশপথে গভীর পরিখা খনন করেন। একসময় উসমানীরা কায়রোর উপকন্ঠে এসে পৌঁছায় এবং ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হয়। মামলুক সেনাবাহিনী বীরত্বের সাথে লড়াই করে। প্রথম দিকে তাদের পাল্লাই ভারী দেখাচ্ছিলো। কিন্তু উসমানীদের উন্নত তোপ আর গোলাবর্ষনের সামনে তাদের টিকে থাকা সম্ভব হয় নি। তুমান বাঈ প্রাণ রক্ষা করে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। উদ্দেশ্য ছিলো অন্য শহরে গিয়ে লোকবল সংগ্রহ করে পূনরায় যুদ্ধে নামবেন। কিন্তু তার দূর্ভাগ্য। এক গুপ্তচরের হাতে তিনি ধরা পড়ে যান। এভাবে মিসরের গৌরবময় মামলুক সালতানাতের ইতি ঘটে।
এখন সেই উসমানী সালতানাত নেই। নেই মামলুক সালতানাতও। সেগুলোর স্থানে দাঁড়িয়েছে এখনকার কিছু আধুনিক রাষ্ট্র। আধুনিক মিসর যদিও নিজেকে মামলুক সালতানাতের ধারকবাহক মনে করে না, তবে, আধুনিক তুরস্ক নিজেকে উসমানী সালতানাতের উত্তরসূরী মনে করে। ‘উসমানী মীরাছ’ আধুনিক তুরস্কের সবচেয়ে কার্যকর সফট পাওয়ার। এটা তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী আরব রাষ্ট্রগুলো ভালো করেই জানে। তাই তুরস্ককে প্রভাবশূন্য করার অন্যান্য প্রচেষ্টার মধ্যে এসব রাষ্ট্রের একটি কমন প্রচেষ্টা হচ্ছে, উসমানী সালতানাতকে আক্রমন করা। আরব জনগণের সামনে উসমানীদেরকে দখলদার, জালিম এবং গণহত্যাকারী হিসেবে তুলে ধরা। আরবদের সকল পশ্চাদপদতার জন্য চোখ বুজে উসমানীদেরকে দায়ী করা। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, পাঠ্যপুস্তকসহ এমন কোন মাধ্যম নেই যা তারা ব্যাহার করছে না। ২০১৯/২০২০ এর সৌদী আরবের নতুন সিলাবাসে লেখা হয়েছে ‘তুর্কি উসমানী দখলদারিত্ব ও আগ্রাসন’। এক বছর পূর্বেও এই জায়গায় ছিলো ‘উসমানীদের জিহাদ’ বাক্যাংশ। মিসরের ইতিহাসের পাঠ্য-পুস্তকের অবস্থা আরো বেশী জঘন্য।
এই প্রচেষ্টার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে, উসমানী-মামলুক যুদ্ধ নিয়ে সৌদি আরবের এমবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের তৈরী “মামালিকুন নার” নামে ১৪ পর্বের একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক সিরিয়াল। আজ ১৭ই নভেম্বর থেকে এমবিসি-মিসর চ্যানেলে সিরিয়ালটির প্রচার শুরু হবে। টিআরটির তথ্য মতে এর পেছনে ব্যায় হয়েছে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার। এই বিগ বাজেটের সিরিয়ালটির অর্থায়ন করেছে আরব আমিরাতের একটি কোম্পানী। প্রথমে এটা কেবল নেটফ্লিক্সে সম্প্রচার করার কথা ছিলো। পরে এমবিসি টেলিভিশনে সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যাতে আরবের সাধারণ জনগণের কাছেও সিরিয়ালটির ম্যাসেজ পৌঁছে যায়।
