আর্যরা কি ভারতীয়? একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা

আর্যরা কি ভারতীয় না কি তারা অভারতীয় বৈদেশিক, এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর বিতর্ক। আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল , সে সম্পর্কে পন্ডিতরা একমত নন। পার্জিটার, লক্ষিধর শাস্ত্রী , কাল্লা বা ত্রিবেদের মতো ভারতীয় ঐতিহাসিকগণ বলে থাকেন যে আর্যদের আদি বাসস্থান হল ভারতবর্ষ । আবার ম‍্যাকডোনাল , গাইলস , ব্রান্ডেস্টাইন সহ অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে আর্যরা বহিরাগত। এদের মধ‍্যে আবার আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। এঁদের কেও ইউরোপ, কেও উত্তর মেরু, কেও মধ‍্য এশিয়া আবার কেও স্তেপ তৃণভূমী বলে উল্ল‍্যেখ করেছেন।

যাইহোক, আর্য কারা এবং তারা কি আদৌ ভারতীয়? এবিষয়ে আমরা একটি নাতি দীর্ঘ আলোচনা করব।

• আর্য কারা?

হরপ্পা সভ‍্যতা ধ্বংসের পর ভারতে একটি নব‍্য সভ‍্যতার উদ্ভব ঘটে। যা ইতিহাসে বৈদিক সভ‍্যতা নামে খ‍্যাত। এই সভ‍্যতাটি আর্যদের মাধ‍্যমে সংঘটিত হয়। খাঁটি সংস্কৃত শব্দে ‘আর্য’ শব্দটির অর্থ হল ‘সদ্বংশজাত’ বা অভিজাত মানুষ। আর্য বলতে অনেকেই একটি নির্দিষ্ট জাতি বলে মনে করে থাকেন। প্রাচীন ভারতে ও ইরানে এটি জাতিগত অর্থেই ব‍্যবহৃত হত। আনুমানিক ৪৮৬ খৃঃপূঃ পারসিক সম্রাট প্রথম দারিয়ুস একটি শিলালিপিতে নিজেকে একজন আর্য বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।

কিন্তু প্রকৃত অর্থে ‘আর্য’ কোন জাতিগত ধারণা বা শব্দ নয়। আর্য একটি ভাষাগত ধারণা। ভাষাগোষ্ঠি বা Language Tree নিয়ে আমরা যদি একটু গবেষণা করি তাহলে দেখব যে, ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠী বা Indo European Languages বলে একটি ভাষা গোষ্ঠী আছে। যাদের মধ‍্যে সংস্কৃত, ল‍্যাটিন, জার্মানি প্রভৃতি ভাষা রয়েছে। আর এই ভাষাতে যারা কথা বলেন তাদের আর্য বলা হয়। সেহেতু অনেকে এই ভাষা গোষ্ঠির নাম ‘আর্য ভাষাগোষ্ঠি’ রেখেছেন। আমরা যদি মিশরীয় ভাষাবিদ ও ঐতিহাসিক ডক্টর আহমাদ হাসান যাইয়‍্যাত এঁর আরবী সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করি, সেখানে দেখব যে, তিনি এই ভাষা গোষ্ঠী কে আর্য ভাষা গোষ্ঠী (اللغات الآرية) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ষোড়শ শতকের সমাপনীর দিকে ভারতে আগত ফিলিপ্পো সসেটি (Filippo Sassetti) নামক জনৈক ইতালীয় বণিক সংস্কৃত এর সাথে অন‍্যান‍্য ভাষাগোষ্ঠির সাদৃশ্য দেখান। ১৮৪৭ সালে জার্মান পন্ডিত ম‍্যাক্সমুলার আর্য বলে যে ভাষা বোঝায় , জাতি নয় তা উল‍্যেখ করে বলেনঃ

“Aryan , in scientific language, is utterly inapplicable to race. It means language and nothing but language”.