ঐতিহাসিক সিরিয়াল তৈরি করার মধ্যে কোন সমস্যা নেই। উসমানী ইতিহাস নিয়ে সিরিয়াল তৈরি করাও কোন নেতিবাচক কিছু না। তুরস্কে এই কাজটা বহু পূর্ব থেকেই শুরু হয়েছে। সুলতান সুলেমান এবং এরতুগ্রুল এ বিষয়ে দু’টি উদাহরণ। কিন্তু ইতিহাসকে যদি উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেটা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠে। ‘মামালিকুন নার’ সিরিয়ালের দুই মিনিটের যে ট্রেইলার প্রচার করা হয়েছে সেটা দেখে মনে হয়েছে যে, সেখানে এই কাজটিই করা হয়েছে। ট্রেইলারের শুরুতেই উসমানী সালতানাতের পরিচয় সম্পর্কে লেখা হয় — “রক্তাত্ব কানুন দিয়ে যে রাষ্ট্র পরিচালিত”। তারপর আরেক জায়গায় একটি গুরুগম্ভির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সম্ভবত কোন উসমানী সুলতানের স্বর। বলা হচ্ছে — “সালতানাত ইসলামের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ”। তারপর মামলুক সুলতান তুমান বাঈ এর ডাক: ‘হে মিসরবাসী, প্রতিরোধ করো। প্রতিরোধই বিজয়’। তারপর, হাজার হাজার মিসরী মামলুক সৈন্য উসমানীদের তোপের আঘাতে উড়ে যাচ্ছে… এক সময় তুমান বাঈ ধৃত হচ্ছে এবং উসমানীরা তাকে কায়রোর ‘বাব যুয়াইলা’ ফটকের সামনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিচ্ছে…..!
এই সিরিয়ালে এটাকে উসমানী এবং মিসরীদের যুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানেও একটি ইতিহাস বিষয়ক প্রশ্ন উঠতে পারে। এটা ছিলো মামলুক-উসমানী যুদ্ধ। মামলুকরা নিজেরাও ছিলো তুর্কি বংশোদ্ভূত। ওরা ছিলো মূলত মধ্য এশিয়ান তুর্কি উপজাতী। তাদেরকে তাতারীরা ধরে এনে দাস হিসেবে বিক্রিত করে দিতো। ইবনে খালদুন মামলুকদের যুগেই মিসরে এসেছিলেন এবং তাদেরকে ‘তুর্ক’ বলে উল্লেখ করেছেন। সে হিসেবে এটা তুর্কি বনাম তুর্কি যুদ্ধ, তুর্কি বনাম মিসরী যুদ্ধ নয়। যদিও মামলুক সেনাবাহিনীতে মিসরী সদস্যও অবশ্য ছিলো।
এই স্বল্প দৈর্ঘের ট্রেইলার দেখার পর কারো সংশয় থাকার কথা নয় যে, এই সিরিয়ালের উদ্দেশ্য বিনোদনের চেয়েও বেশী রাজনৈতিক। মিসরীদের মধ্যে তুর্কিবিরোধী মনোভাবকে আরো চাঙ্গা করে আগুনে ঘি ঢালা উদ্দেশ্য। মিসরী যুবকদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবোধ এবং তুর্কিদের প্রতি ঘৃনা তৈরি করে ভবিষ্যতে মিসরের দরজা চিরস্থায়ীভাকে তুরস্কের জন্য বন্ধ করা উদ্দেশ্য। কেবল মিসরীরা নয়; প্রায় প্রত্যেকটি আরব দেশের নাগরিকরা এই সিরিয়াল দেখবে। যারাই দেখবে তারা সহজেই ব্রেনওয়াশ্ড হবে এবং অজান্তেই তাদের অন্তরে তুরস্কের প্রতি একটা সুপ্ত ঘৃনা তৈরি হবে। এগুলোর পেছনে কুশিলবের ভূমিকা পালন করছে প্রধানত আরব আমিরাত, সাথে সৌদি আরব এবং মিসর।

 238 total views,  2 views today

Start Blogging

Register Here


Registered?

Login Here

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.