• আর্যদের ভারত আগমনের সাধারণ ঐতিহাসিক ধারণাঃ

আগেই বলেছি আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। একদল বলেন তাঁরা ভারতীয় আরেক দল বলেন তারা ইউরোপীয় আবার বাকিরা বলেন তারা এশিয়া/উত্তর আফ্রিকা/স্ক‍্যান্ডেনেভিয়া বা মেরু অঞ্চলের বাসিন্দা। এঁদের প্রত‍্যেকের নিজস্ব যুক্তি আছে।

যাঁরা ভারতের কথা বলেন তাঁরা পূরাণের কথা উল্লেখ করে বলেন যে পুরাণে বা ভারতের ঐতিহ্যে কোথাও আর্যদের বাইরে থেকে ভারতে আসার মতো তথ‍্য নেই। তাই এসব তথ‍্য ঠিক নয়। এনারা আবার ‘দেবযোনিকৃত’ বা ‘দেব নির্মিত দেশ’ তথা সপ্তসিন্ধু অঞ্চল কেই আর্যদের আদি বাসস্থান বলে থাকেন। কিন্তু এযুক্তির খন্ডনে আমরা বোঘাজকোই ও আর্মানা শিলালিপিকে প্রমাণ স্বরূপ ধরতে পারি। এছাড়া তেল আর্মানা লিপি থেকে বহু এমন মিশরীয় রাজার নাম পাওয়া যায় যাদের সাথে আর্যদের নামের মিল আছে। অতয়েব এর থেকে বোঝা যায় আর্যরা বহিরাগত।

কিন্তু সাম্প্রতিক ভারতের দাক্ষিণাত্যে এমন কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক সন্ধান মিলেছে যা দাক্ষিণাত্যে আর্যদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহলে কি অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতামত ভূল? না আমরা তা বলতে পারি না। আসুন এই রহস্যের উদ্ঘাটন করি।

এরহস‍্য উদ্ঘাটন করতে গেলে আমাদের কে ধর্মগ্রন্থ গুলো খুলতে হবে ও গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই রহস্য উদঘাটন করতে আমি কোরান, বাইবেল ও হিন্দু ধর্মের নানাবিধ ধর্মগ্রন্থের সহায়তা নিয়েছি।

•হিন্দু ধর্ম ও মূর্তি পূজাঃ

সবার প্রথমে আমি মূর্তিপূজার উদ্ভব নিয়ে কিছু কথা বলব। হিন্দু ধর্মের যে মূল গ্রন্থ হল আর্যদের সংকলিত বেদ এবং এদের মধ‍্যে সর্বপ্রথম ও পবিত্রতম গ্রন্থ হল ঋগ্বেদ যা আনুমানিক ১৫০০-১০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে ঋগ্বৈদিক যুগে রচিত হয়েছে। আমরা যদি ঋগ্বেদকে অথবা অন‍্যান‍্য বেদকে অথবা হিন্দু সম্প্রদায়ের অপর পবিত্র গ্রন্থ গীতা পাঠ করি তাহলে দেখব তাতে ‘মূর্তি পূজার’ কোন ধারণা নেই এবং তা এক ঈশ্বরের কথা বলে। উপরন্তু তাতে মূর্তি পূজার নিন্দা করা হয়েছে। যেমন ঋগ্বেদে বলা হয়েছে ঃ

ইয় এক ইদ বিদয়তেবসু মর্তায় দাশুষেণ্

অর্থাৎ একজনই খোদা। তিনি সহৃদয় দাতা ব‍্যক্তিকে জীবনোপকরণ দেন।

আবার গীতায় বলা হয়েছে ঃ

হে ধনঞ্জয়! আমি ছাড়া কোন ঈশ্বর নেই।

হিন্দু ধর্ম বিশারদগনের অনেকেই একেশ্বরবাদী। আপনি হিন্দু ধর্মের বিখ্যাত পন্ডিত স্বামী দয়ানন্দ স্বরস্বতীর ‘সত‍্যার্থ প্রকাশ’ বইটি পড়তে পারেন।
এমনকি মুঘল আমলের বিখ্যাত আলেম শাহ আব্দুল আযীয রহঃ কে চিঠি লিখতে গিয়ে সমসাময়িক পন্ডিত মিরযা মাযহার জানজানান হিন্দু সম্প্রদায়কে আহলুল কিতাব বলে উল‍্যেখ করেছেন। গ্রিফিথ তাঁর Hymns of Veda এর ভূমিকা তে, বেদকে ঐশি গ্রন্থ বলে উল্লেখ করেছেন।

অতয়েব আমরা জানলাম বেদ হল ঐশী ও একেশ্বরবাদী ধর্মের ধর্মগ্রন্থ। তাহলে হিন্দু ধর্মে ৩৩ কোটি দেবতা এলো কোথা থেকে? এবিষয়ে ইমাম সাইয়িদ আবুল হাসান আলী আল হাসানী আল নাদভী রহঃ তাঁর ক্বসসুল আম্বিয়াতে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেন। প্রাচীন কালে খুব সম্ভব নূহ আঃ এঁর জামানা হতে মূর্তি পূজার আরম্ভ। প্রাথমিক কালে মূর্তিপূজা বলে কিছু ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে আবেগী মানুষ রা তদানীন্তন স্মরণীয় মানুষ দের মৃত্যুর ছবি বানাত ও ধীরে ধীরে ছবি ছেড়ে মূর্তি বানালো, তারপর একেবারে সোজা পূজা করা শুরু করে। এভাবেই মানুষ আসল ঈশ্বর কে ছেড়ে নিজেদের তৈরি ঈশ্বর কে পূজা করতে থাকে।

•আদম আঃ এঁর অবতরণ স্থলঃ

মানব জাতির প্রথম পুরুষ হযরত আদম ও হাওয়া আঃ তাঁদের সম্পর্কে আলোচনা আমরা কুরআন, বাইবেল এমনকি পুরাণেও পাই! পন্ডিত বেদ প্রকাশ উপাধ‍্যায় তাঁর বেদুঁ আওর পুরাণুঁ কে আধার পর ধর্মিক একতা কি জ‍্যোতি তে ভবিষ‍্য পুরাণে বর্ণিত আদম হাওয়ার ঘটনা উল‍্যেখ করেছেন। এখান আদম, হব‍্যাবতী( হাওয়া) প্রদান নগর (জান্নাত) ও কলি (শয়তান) এর উল‍্যেখ আছে! তিনি পুরাণে আবিরাম (ইব্রাহিম) , নিউহ (নূহ), সাম ও হামের কথাও বর্ণনা করেছেন।

যাইহোক নূহ আঃ যে শ্রীলঙ্কায় আসেন তা মুসলিম ও খৃষ্টান রা বিশ্বাস করেন। তাফসীরে ফাতহুল কাদীরে বর্নিত আছে যে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আদম আঃ এঁর তন্দূর (উনুন) ভারতবর্ষে ছিল।

• নূহ আঃ ও বন‍্যাঃ

আদম আঃ এঁর পর আমরা নূহ আঃ এঁর কথায় আসি। নূহ আঃ বন‍্যার পূর্বে কোথায় ছিলেন তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। পবিত্র কুরআনের সূরা হূদের ৪০ নম্বর আয়াতে নূহঃ আঃ এঁর জামানায় যে উনুনের কথা বলা হয় সেখানে আত তান্নুর বলা আছে। তফসীর কারকগন বলেন আসলে এটি ফারসী শব্দ যার অর্থ উনুন। আবার অনেকে এটিকে ভূপৃষ্ঠ অর্থে ব‍্যখ‍্যা করেছেন। যেহেতু তাননুরর আগে আল আছে তাই এটি একটি নির্দিষ্ট তাননুর বোঝানো হয়েছে। হাসান বসরী রহঃ এটিকে হাওয়া রাঃ এঁর তাননুর বলেছেন। মাওলানা নাইম মোরাদাবাদী একে আদম আঃ এঁর তাননুর বলেছেন। আর ফাতহুল কাদীরে হযরত ইবনে আব্বাস রা ঃ এঁর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে আদম আঃ এঁর উনুন ছিল ভারতবর্ষে ।

আমরা ভারতবর্ষের ম‍্যাপ নিয়ে বসলে দেখা যাবে কেরালার মালাপ্পুরম জেলায় তান্নুর অবস্থিত। প্রবল বন‍্যার পর এখান থেকে নৌকায় করে নূহ আঃ ও তাঁর সাথীরা ইরাকের যুদী পর্বতে থামেন যা আমরা কুরআন ও বাইবেল থেকে জানতে পারি এবং এখান থেকে বাবেল নগর থেকে আবার সারা বিশ্বে মানুষ ছড়িয়ে পড়ে। (বাইবেল (তাওরাত) , সৃষ্টি অধ‍্যায় ৯-১১)।

এ ঘটনা আমরা হিন্দু ধর্ম গ্রন্থে পাই। হিন্দু ধর্মে কতকগুলো মনুর কথা উল্লেখ আছে যার একটি বিশেষ মনু হলেন শ্রদ্ধাদেব মনু । তাঁর ব‍্যাপারে ভবিষ‍্য পুরাণ ও মৎস্য পুরাণে বিষদ আলোচনা রয়েছে যা ফরাসি লেখক ডিউবয়েস তাঁর গ্রন্থ ‘Hindu Manners , Customs and Ceremonies’ (pg. 48, 100 & 416-17) যে উল‍্যেখ করে স্পষ্ট বুঝিয়েছেন যে এই মনু হলেন নূহ আঃ এবং তিনি মনূ কে ‘মহা নূহ” হিসাবে বর্ণনা করেছেন।

আমরা যদি ইতিহাস খুলি তাহলে দেখব ভারতের আর্যপূর্ব হরপ্পা সভ‍্যতা ধ্বংসের কারণ হিসেবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বন‍্যার কথা উল্লেখ করেছেন। এদের মধ‍্যে রাইকস, ডেলস, আর্নেস্ট ম‍্যাকে, সাহানী প্রমূখ উল‍্যেখযোগ‍্য। তবে এই বন‍্য উক্ত নূহ আঃ এঁর বন‍্যা ছিল একথা আমি ১০০ % গ‍্যারান্টি দিয়ে বলতে পারব না।

যাইহোক, এথেকে আমরা বুঝতে পারি, আসলে ভারত থেকে নূহ আঃ এঁর সাথে কিছু মানুষ বাবেলে আসেন এবং সেখান থেকে মানুষ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই একসময় আবার তাদের কিছু অংশ আর্যরূপে পারস‍্য ও তারপর ভারতে আসে এবং সিন্ধু উপত‍্যকায় বসতি স্থাপন করে।

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাতের আল বাঙ্গালী আল হিন্দী (মুহাম্মাদ ইয়াসির আরাফাত মল্লিক)

সূত্রঃ

• আল কুরআন

• ফাতহুল বারী

• The Bhagavad Gita with an introductory essay , Sanskrit Text, English Translation and Notes by S. Radhakrishnan

• ভারতের ইতিহাস, জীবন মুখোপাধ্যায়

• تاريخ الادب العربي ، احمد حسن زيات

• History of India by Keene

• The Penguin History of India by Romila Thapar

• The Chambridge History of India by Rapson

• ইসলাম আতঙ্ক নয় আদর্শ , স্বামী লক্ষী শংকরাচার্য

• Hindu Manners , Customs and Ceremonies by A.J. Dubious

• সত‍্যার্থ প্রকাশ , স্বামী দয়ানন্দ স্বরস্বতী

• হিন্দু ধর্মের গোপন কথা , আব্দুল্লাহ তারিক

 334 total views,  2 views today

Start Blogging

Register Here


Registered?

Login Here

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.